স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব


ইসলাম একজন স্বামীর অধিকার ও দায়িত্ব স্ত্রীর উপর এবংএকজন স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব স্বামীর উপর স্পষ্টভাবে ন্যস্ত করেছে। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি অধিকার রয়েছে, এটা ইসলামের একটি অনন্য ধারণা। এটাকে আরও অসাধারণ করে তোলে এই পদ্ধতি যে অনুসারে তাদেরকে গড়ে তোলা হয় যেন সংঘাত কমিয়ে আনা যায়।

 

নিম্নে স্বামী-স্ত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধিকার ও দায়িত্ব উল্লেখ করা হচ্ছে। সেগুলো পড়ার পূর্বে কয়েকটি কথা মাথায় রাখা অত্যন্ত দরকার :

১। এই সমস্ত অধিকার ও দায়িত্বের মুল উৎস আল্লাহ্‌ তাআলা।

 

২। একইভাবে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার আছে। তাদের উভয়েরই উচিত পরস্পরের অধিকার প্রদানে সর্বতোভাবে চেষ্টা করা এবং অধিকার প্রদানে যদি ব্যর্থ হয় তাহলে পরস্পরকে ক্ষমা করা।

 

৩। স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সংযমী হতে হবে। ক্রোধ ও ঝগড়ার সময় তাতে আরও ইন্ধন জোগানোর জন্য একজনের প্রতি আরেকজনের অধিকারের কথা স্মরণ করানো তাদের কারো জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। অর্থাৎ গালাগালির অস্ত্ররূপে নিজের অধিকারকে প্রয়োগ করবেন না।

 

৪। অনেক নবমুসলিম উন্নত জীবনযাত্রার জন্য পথনির্দেশিকাস্বরূপ ওয়েবসাইটে বিশেষজ্ঞদের ইসলামি ফতওয়া এবং ইসলামি আইনশাস্ত্র পড়ে। এই সংস্থানগুলি সাধারণত আইনের অক্ষর সরবরাহ করে, আইনের নির্যাস নয়। আইনের নির্যাস হলো আল্লাহ্‌ তাআলার অবাধ্যতা না করে শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করা। সর্বদা মনে রাখবেন যে, ভালোবাসা, বিনয় এবং করুণা একটি সুখী ইসলামি বিয়ের অপরিহার্য উপাদান।

 

বিষয়সূচি

 

স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার

ইসলাম একজন স্ত্রীকে তার মুসলিম স্বামীর উপর কিছু অধিকার দিয়েছে। তন্মধ্যে কিছু আর্থিক, আর কিছু অন্য ক্ষেত্রবিশিষ্ট।

 

১। মোহর

স্বীয় স্বামীর নিকট হতে মোহর কিংবা বিয়ের উপহার গ্রহণ নারীর আর্থিক অধিকার।

 

২। স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণের প্রতি কুরআন অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। “… তাদের সাথে সদ্ভাবে অবস্থান করো…”। [সূরা নিসা ৪:১৯] কুরআনের পাশাপাশি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম”। (জামি’ তিরমিযি : ১১৬২)        

 

একজন মুসলিম স্বামীকে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উপদেশ মনে রাখতেই হবে, “নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো। তোমাদের হাতে তাদেরকে দেওয়া হয়েছে আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে এবং আল্লাহ্‌র বাণী দ্বারা একটি জিম্মাস্বরূপ, ফলে তারা তোমাদের জন্য বৈধ হয়েছে”। (সহি মুসলিম : ১২১৮) স্ত্রী একটি জিম্মা, কোনো দাসী বা কুকুর নয়; সুতরাং তাদের সঙ্গে সেভাবেই ব্যবহার করতে হবে।  

 

৩। ভরনপোষণ

একজন স্ত্রী স্বামীর সামর্থ্য অনুসারে ভরনপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখে, যেমন খাবার, বস্ত্র এবং বাসস্থান। স্বামীর দায়িত্ব রোজগার করা এবং স্ত্রীর ভরনপোষণ করা।

 

৪। নিরাপত্তা

শারীরিক ও মানসিক তথা সর্বতোভাবে স্ত্রীর সুরক্ষা স্বামীর দায়িত্ব।

 

স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার

১। আনুগত্য

ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা হয় না এমন সমস্ত বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর নিকট কাম্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি অনেক পশ্চিমার সম্পূর্ণ বিরোধী, সুতরাং অনুগ্রহপূর্বক এটা ভালোভাবে বুঝুন। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ এটাকে বলে ‘দমন’ এবং অনেক সময় বলে ‘মানসিক নির্যাতন’। এটা নয়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা আবশ্যক।  

 

এক, একজন স্ত্রীর জন্য আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে স্বামীর আনুগত্য জরুরি। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছনে : “যদি কোনো রমণী প্রত্যহ পাঁচবার স্বালাত প্রতিষ্ঠা করে, রমযান মাসে সওম আদায় করে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বীয় স্বামীর আনুগত্য করে তাহলে কিয়ামতদিবসে তাকে বলা হবে : জান্নাতের যে দরজা দিয়ে তোমার ইচ্ছা প্রবেশ করো”। (সহি জামি : ৬৬০)

 

দুই, স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য ভৃত্যের জন্য মালিকের আনুগত্যের মতো নয় ! সে একজন স্বাধীন নারী, কোনো দাসী নয়। অর্থাৎ স্বামী স্বীয় স্ত্রীর উপর অন্যায়ভাবে নিজের কর্তৃত্ব চালাতে পারে না, একজন স্বেচ্ছাচারী শাসকের ন্যায় আচরণ করতে পারে না। তাকে মনে রাখতে হবে যে, সে আল্লাহ্‌র একজন বান্দা এবং স্ত্রীর সঙ্গে কীরূপ ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে।  

 

তিন,  একজন স্বামীর কর্তব্য স্ত্রীর সঙ্গে পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে পরিবার চালানো। তবে চুড়ান্ত সিন্ধান্ত নেবে স্বামীই। তার সিন্ধান্তের জন্য তাকেই আল্লাহ্‌র সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে। স্বামীর সিদ্ধান্ত-গ্রহণের কর্তৃত্বে আপত্তি করা স্ত্রীর জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। তার বোঝা উচিত যে, পরিবার একটি কম্পানির ন্যায়। যেমন প্রত্যেকটি কম্পানির একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থাকে, অনুরূপ পরিবারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলো স্বামী। মনে রাখুন স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার আছে। তাই স্বামীকে সদাচরণের সাথে নিজের কর্তৃত্বের ভারসম্য রক্ষা করতে হবে।

 

২। স্বামীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা  

স্বামীর গৃহে তার ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির সুরক্ষা স্ত্রীর জন্য আবশ্যক। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “স্ত্রী তার স্বামীর ঘর এবং তার সন্তান-সন্ততির হেফাজতকারী”। (সহি বুখারি : ৫১৮৮, সহি মুসলিম : ১৮২৯) ইসলামি মূল্যবোধের উপর স্বামীর সন্তান-সন্ততির প্রতিপালন তার নিকট কাম্য।

 

৩। স্বামীর অনুমতি ছাড়া গৃহ ছাড়বে না

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যদি তোমাদের কারো স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায় তাহলে তাহলে তাদের বাধা দিও না”। (সহি বুখারি : ৫২৩৮, সহি মুসলিম : ৪৪২) তার মানে এই নয় যে, প্রত্যেকবার বাড়ি থেকে বেরোনোর পূর্বে তাকে স্বামীর অনুমতি নিতে হবে, প্রত্যেকবার জিজ্ঞাসা করবে : “আমি কি যেতে পারি ?” এর মানে হলো : সে এমন কোনো জায়গা যাবে না যেখানে যাওয়ার ব্যাপারটাকে তার স্বামী মেনে নিতে পারে না। এতে সংঘাত কম হবে এবং পরিবারে আনন্দ বিরাজিত থাকবে। এর ব্যতিক্রম শুধু মসজিদ। স্বামীর অনুমতি ও অনুমোদন ছাড়াই সে মসজিদে যেতে পারে।  

 

৪। স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার গৃহে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেবে না

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “তাদের উপর তোমার অধিকার হলো যে, তারা এমন কাউকে গৃহে প্রবেশের অনুমতি দেবে না যে তোমার বিছানায় বসুক, এটা তুমি চাও না”। (সহি মুসলিম : ২৮০৩)

 

অর্থাৎ স্বামী পছন্দ করে না এমন কাউকে ঘরে প্রবেশ করতে দেবে না, এতে সংঘাত হ্রাস পাবে এবং সম্প্রীতি বিরাজিত থাকবে।

 

৫। শয়নকক্ষের রহস্য গোপন রাখবে

স্বামী-স্ত্রীর জন্য বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সাথে নিজেদের যৌনচারের কথা আলোচনা করা বাঞ্ছনীয় নয়। এমন বিষয় অনুপযুক্ত, অশ্লীল ও লজ্জাজনক বলে গণ্য। এবিষয়ে উভয়েরই উচিত পরস্পরের গোপনীয়তাকে শ্রদ্ধা করা। কিয়ামতদিবসে আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর নিকট যায় এবং স্ত্রী স্বামীর নিকট যায় অতঃপর সে তার রহস্য উম্মোচিত করে দেয়। (সহি মুসলিম : ১৪৩৭)

 

যৌনমিলন একটি অধিকার। এই অধিকার দুজনেরই পরস্পরের উপর। প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীই যৌনমিলন করার অধিকার রাখে। স্ত্রীর রজঃস্রাব এবং সন্তান প্রসবান্তে রক্তস্রাবের সময় তার সঙ্গে যোনিপথে সহবাস নিষিদ্ধ। আর পায়ুপথে যৌনমিলন সর্বদাই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম।

 

তথ্যসূত্র

http://www.newmuslims.com/lessons/159/

306 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page