শাহাদাহ্ (সাক্ষ্য বা সাক্ষী বা আকিদা)


শাহাদাহ্‌ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ আল্লাহ্‌র একত্ববাদ এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ রসূলের সাক্ষ্য দেওয়া বা ধর্মতঃ ঘোষণা করা। এটা ইসলামের মৌলিক ধর্মবিশ্বাস, যার শপথপাঠ একটি নির্দিষ্ট বিবৃতির মাধ্যমে করা আবশ্যক। এই শপথবাক্যইইসলামে অন্য সব বিশ্বাস ও অনুশীলনেরএকটি ভিত্তি। এই সাক্ষ্য বা ধর্মবিশ্বাস দুটি অংশের ওপর প্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহিদ (আল্লাহ্‌র একত্ববাদ) এবং কালেমায়ে রিসালাত (নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুঅত)

 

বিষয়সূচি

 

শাহাদাহ্‌র শব্দাবলি

কালিমায়ে শাহাদাহ্‌ ইসলামের প্রথম স্তম্ভ যেমন সহি বুখারি ১:৭-তে উল্লেখ আছে। প্রকৃতপক্ষে শাহাদাহ্‌র দুটি অংশ আছে। অধিকাংশ সময় এদুটিকে একত্রে শাহাদাতাইন বলে, অর্থাৎ “দুটি সাক্ষ্য”। শাহাদাহ্‌র আরবি লি‌প্যন্তর হলো : “আশ্‌হাদু আল-লাইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশ্‌হাদু আন্না মুহাম্মাদার্‌ রসূলুল্লাহ্‌”। বাংলা ভাষায় এর অর্থ : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র রসূল (প্রেরিত দূত)”। ইসলাম গ্রহণে ইচ্ছুক অমুসলিমের এই কালিমাটি পাঠ করার প্রয়োজন হয়।  

 

ইসলামে শাহাদাহ্‌র গুরুত্ব

নিঃসন্দেহে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌’ (আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো মা’বুদ নেই”-এর তুলনায় মহান ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কথা আর কিছু নেই।

 

এটা আল্লাহ্‌ তাআলার তাওহিদের (একত্ববাদের) প্রতি ঈমানের ঘোষণাবাণী। এই বাক্য ঈমান ও কুফ্‌রের মধ্যে পার্থক্য নিরুপণ করে। এটাই ছিল পূর্ববর্তী সমস্ত নবি ও রসূলের আহ্বান। আল্লাহ্‌ তাআলা স্বয়ং কুর্‌আনের মধ্যে এই বিবৃতির গুরুত্বে মোহর লাগিয়েছেন। তিনি কুর্‌আনে বলছেন : “আর জেনে রেখো, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই"” [কুর্‌আন ৪৭:১৯, ২০:৮, ৩:১৮, ৫৯:২২]

 

এমনকি এই বিবৃতি ওই অবিশ্বাসীর জন্য বাধ্যতামূলক যে মুস্‌লিম হওয়ার কথা ঘোষণা করবে। এছাড়াও যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সঙ্গে এই কালিমাটি পাঠ করে নেয়, তার সম্পত্তি ও জীবন এই পৃথিবীতে সুরক্ষিত হয়ে যায়। যে মুস্‌লিম ব্যক্তি ইসলাম ধর্মটিকে বুঝতে চাই, তার জন্য এর অর্থ, ফজিলত, নীতিমালা, শর্তসমূহ ও স্থান প্রভৃতি জীবনে বাস্তবায়িত করা একান্তভাবে জরুরি।


আল্লাহ্‌র সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলির মধ্যে আল্লাহ্‌র স্মরণ (আল্লাহ্‌র যিক্‌র) অন্যতম একটি। এই গুরুত্ব বিশেষত ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কাজগুলি সম্পন্ন করার পর। এই নির্দেশ কুর্‌আনের বিভিন্ন আয়াতে তিনি নিজেই দিয়েছেন : “আর যখন তোমরা আরাফাত হতে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন মাশ্‌আরুল হারামের নিকট আল্লাহ্‌কে স্মরণ করো এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই স্মরণ করো”। [কুর্‌আন ২:১৯৮]

 

 “অতঃপর যখন তোমরা (হজ্জের) কার্যাদি সম্পন্ন করে নেবে তখন আল্লাহ্‌কে এমনভাবে স্মরণ করো যেমন তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষগণকে স্মরণ করতে”। [কুর্‌আন ২:২০০]

 

তিনি আরও বলেন : “আমার স্মরণের জন্য স্বালাত প্রতিষ্ঠা করো”। [কুর্‌আন ২০:১৪]

আল্লাহ্‌ তাআলাকে স্মরণ করার সর্বোত্তম পথ নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদিসে আমাদের জন্য বর্ণিত আছে। তিনি বলছেন : “আর আমার এবং আমার পূর্বে প্রেরিত অন্যান্য সমস্ত নবি-রসূলের সর্বোত্তম প্রার্থনা ছিল “আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো সত্য মা’বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আধিপত্য কেবল তাঁরই জন্য, সমস্ত প্রশ্ংসা একমাত্র তাঁর এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান”। [লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ ওয়াহ্‌দাহু লা-শারিকালাহু লাহুল মুল্‌কু ওয়ালাহুল হাম্‌দু ওয়া হুওয়া আ’লা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর]। [তির্‌মিযি]

 

আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন : "“সর্বোত্তম দুআ হলো : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ্‌ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই)।

 

উপরের পয়েন্টগুলি হতে কালিমার গুরুত্ব অভিব্যক্ত হয়েছে। যাতেআরও স্পষ্ট বোধগম্যতা অর্জন করা সম্ভবহয় তার জন্য আমরা আরোকিছু বিস্তারিতভাবে সেগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।[ক]

এই বাণীরই (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌) তাবলিগ করেছিলেন আদম, ইব্রাহিম, মুসা, ইসা প্রভৃতি এবং কিয়ামতদিবস পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য চুড়ান্ত নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। [কুর্‌আন ২১:২৫] এই সাক্ষ্যই জান্নাতের কুঞ্জিকা। কিন্তু খাঁজ ছাড়া কোনো চাবি হয় না। যদি তুমি সঠিক খাঁজবিশিষ্ট চাবি নিয়ে আসো তাহলে দরজা তোমার জন্য খুলে যাবে। অন্যথায় সেটা তোমার জন্য খুলবে না। এই সাক্ষ্য দ্বারা জান্নাত অর্জন করার জন্য একজন মানুষকে প্রকৃত শর্তগুলি পূরণ করতেই হবে যেগুলি হলো এই মুক্ষ বিবৃতির সঠিক খাঁজস্বরূপ।

 

শাহাদাহ্‌র প্রথম অংশ

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌র স্তম্ভসমূহ

এটা হলো আল্লাহ্‌র একত্ববাদের (তাওহিদের) ঘোষণাবাণী। এটা অস্বীকারসূচক ও স্বীকৃতিসূচক, এই দুই ধরনের বাক্যাংশ নিয়ে গঠিত। শাহাদাতের প্রথমাংশটি (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌) দুটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : অস্বীকার ও স্বীকৃতি।

 

অস্বীকারসূচক : লা-ইলাহা – কোনো উপাস্য নেই’। এই অংশে সবকিছুর উপাসনা ও বিশ্বাসকে অস্বীকার করা হয়েছে।

স্বীকৃতিসূচক : ইল্লাল্লাহ্‌ – ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত'। এই অংশে কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার উপাসনা ও তাঁর প্রতি ঈমানকে স্বীকার করা হয়েছে।[১]

 

কালিমায়ে তাওহিদের সাতটি শর্ত

কালিমায়ে তাওহিদের সাতটি সূক্ষ্ম শর্ত রয়েছে। একজন মুস্‌লিম হিসেবে এগুলো জানা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য অত্যাবশ্যক। এটা ব্যতীত এই কালিমা অর্থহীন বলে গণ্য হবে। শর্তগুলি হলো :

  • العلم  অর্থাৎ জ্ঞান : শাহাদাহ্‌র অর্থের জ্ঞান, এর না-বোধক এবং হ্যাঁ-বোধক বিষয়সমূহের জ্ঞান। আর এর বিপরীত হলো অজ্ঞতা।
  • اليقين  (দৃঢ় বিশ্বাস), এমন দৃঢ় বিশ্বাস যা সর্বপ্রকার সন্দেহ-সংশয়কে দূরীভূত করে দেয়।
  • الإخلاص  (ইখলাস) : অর্থাৎ এমন নির্ভেজাল একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা যা আল্লাহ্‌র সঙ্গে অংশীদারিত্বকে অস্বীকার করে।
  • الصدق (সত্য বিশ্বাস) : সত্যবাদিতা যা মিথ্যা বা কপটতা, কোনোটাকেই অনুমোদন করে না।
  • المحبة  (ভালোবাসা) : শাহাদাহ্‌ এবং এর অর্থকে ভালোবাসা এবং এর প্রতি পরিতৃপ্ত থাকা।
  • الانقياد (আনুগত্য) : এর প্রকৃত চাহিদা বা দাবিগুলির আনুগত্য। আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনার্থে একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই জন্য যে সমস্ত কর্তব্য একান্তভাবে পালনীয়, সেগুলোর আনুগত্য স্বীকার করা।
  • القبول (গ্রহণ করা) : গ্রহণের পরিপন্থী বিষয় হলো প্রত্যাখ্যান করা।

 

১। ইল্‌ম (জ্ঞান)

আল্লাহ্‌ তাআলা সম্পর্কে জ্ঞান এবং ইবাদতের প্রকৃতি, ধারণা ও পদ্ধতির জ্ঞান ইস্‌লামের অনুশীলন তথা বোধগম্যতার জন্য আবশ্যক। ফলপ্রসূ জ্ঞান একজন মানুষকে মিথ্যা আল্লাহ্‌ভক্তি হতে পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের পথ দেখায়, আর পথ দেখায় কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার জন্য সমস্ত ইচ্ছা-বাসনা উৎসর্গ করার। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “সুতরাং জেনে রেখো, আল্লাহ্‌ ব্যতীত সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই। আর তুমি তোমার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ্ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন”। [কুর্‌আন ৪৭:১৯]

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেয়, এই জ্ঞান রেখে যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [সহি মুস্‌লিম ১:৩৯]

 

২। ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস)

এর অর্থে কোনো সংশয় পোষণ না করেই সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। আল্লাহ্‌ সুব্‌নাহু ওয়া তাআলা বলছেন : “বিশ্বাসী তো তারাই, যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পর সন্দেহ পোষণ করে না”। [কুর্‌আন, সূরা হুজ্‌রাত, ৪৯:১৫]

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো সত্যিকারের মা’বুদ নেই এবং আমি তাঁর প্রেরিত দূত। আল্লাহ্‌র যে বান্দা তার সাক্ষ্যে কোনো সন্দেহপোষণ না করে আল্লাহ্‌ সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [সহি মুস্‌লিম ১:৪০, ৪১]

 

৩। ইখলাস (বিশুদ্ধতা এবং আন্তরিকতা)

ইসলাম গ্রহণ এবং ইবাদত্‌সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাদি সম্পাদনের উদ্দেশ্য বিশুদ্ধরূপে আল্লাহ্‌র জন্য বিশিষ্ট হবে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “বলো, আমি আদিষ্ট হয়েছি আল্লাহ্‌র আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্তে তাঁর ইবাদত করতে এবং কেবল আল্লাহ্‌র জন্য একনিষ্ঠভাবে ধর্মের কার্যাদি সম্পাদন করতে; শুধু লোকদেখানোর জন্য নয়,  আর ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও সমকক্ষ নাকরে”। [কুর্‌আন, সূরা যুমার, ৩৯:১১]  সুতরাং যখন কোনো ব্যক্তি এই সাক্ষ্যবাণী ঘোষণা করবে, তখন তার উচিত কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র জন্য আন্তরিকতার সাথে যেকোনো কাজ করা, অন্য কারো জন্য নয়। বিশুদ্ধতা এবং আন্তরিকতাশির্‌ক (আল্লাহ্‌র অধিকারে অন্য কাউকে অংশী করা)-এর পরিপন্থী। যে ব্যক্তি কোনো পার্থিব স্বার্থে সাক্ষ্যবাণী ঘোষণা করবে, তার মধ্য হতে ইবাদতে আন্তরিকতার শর্তটি ব্যাহত হবে এবং আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হবে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “বলো, আমি আল্লাহ্‌র আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁরই ইবাদত করি”। [কুর্‌আন, সূরা যুমার, ৩৯:১৪] 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌’ কালিমাটি পড়ে, আল্লাহ্‌ তাআলা তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন”। [সহি বুখারি, ৮:৪৩১]

 

৫। আস্‌-সিদ্‌ক্ব (সত্যবাদিতা)

সত্যবাদিতাএই ঘোষণার অর্থপূর্ণ বোধগম্যতার পথ প্রশস্ত করে। এটা স্বীয়সৃষ্টিকর্তাআল্লাহ্‌র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের দিকে মানুষের গতিকেশক্তিশালীকরে দেয়। মুনাফিক্‌রা এই সাক্ষ্যবাণী উচ্চারণ করে, কিন্তু তারা তাদের হৃদয়ে কুফ্‌র (প্রত্যাখ্যান) গোপন রাখে। “তারা মুখে তা বলে, যা তাদের অন্তরে থাকে না”। [কুর্‌আন, সূরা আল-ফাত্‌হ, ৪৮:১১] 

অন্তর সম্রাটসদৃশ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি সেনাসদৃশ। রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেন : “শোনো, মানবশরীরে এক টুকরো মাংস রয়েছে, যদি সেটা সুস্থ থাকে তাহলে পুরো শরীর সুস্থ থাকে, আর যদি সেটা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়”। [সহি মুস্‌লিম ১৫৯৯, ৩৮৮২ ও সহি বুখারি ১:৪৯]

 

যখন অন্তর আল্লাহ্‌র ভালোবাসায় সমৃদ্ধ থাকে, তখন সত্যবাদিতা ও সততাও অন্তরকে পূর্ণ করে দেয়। কিন্তু প্রবৃত্তি যখন অন্তরে ঢুকে পড়ে তখন দুর্নীতি ও ভণ্ডামিরপথ খুলে যায় এবং মানুষ তা বলে, যা প্রকৃতপক্ষে তার অন্তরে থাকে না। সুস্থ ও সুষ্ঠু অন্তর এই কয়েকটি জিনিস থেকে মুক্ত থাকে :

ক) আল্লাহ্‌র ইবাদতে কাউকে বা কোনো জিনিসকে অংশী করা,

খ) মিথ্যা গৌরব ও অহংকার,

গ) বিদ্বেষ,

ঘ) কার্পণ্য,

ঙ) জীবনের ভালোবাসা,

চ) নেতৃত্ব এবং আধিপত্যেরভালবাসা, ছ) কামপ্রবৃত্তি, জ) বিদ্‌আত।

 

এই ধরনের অন্তর শাহাদাতের ঘোষণাকে পূর্ণতা দেয়। কুর্‌আনের ভাষায় এটা ‘আল-ক্বাল্‌বুস্‌ সালিম’ নামে পরিচিত, অর্থাৎ পরিষ্কার, সুস্থ, নিরাপদ ও স্বাভাবিক অন্তর। আর প্রকৃতপক্ষে হিসাব-নিকাশের দিন এরই হিসাব হবে। “যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান=সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সেই ব্যক্তি যে সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে আসবে (শির্‌ক ও নিফাক্ব বা কপটতা হতে পবিত্র)”। [কুর্‌আন, সূরা শুআ’রা, ২৬:৮৮-৮৯]  

 

৫। ভালোবাসা

ভালোবাসা হলো :

ক) আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে অন্য সবকিছু অপেক্ষা অধিক ভালোবাসা।

খ) ওসবকিছুকে ভালোবাসা যেগুলোকে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ভালোবাসতেন।

গ) ইসলাম-সংক্রান্ত বিষয়ে সেই জিনিসকে ঘৃণা বা অপছন্দকরা যা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঘৃণা বা অপছন্দ করেছেন।

এটাই ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত ভালোবাসা। ‘আল-ওয়ালাওয়াল-বারা’ (বিশ্বস্ততা ও শত্রুতা)ধারণারপিছনে মূলত এই তিনটি উপাদাননিহিত থাকে।

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি তিনটি গুণের অধিকারী হবে সে ঈমানের মাধুর্য্য আস্বাদন করবে : (ক) যার নিকট আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অন্য সবকিছু থেকে বেশি প্রিয় হবে, (খ) সে কাউকে কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনার্থেই ভালোবাসে ও (গ) কুফ্‌র হতে মুক্তি পাওয়ার পর তাতে প্রত্যাবর্তন করতে ঠিক সেইরূপ অপছন্দ করে যেরূপ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হতে অপছন্দ করে”। [সহি বুখারি ১:১৫ ও সহি মুস্‌লিম ৬৭]

আল্লাহ্‌ তাআলা ও তাঁর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা তাঁদের নির্দেশাবলির আনুগত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। এই ভালোবাসা বিদ্‌আতিকে বা তাদের বিদ্‌আতকে অস্বীকার করে। যারা ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে অসঙ্গত মতপথ বা দৃষ্টভঙ্গি প্রবর্তন করে, যেমন সুফিবাদের অতীন্দ্রিয়বাদীরা এবং তাদের তথাকথিত তারিকা (মতপথ), যেগুলোর ইসলামের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ধারণাগুলির উদ্ভাবন ঘটেছে অন্যান্য ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি হতে। তারা তাদের সুফি শায়খ ও নেতাদেরকে (আক্বতাব) আল্লাহ্‌র স্তরে পৌঁছে দেয়। “আর কিছু সংখ্যক লোক আছে, যারা অন্যান্যকে (আল্লাহ্র) সমকক্ষ বলে মনে করে এবং তাদেরকে আল্লাহ্‌কে ভালোবাসার মতো ভালোবাসে, কিন্তু যারা বিশ্বাস করেছে, তারা আল্লাহ্‌র ভালোবাসায় দৃঢ়তর”। [কুর্‌আন, সূরা বাকারা, ২:১৬৫]

নিম্নোক্ত বর্ণনায় আব্দুল্লাহ্‌ ইবনের মাস্‌উদ (রাঃ) বলেন : “রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এক কথা বললেন আর আমি অন্য এক কথা। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ব্যতীতি অন্যকিছুকে তাঁর সমকক্ষস্বরূপ মনে করে, মৃত্যুবরণ করে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। আর আমি বললাম : “যে ব্যক্তি কোনো কিছুকে আল্লাহ্‌র সমকক্ষ প্রতিপন্ন না করে মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [সহি বুখারি, ৬:২৪]

আল্লাহ্‌ এবং তাঁর ইসলামের বাণীর ভালোবাসা আল্লাহ্‌ এবং তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলির জ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মানুষ আল্লাহ্‌কে যতবেশি জানবে, তার ভালোবাসা ততই বলিষ্ঠ হবে। এই ভালোবাসা বিশ্বাসীকে পরকালে আল্লাহ্‌র সাক্ষাত, তাঁর দর্শন ও তাঁর কথা শ্রবণের প্রতি অধিক আগ্রহী করে তোলে। এটা হয়ে যায় মুক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং জাগতিক সমস্তকিছু হয়ে যায় দুর্বল থেকে দুর্বলতর। আগ্রহ স্ফীতি লাভ করে। এর লক্ষ থাকে স্রষ্টার দিকে উন্নীত হওয়া। এটা তাকে এমন কোনো পথে নিক্ষেপ করে না, যা তাকে এক আল্লাহ্‌র আনুগত্য ব্যতীত অন্য কোনো দিকে নিয়ে যাবে। মানুষ সর্বশক্তি ব্যয় করে আল্লাহ্‌ তাআলার নির্দেশানুযায়ী কার্যসম্পাদনে গতিশীল থাকে। এটাই তৈরি করে ইহকালে তথা পরকালে প্রকৃত প্রসন্নতা ও আনন্দ।  

 

৬। ইন্‌কিয়াদ (আ্নুগত্য)

সাক্ষ্যবাণী পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে আল্লাহ্‌ ও তাঁর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যেরে মাধ্যমে এবং আল্লাহ্‌র নিষেধাবলি হতে দূরত্ব অবলম্বনের মাধ্যমে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “যে কেউ সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহ্‌র নিকট আত্মসমর্পণ করে, সে আসলে এক মজবুত হাতল ধারণ করে”। [কুর্‌আন, সূরা লুক্‌মান ৩১:২২]

শাহাদাহ্‌র ঘোষণাবাণীর সাথে সম্মতি হবে সম্পূর্ণ দ্বিধামুক্ত। তাছাড়া এটা তো পূর্ণ আনুগত্যের বিষয়। আল্লাহ্‌ তাআলার বাণীতে এর সুন্দর বিবরণ রয়েছে : “আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো বিশ্বাসী নর-নারীর সেবিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না। কেউ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে”। [কুর্‌আন, সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৩৬]  আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের বিধানসমূহ মানুষের মূল্যায়নের বিষয় নয়। সেই বাণী একটি অহি। এর সবকিছুই মানুষের উপকারের জন্য। অতএব, ইসলামের প্রতি মানুষের আনুগত্য তার নিজের কল্যাণের জন্য।

 

৭। আল-ক্ববুল (গ্রহণ)

ইসলামের মহত্ব এবং এটা যে সত্য, তা স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়, বরং তা বীনিতভাবে ও অবনত মস্তকে গ্রহণ করে সেই স্বীকৃতিকে বাস্তবরূপ দিতে হবে। এই সাক্ষ্যবাণীর অর্থের প্রতি আনুগত্য বিশ্বাসীকে মিথ্যা গৌরব, অহংকার ও অবজ্ঞা হতে রক্ষা করে। “তাদের নিকট ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই’ বলা হলে তারা অহংকারবশত অগ্রাহ্য করত”। [কুর্‌আন, সূরা আস্‌-স্বাফফাত, ৩৭:৩৫] একজন মুস্‌লিমের একথা হৃদয়ংগম করা উচিত যে, এই সাক্ষ্যবাণী সংকীর্ণ ও অন্ধানুসরণে বাধা দেয় এবং সৎপথের অনুসারীদের মতানুসারে ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান করে। তাঁরা হলেন সাহাবাবর্গ এবং তাঁরা, যাঁরা কিয়ামতদিবস পর্যন্ত তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। এই পথ সালাফে স্বালিহীনের (সৎ ও নিষ্ঠাবান পুর্বপুরুষগণের) পথ নামে পরিচিত।

যারা ইসলামের পথনির্দেশিকা ও শিক্ষা গ্রহণ করে আর যারা তা গ্রহণ করে না, উভয় প্রকার লোকের জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একটি অসাধারণ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলছেন : “আল্লাহ্‌ তাআলা যে পথনির্দেশিকা ও শিক্ষা দিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত হলো ভূপৃষ্ঠে বর্ষিত প্রবল বৃষ্টি। কোনো কোনো ভূমি থাকে উর্বর, যা সেই পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা ও সবুজ তরুলতা উৎপাদন করে। আর তার কিছু অংশ থাকে কঠিন যা বৃষ্টির পানি আটকে রাখে এবং আল্লাহ্‌ তাআলা তাদ্বারা মানুষকে উপকৃত করেন। তারা নিজেরা পান করে, পশুপালকে পান করায় এবং চাষাবাদ করে। আবার কিছু ভূখণ্ড আছে একদম মসৃণ ও সমতল, যা না পানি আটকে রাখে আর না ঘাসপাতা উৎপাদন করে (অর্থাৎ মানুষের কোনো উপকারে আসে না)। প্রথম দৃষ্টান্তটি হলো সেই ব্যক্তির যে আল্লাহ্‌ দ্বিনের জ্ঞান লাভ করে এবং আল্লাহ্‌ তাআলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাদ্বারা উপকৃত হয়। ফলে তা নিজে শেখে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়। শেষাক্ত দৃষ্টান্তটি হলো সে ব্যক্তির যে সেটাকে কোনো প্রকার গ্রাহ্য করে না এবং আমি যে পথনির্দেশিকা নিয়ে প্রেরিত তা গ্রহণ করে না”। [সহি বুখারি, ১:৭৯]

 

৮। আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা করা হয়,সেসবকিছুর প্রতি অবিশ্বাস

আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “যে ব্যক্তি তাগূতকে (আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যান্য বাতিল উপাস্যসমূহকে) অস্বীকার করবে এবং আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, নিশ্চয়ই সে এমন শক্ত হাতল ধারণ করবে যা কখনো ভাঙ্গার নয়। আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী”। [কুর্‌আন, সূরা বাকারা, ২:২৫৬]

আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ্‌ বিন বাযও (রহঃ)তাঁর পুস্তক “আদ-দুরুসুল মুহিম্মাহ্‌ লি-আম্মাতিল উম্মাহ্‌”-র মধ্যে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌র এই শর্তটি অষ্টম নম্বরে উল্লেখ করেছেন।

 

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌র ফজিলত

আবু সাঈদ খুদরি (রাঃ) বর্ণনা করছেন, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “মুসা (আঃ) বললেন : হে প্রভু ! তুমি আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দাও যাদ্বারা আমি তোমাকে স্মরণ করতে পারি এবং তোমার নিকট প্রার্থনা করতে পারি। তিনি (আল্লাহ্‌ তাআলা) বললেন : মুসা ! বলো, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌। তিনি (মুসা) বললেন : তোমার সমস্ত বান্দাই এটা বলে।  তিনি বললেন : যদি সাতটি আকাশ ও আমাকে ছাড়া ওগুলোর মধ্যে অবস্তানরত সবকিছু এবং সাতটি পৃথিবীকে পাল্লার একদিকে রাখা হয় আর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌কে রাখা হয় অন্য দিকে তাহলে নিশ্চয়ই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ বেশি ভারী হবে”। [ইবনে হিব্বান ও হাকিম]

 

রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেন : “সর্বোত্তম যিক্‌র হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌’”।

 

রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেন : “বিচারদিবসে আমার উম্মতের একজন লোককে সকল সৃষ্টির উপস্থিতিতে ডাকা হবে। তার (কৃতকর্মের) নিরানব্বইটি তথ্য খোলা হবে, প্রত্যেকটি তথ্য এতটাই প্রসারিত হবে যতটা দৃষ্টির সীমা ব্যাপ্ত হয়। অতঃপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে : এসমস্ত কর্মের মধ্যে তুমি কি কিছু অস্বীকার করছ ? সে উত্তর দেবে : না, প্রভু ! সে জিজ্ঞাসিত হবে : তোমার কি কোনো ওজর বা সৎকর্ম আছে ? লোকটি, সেসময় সে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে, বলবে : না। তাকে বলা হবে : হ্যাঁ, তোমার কিছু সৎকর্ম আছে। তোমার ওপর কোনো অবিচার হবে না। একটি কাগজ তাকে দেখানো হবে, যার ওপর লেখা থকবে : ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌, মুহাম্মাদুর্‌ রাসুলুল্লাহ্‌’। সে বলবে : এগুলো কী ধরনের কাগজ ও তথ্য ? তাকে বলা হবে : তোমার ওপর কোনো অবিচার করা হবে না। অতঃপর দাঁড়ীপাল্লার একদিকে সেই (নিরানব্বইটি) তথ্য রাখা হবে এবং অন্যদিকে রাখা হবে সেই কাগজটি। কাগজটির ওজন তথ্যগুলির ওজনকে ছাড়িয়ে যাবে”। [তির্‌মিযি ও হাকিম]

 

ইবনে রাজাব (রহঃ) কালিমার এই সমস্ত ফজিলতের একটি সারাংশ বর্ণনা করেছেন, যা নিম্নরূপ :

  • এর প্রতিদান জান্নাত।
  • কারো মৃত্যুর পূর্বে এর পাঠ জান্নাতে প্রবেশের কারণ হতে পারে।
  • এটা হচ্ছে জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপদ আশ্রয়।
  • এটা একজন মুসলামনের ক্ষমার কারণ।
  • এটা সর্বোৎকৃষ্ট সৎকর্ম।
  • এটা পাপরাশিকে সমূলে বিনষ্ট করে দেয়।
  • এটা আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্যতার পথের সমস্ত বাধাকে দূরীভূত করে দেয়।
  • এটা একটা বাক্য, যার পাঠকারীকে আল্লাহ্‌ তাআলা গ্রহণ করবেন।
  • নবি-রসূলগণ কর্তৃক উচ্চারিত এটা একটা সেরা প্রচার।
  • এটা তাঁর প্রশংসার সর্বোত্তম গুণকীর্তন।
  • এটা সর্বোত্তম কর্ম এবং এটা বহু সৎকর্মকে সমৃদ্ধ করে।
  • এটা শয়তানের বিরুদ্ধের একটা নিরাপত্তা।
  • এটা কবর তথা পরকালের অন্ধকার ও শাস্তি হতে সুরক্ষা।
  • এর পাঠকের জন্য এর আটটি দরজাই সুগম থকবে।
  • এর পাঠক নিশ্চিতরূপে জাহান্নামের আগুন হতে বেরিয়ে আসবে, যদিও তার কর্তব্য পালনে স্বল্প স্খলনের জন্য জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর হয়।[খ]

 

শাহাদাহ্‌র দ্বিতীয় অংশ

‘মুহাম্মাদুন আব্দুহু ওয়া রাসূলুহ্‌’-এর অর্থ : মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহ্‌ বান্দা ও তাঁর প্রেরিত দূত। শাহাদাহ্‌র ঘোষণাবাণীর এটি দ্বিতীয়াংশ। এই বিশ্বাস করা যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহ্‌র চুড়ান্ত ও সর্বশেষ পয়গম্বর। আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদতের একমাত্র পথ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দেওয়া পথনির্দেশিকা ও দৃষ্টান্ত। এর অর্থ হলো :  

১। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে নির্দেশ দেন তার আনুগত্য করা।

২। তিনি যাকিছু নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বলে ঘোষণা করেছেন তা পরিহার করা।

৩। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শিক্ষানুযায়ী আল্লাহ্‌র ইবাদত করা।

৪। এমন প্রত্যেকটি জিনিসকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ও বিশ্বাস করা যে সম্পর্কে তিনি আমাদেরকে অবগত করেছেন।

৫। এই বিশ্বাস করা যে, তিনি আল্লাহ্‌র একজন বান্দা ও উপাসনাকারী। তিনি এমন কেউ নন যার ইবাদত করা যায়। আর তাঁর সম্বন্ধে আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে যা বলেছেন তার অনুসরণ করা আবশ্যক।

 

১। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে নির্দেশ দেন তার আনুগত্য করা :

“বলো, (হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের) : তোমরা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো। কিন্তু যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে জেনে রাখো, আল্লাহ্‌ তাআলা অবিশ্বাসীদেরকে ভালোবাসেন না”। [কুর্‌আন, সূরা আল-ইমরান, ৩:৩২]

 

সুন্নাহ্‌ আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে একটি প্রত্যাদেশ, সেটা নবির ধারণা, চিন্তাধারা বা প্রবৃত্তি নয়। (আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন) : “আর তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। তা তো অহি, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়”। [কুর্‌আন, সূরা নাজ্‌ম, ৫৩:৩-৪] সুতরাং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ্‌ তাআলারই আনুগত্য করি। তাই রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পথে কোনো দ্বিধা বা ইতস্ততা থাকা উচিত নয়। যাবতীয় সমস্যায় তাঁকে সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের একজন বিচারক হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। যেমন আল্লাহ্‌ তাআলা পরিষ্কার নির্দেশ দিচ্ছেন : “কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ ! তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-কলহের বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ করে; অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে তাদের মনের মধ্যে কোনো দ্বিধা বা সংকীর্ণতা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়”।[কুর্‌আন, সূরা নিসা, ৪:৬৫]

 

যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহ্‌র সতর্কবাণী : “আর তারা সতর্ক হোক যারা বিরুদ্ধাচরণ করে তাঁর আদেশের (অর্থাৎ নবির সুন্নাহ্‌, মতপথ, নির্দেশাবলি, ইবাদতসংক্রান্ত কার্যাদি, বিবৃতি ইত্যাদি), তাদেরকে বিপর্যয় (অবিশ্বাস, বিচারবিভাগীয় শাস্তি, ভূমিকম্প, খুন, স্বেচ্ছাচারী শাসকের বাড়াবাড়ি ইত্যাদি) ঘিরে ধরবে অথবা গ্রাস করবে তাদেরকে কঠিন শাস্তি”। [কুর্‌আন, সূরা নূর, ২৪:৬৩]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন :“যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করবে যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে”। [সহি বুখারি ২৬৯৭, (খণ্ড ৩:৮৬১), সহি মুস্‌লিম ১৭১৮] নিঃসন্দেহে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ্‌ সুরক্ষিত, কারণ আল্লাহ্‌ মানুষের যেকোনো ভণ্ডামি থেকে ইসলামের বাণী রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। “মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র প্রেরিত দূত” এই ঘোষণাবাণীর বহিঃপ্রকাশ রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ। (আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন) : “(হে মুহাম্মাদ ! সমস্ত মানবজাতিকে) বলো, যদি তোমরা সত্যিকারেই আল্লাহ্‌কে ভালোবাস তাহলে তোমরা আমার অনুসরণ করো (অর্থাৎ, আমি যা নিয়ে প্রেরিত, কুর্‌আন ও সুন্নাহ্‌), নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন; আর আল্লাহ্‌ মহাক্ষমাশীল, অসীম করুণাময়”। [কুর্‌আন, সূরা আল-ইমরান, ৩:৩১]  

 

২। তিনি যাকিছু নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বলে ঘোষণা করেছেন তা পরিহার করা।

আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা হতে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ শাস্তিদানে খুব কঠোর”। [কুর্‌আন, সূরা হাশ্‌র, ৫৯:৭]

 

 “আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো বিশ্বাসী নর-নারীর সেবিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না। কেউ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে”। [কুর্‌আন, সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৩৬]  

 

৩। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শিক্ষানুযায়ী আল্লাহ্‌র ইবাদত করা।

“যে রসূলের (মুহাম্মাদসাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহ্‌রই আনুগত্য করল। আর যে মুখ ফিরিয়ে নিল, আমি তাদের ওপর তোমাকে প্রহরীরূপে প্রেরণ করেনি”। [কুরআন, সূরা নিসা, ৪:৮০]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করে, সে আসলে আল্লাহ্র আনুগত্য করে এবং যে ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধাচরণ করে, সে আসলে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধাচরণ করে। আর যে ব্যক্তি এমন শাসকের আনুগত্য করে যাকে আমি নিয়োগ করি, আসলে সে আমারই আনুগত্য করে এবং যে তার বিরুদ্ধাচরণ করে, আসলে সে আমারই বিরুদ্ধাচরণ করে”। [সহি বুখারি ৯:২৫১, সুনানে নাসায়ি ৫:৪১৯৮]

 

তিনি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন : “আমার সমস্ত অনুসারীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে ওই সমস্ত লোক ছাড়া যারা অস্বীকার করবে”। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন : কে অস্বীকার করবে ? হে আল্লাহ্‌র রসূল ! তিনি বললেন : “যারা আমার আনুগত্য করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যারা আমার বিরুদ্ধাচরণ করবে তারা অস্বীকার করবে”। [সহি বুখারি ৯:৩৮৪] নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক বিবৃত আল্লাহ্‌র ইবাদতসংক্রান্ত বিষয়াদি, নির্দেশাবলি, উপদেশবাণী, অনুমোদনসমূহ ও সুপারিশ ইত্যাদি একত্রে সুন্নাহ্‌ নামে পরিচিত। সুন্নাতের আরেকটি অর্থ : ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বিদ্‌আতের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে দ্বিনে ইসলামকে বোঝার সঠিক পথের প্রতি গুরুত্বারোপ করা।

 

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য আল্লাহ্‌ তাআলার একটি নির্দেশ। (আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন) : “আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা হতে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ শাস্তিদানে খুব কঠোর”। [কুর্আন, সূরা হাশ্‌র, ৫৯:৭]

 

উপরোক্ত আয়াতের অর্থ নিম্নোক্ত বিবরণীতে খুব সুন্দরভাবে আলোচিত হয়েছে। আল্‌ক্বামা বর্ণনা করছেন : আব্দুল্লাহ্‌ বিন মাস্‌উদ (রাঃ) বলেন : “আল্লাহ্‌ তাআলা ওই সমস্ত নারীদের প্রতি অভিসম্পাত করেন যারা উলকি করে আর যারা উলকি করায় এবং যারা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নিজেদের মুখমণ্ডল হতে লোম তুলে ফেলে, যাদ্বারা তারা আল্লাহ্‌ তাআলার সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করে”। [সহি বুখারি ৭:৮২৬] তাঁর এই কথা বানী আসাদের উম্মে ইয়াকুব নামে এক মহিলার কানে যায়। তিনি আব্দুল্লাহ্‌ বিন মাস্‌উদের নিকট এসে বলেন : আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি অমুক-অমুক মহিলাকে অভিসম্পাত করেছেন ? তিনি জবাব দিলেন : “আমি কেন তাদের অভিসম্পাত করব না যাদের অভিসম্পাত করেছেন আল্লাহ্‌র রসূল এবং যারা আল্লাহ্‌র গ্রন্থেও অভিশপ্ত ?” উম্মে ইয়াকুব বললেন : “আমি সমপূর্ণ কুর্‌আন পড়েছি, কিন্তু আপনি যা বলছেন তা তো এর মধ্যে আমি পাইনি”। তিনি বললেন : “তুমি যদি কুর্‌আন পড়ে থাকো তাহলে নিশ্চয়ই এটা পেয়ে থাকবে। তুমি কি পড়োনি : “আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা হতে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো” ? তিনি উত্তর দিলেন : “হ্যাঁ, আমি পড়েছি”। তিনি বললেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এগুলো হতে নিষেধ করেছেন”। তিনি বললেন : “কিন্তু আমি দেখছি, আপনার স্ত্রী এগুলো করে”। তিনি বললেন : “যাও, তাকে দেখে এসো”। তিনি গিয়ে তাঁকে দেখলেন, কিন্তু নিজের বক্তব্যের সমর্থনে কিছুই পেলেন না। ফলে তিনি বললেন : “যেমন তুমি ভেবেছিলে, যদি আমার স্ত্রী তাই হতো তাহলে আমি তাকে আমার সঙ্গে রাখতাম না (অর্থাৎ আমি তাকে তালাক দিতাম)”। [সহি বুখারি ৭:৮২২]

 

এথেকে দুটি শিক্ষা নিতেই হবে : (ক) সুন্নাতও শরিয়ত। (খ) যারা সুন্নাতের বিরোধিতা করে তাদের ঘৃণা করা ও তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা। রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করবে যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে”। [সহি বুখারি ৯:৪৪৯]

 

৪। এমন প্রত্যেকটি জিনিসকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ও বিশ্বাস করা যে সম্পর্কে তিনি আমাদেরকে অবগত করেছেন।

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ্‌ তাআলারই আনুগত্য করি। তাই রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা বা ইতস্ততা থাকা উচিত নয়। যাবতীয় সমস্যায় তাঁকে সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একজন বিচারক ও চুড়ান্ত প্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। যেমন আল্লাহ্‌ তাআলা পরিষ্কার নির্দেশ দিচ্ছেন : “কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ ! তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-কলহের বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ করে; অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে তাদের মনের মধ্যে কোনো দ্বিধা বা সংকীর্ণতা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়”।[কুর্‌আন, সূরা নিসা, ৪:৬৫]

 

এই আয়াত প্রমাণ করে, কোনো ব্যক্তি বিশ্বাসী হতে পারে না যতক্ষণ না সে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শাসন, নির্দেশাবলি, নিয়মানুবর্তিতা, উপদেশবাণী, সুপারিশ, অনুমোদনসমূহ ও কার্যক্রমসহ সমস্ত আদেশের নিঃশর্ত আনুগত্য করে। আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মধ্যে উত্তম আদর্শ রেখেছেন। “যারা আল্লাহ্‌ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহ্‌কে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মধ্যে রয়েছে অনুপম আদর্শ”। [কুর্‌আন, সূরা আহ্‌যাব ৩৩:২১]

 

তাই আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে সুন্নাতকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর সুন্নাত সুরক্ষিত না থাকলে এটা কখনো সম্ভব হবে না।

 

নিঃসন্দেহে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ্‌ সুরক্ষিত। কারণ আল্লাহ্‌ তাআলা ইসলামের বাণীকে সর্বপ্রকার বিকৃতি হতে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই আমি যিক্‌র (কুর্‌আন ও সুন্নাহ্‌) অবতীর্ণ করেছি আর আমিই তার রক্ষাকারী”। [কুর্‌আন, সূরা আল-হিজ্‌র ১৫:৯]

 

সাধারণ অবস্থায় ‘যিক্‌র’ শব্দটি কুর্‌আন ও সুন্নাহ্‌ উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়। যেমন কুর্‌আনে এই পরিভাষাটি সুন্নাতের অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে। নিম্নের আয়াত হতে প্রমাণিত হয় : “স্পষ্ট প্রমাণ ও গ্রন্থসহ। আর তোমার প্রতি আমি যিক্‌র (কুর্‌আন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তারা যেন চিন্তাভাবনা করে”। [কুর্‌আন, সূরা নাহ্‌ল ১৬:৪৪]

 

এই আয়াত প্রমান করে যে, সুন্নাহ্‌ সুরক্ষিত। সুতরাং কুর্‌আন ও সুন্নাত উভয়ই সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত।

 

৫। এই বিশ্বাস করা যে, তিনি আল্লাহ্‌র একজন বান্দা ও উপাসনাকারী। তিনি এমন কেউ নন যার ইবাদত করা যায়। আর তাঁর সম্বন্ধে আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে যা বলেছেন তার অনুসরণ করা আবশ্যক।

 “এটা কি লোকদের জন্য বিস্ময়কর যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহি প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে সতর্ক করো (জাহান্নামের কঠিন শাস্তি হতে) এবং (আল্লাহ্‌র একত্ববাদ ও তাঁর রসূলের প্রতি) বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে তাদের সৎকর্মের পুরস্কার”? [কুর্‌আন, সূরা ইউনুস, ১০:২]

 

 “নিশ্চয়ই তোমাদের মাঝে তোমাদের মধ্য হতে একজন পয়গম্বর এসেছেন (অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সঃ) যাঁকে তোমরা খুব ভালোভাবে জানো)। তোমরা কোনো আঘাত পেলে বা তোমাদের কোনো অসুবিধা হলে তিনি খুব কষ্ট পান। তিনি তোমাদের খুব হিতাকাঙ্ক্ষী (যেন সুপথপ্রাপ্ত হও, আল্লাহ্‌র নিকট অনুতপ্ত হও, তাঁর নিকট তোমাদের পাপসমূহের ক্ষমা প্রার্থনা করো, আর এই জন্য যে, তোমরা যেন জান্নাতে প্রবেশ করো এবং জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ড হতে মুক্তি পাও); বিশ্বাসীদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাময়”। [কুর্‌আন, সূরা তাওবা, ৯:১২৮]

 

“হে নবি (মুহাম্মাদ (সঃ)) ! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্কারীরূপে এবং আল্লাহ্‌র দিকে আহবানকারীরূপে তাঁরই অনুমতিক্রমে ও একটি প্রদীপরূপে যা আলো বিস্তার করে (কুর্‌আন ও সুন্নাহ্‌ হতে তোমার হিদায়তের মাধ্যমে)”। [কুর্‌আন, সূরা আহ্‌যাব, ৩৩:৪৫-৪৬]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একজন মানুষ ছিলেন, যেমন কুর্‌আনে উল্লেখ আছে : “বলো, (হে মুহাম্মাদ !) আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য (অর্থাৎ আল্লাহ্‌)। সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে”। [কুর্‌আন, সূরা কাহ্‌ফ, ১৮:১১০]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অদৃশ্যের জ্ঞান রাখতেন না। যেমন কুর্‌আনে উল্লেখ আছে : “বলো, (হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম!) আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ব্যতীত আমার নিজের ভালো-মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। যদি আমি অদৃশ্যের জ্ঞান রাখতাম তাহলে তো আমি প্রভূত কল্যাণ লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করত না। কিন্তু আমি তো শুধু বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদবাহী”। [কুর্‌আন, সূরা আ’রাফ, ৭:১৮৮]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর বাণী পৌঁছানোর অসামান্য লক্ষের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। (কুর্‌আনে উল্লেখ আছে) : “তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তুমি তা প্রচার করো। যদি তা না করো, তবে তো তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না। আল্লাহ্‌ তোমাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন। বস্তুত আল্লাহ্‌ তাআলা অবিশ্বাসীদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না”। [কুর্‌আন, সূরা মায়িদাহ্‌ ৫:৬৭]

 

উমার (রাঃ) বর্ণনা করছেন : আমি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি : “তোমরা আমার প্রশংসায় বেশি বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিষ্টানরা মারিয়মের পুত্রের প্রশংসায় করেছিল, কারণ আমি তো একজন বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহ্‌র বান্দা ও তাঁর নবি বলে ডাকো”। [সহি বুখারি, ৪:৫৬৪] [২]

 

সারাংশ

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র রসূল, এই ঘোষণা ঈমানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সর্বক্ষেত্রে তাঁকে বিশ্বাস করতে হবে, কারণ তিনি আমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে অবগত করেছেন। সবক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্য আবশ্যক যার নির্দেশ তিনি আমাদের দিয়েছেন এবং ওসবকিছু থেকে দূরে থাকতেই হবে যা হতে তিনি নিষেধ করেছেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যই আল্লাহ্‌র আনুগত্য। জান্নাতের পথ দেখায়, এমন সববিষয়ের সাথে তিনি আমাদেরকে পরিচিত করেছেন এবং জাহান্নামের পথ দেখায়, এমন সববিষয় সম্পর্কে তিনি আমাদেরকে সতর্ক করেছেন।

 

শাহাদাহ্‌ বলাই কি যথেষ্ট ?

আল্লাহ্‌র একত্ববাদ ও অদ্বিতীয়ত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ কেবল একথা মেনে নেওয়া নয় যে, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো স্রষ্টা নেই এবং আল্লাহ্‌ হচ্ছেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী প্রতিপালক। বরং জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই, এমন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পথে আল্লাহ্‌কে বিশ্বাস করা খুব গুরুত্ব রাখে। সুতরাং যদি কোনো ব্যক্তি এই সাক্ষবাণীর কোনো একটি অংশ বলে, কিংবা কোনো একটি অংশের জ্ঞান রাখে না বা বিশ্বাস করে না তাহলে তার ঈমান অসম্পূর্ণ এবং ইসলামি আকিদার সঙ্গে অসঙ্গত। তাই একজন মুস্‌লিম হিসেবে আমাদের সর্বদা দুআ করা উচিত : “হে বিশ্বাসীগণ ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহ্‌কে ভয় করো এবং মুস্‌লিম না হয়ে (আল্লাহ্‌র সামনে আত্মসমর্পণ, তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণের পূর্ণাঙ্গ অবস্থা ছাড়া) মৃত্যুবরণ করো না”। [কুর্‌আন, সূরা আল-ইম্‌রান, ৩:১০২]

 

আরও দেখুন

আল্লাহ্‌ কে; নবি মুহাম্মাদ (সঃ); তাওহিদের আকিদা; ইস্‌লামের স্তম্ভসমূহ;

 

তথ্যসূত্র

[ক] [খ] ডাঃস্বালেহ্‌ আল-ফাউযান, http://www.protectedpearls.com/shahadah.htm

[১] ঈমানসহজকরেদিয়েছে,  (মুহাম্মাদ আল-জিবালি), আল-কিতাব ওয়াস-সুন্নাহ প্রকাশনী।

[২] http://www.almuflihoon.com/index.php?option=com_content&view=article&id=64:the-conditions-of-laa-ilaaha-illallaah-muhammadun-rasoolullaah-&catid=34:aqeedah&Itemid=140

[৩] http://ilmularabiyyah.wordpress.com/2012/03/16/sahadahsayit/

543 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page