লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ্


এই সাক্ষ্যবাণী বা ধর্মবিশ্বাসকে বলা হয় শাহাদাহ্‌‌বা শাহাদাতায়ন, এই বাণী দুটি অংশের ওপর প্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ কালিমায়ে তাওহিদ (আল্লাহ্‌র একত্ববাদ) এবং কালিমায়ে রিসালাত (নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুঅত)। এই শপথবাক্যইইসলামেরঅন্যসব বিশ্বাস ও অনুশীলনেরএকটি ভিত্তি। শাহাদাহ্‌র প্রথম অংশটি হলো “লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ব্যতীত উপাসনার যোগ্য কোনো উপাস্য নেই।  

 

বিষয়সূচি

 

সকল নবির সাধারণ বাণী

এই বাণীরই (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌) তাবলিগ করেছিলেন আদম, ইব্রাহিম, মুসা, ইসা প্রভৃতি এবং কিয়ামতদিবস পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত চুড়ান্ত নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। [কুর্‌আন, সূরা আন্বিয়া ২১:২৫] এই সাক্ষ্যই জান্নাতের কুঞ্জিকা। কিন্তু খাঁজ ছাড়া কোনো চাবি হয় না। যদি তুমি সঠিক খাঁজবিশিষ্ট চাবি নিয়ে আসো তাহলে দরজা তোমার জন্য খুলে যাবে। অন্যথায় সেটা তোমার জন্য খুলবে না। এই সাক্ষ্য দ্বারা জান্নাত অর্জন করার জন্য একজন মানুষকে প্রকৃত শর্তগুলি পূরণ করতেই হবে যেগুলি হলো এই মুক্ষ বিবৃতির সঠিক খাঁজস্বরূপ। (এই উদাহরণটি ফুযাইল ইবনে আয়ায তাবিয়ী বর্ণনা করেছেন, দেখুন : তাফসির ইবনে কাসির, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা)

 

লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌র স্তম্ভসমূহ

এটা হলো আল্লাহ্‌র একত্ববাদের (তাওহিদের) ঘোষণাবাণী। এটা অস্বীকারসূচক ও স্বীকৃতিসূচক, এই দুই ধরনের বাক্যাংশ নিয়ে গঠিত। শাহাদাতের প্রথমাংশটি (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌) দুটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : অস্বীকারসূচক ও স্বীকৃতিসূচক।

 

অস্বীকারসূচক : লা-ইলাহা – প্রকৃতপক্ষে কোনো (সত্য) উপাস্য নেই’। এই অংশে সবকিছুর উপাসনা ও বিশ্বাসকে অস্বীকার করা হয়েছে।

স্বীকৃতিসূচক : ইল্লাল্লাহ্‌ – ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত'। এই অংশে কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার উপাসনা ও তাঁর প্রতি ঈমানকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

 

কালিমায়ে তাওহিদ বা লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌র সাতটি শর্ত

কালিমায়ে তাওহিদের সাতটি সূক্ষ্ম শর্ত রয়েছে। একজন মুস্‌লিম হিসেবে এগুলো জানা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য অত্যাবশ্যক। এটা ব্যতীত এই কালিমা অর্থহীন বলে গণ্য হবে। শর্তগুলি হলো :

  • العلم  অর্থাৎ জ্ঞান : শাহাদাহ্‌র অর্থের জ্ঞান, এর না-বোধক এবং হ্যাঁ-বোধক বিষয়সমূহের জ্ঞান। আর এর বিপরীত হলো অজ্ঞতা।
  • اليقين  (দৃঢ় বিশ্বাস), এমন দৃঢ় বিশ্বাস যা সর্বপ্রকার সন্দেহ-সংশয়কে দূরীভূত করে দেয়।
  • الإخلاص  (ইখলাস) : অর্থাৎ এমন নির্ভেজাল একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা যা আল্লাহ্‌র সঙ্গে অংশীদারিত্বকে অস্বীকার করে।
  • الصدق (সত্য বিশ্বাস) : সত্যবাদিতা যা মিথ্যা বা কপটতা, কোনোটাকেই অনুমোদন করে না।
  • المحبة  (ভালোবাসা) : শাহাদাহ্‌ এবং এর অর্থকে ভালোবাসা এবং এর প্রতি পরিতৃপ্ত থাকা।
  • الانقياد (আনুগত্য) : এর প্রকৃত চাহিদা বা দাবিগুলির আনুগত্য। আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনার্থে একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই জন্য যে সমস্ত কর্তব্য একান্তভাবে পালনীয়, সেগুলোর আনুগত্য স্বীকার করা।
  • القبول (গ্রহণ করা) : গ্রহণের পরিপন্থী বিষয় হলো প্রত্যাখ্যান করা।

 

১। ইল্‌ম (জ্ঞান)

আল্লাহ্‌ তাআলা সম্পর্কে জ্ঞান এবং ইবাদতের প্রকৃতি, ধারণা ও পদ্ধতির জ্ঞান ইসলামের অনুশীলন তথা বোধগম্যতার জন্য আবশ্যক। ফলপ্রসূ জ্ঞান একজন মানুষকে মিথ্যা আল্লাহ্‌ভক্তি হতে পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের পথ দেখায়, আর পথ দেখায় কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার জন্য সমস্ত ইচ্ছা-বাসনা উৎসর্গ করার। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “সুতরাং জেনে রেখো, আল্লাহ্‌ ব্যতীত সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই। আর তুমি তোমার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ্ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন”। [কুর্‌আন, সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই, এই জ্ঞান রেখে যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [সহি মুস্‌লিম ১:৩৯]

 

২। ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস)

এর অর্থে কোনো সংশয় পোষণ না করেই সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। আল্লাহ্‌ সুব্‌নাহু ওয়া তাআলা বলছেন : “বিশ্বাসী তো তারাই, যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পর সন্দেহ পোষণ করে না”। [কুর্‌আন, সূরা হুজ্‌রাত, ৪৯:১৫]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো সত্যিকারের মা’বুদ নেই এবং আমি তাঁর প্রেরিত দূত। আল্লাহ্‌র যে বান্দা তার সাক্ষ্যে কোনো সন্দেহপোষণ না করে আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [সহি মুস্‌লিম ১:৪০, ৪১]

 

৩। ইখলাস (বিশুদ্ধতা এবং আন্তরিকতা)

ইসলাম গ্রহণ এবং ইবাদত্‌সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাদি শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার উদ্দেশ্যে বিশুদ্ধরূপে সম্পাদন করতে হবে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “বলো, আমি আদিষ্ট হয়েছি আল্লাহ্‌র আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁর ইবাদত করতে এবং কেবল আল্লাহ্‌র জন্য একনিষ্ঠভাবে ধর্মের কার্যাদি সম্পাদন করতে; শুধু লোকদেখানোর জন্য নয়,  আর ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেসমকক্ষ নাকরে”। [কুর্‌আন, সূরা যুমার, ৩৯:১১]  সুতরাং যখন কোনো ব্যক্তি এই সাক্ষ্যবাণী ঘোষণা করবে, তখন তার উচিত কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র জন্য আন্তরিকতার সাথে যেকোনো কাজ করা, অন্য কারো জন্য নয়। বিশুদ্ধতা এবং আন্তরিকতাশির্‌ক (আল্লাহ্‌র অধিকারে অন্য কাউকে অংশী করা)-এর পরিপন্থী। যে ব্যক্তি কোনো পার্থিব স্বার্থে সাক্ষ্যবাণী ঘোষণা করবে, তার মধ্য হতে ইবাদতে আন্তরিকতার শর্তটি ব্যাহত হবে এবং আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হবে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “বলো, আমি আল্লাহ্‌র আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁরই ইবাদত করি”। [কুর্‌আন, সূরা যুমার, ৩৯:১৪] 

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌’ কালিমাটি পড়ে, আল্লাহ্‌ তাআলা তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন”। [সহি বুখারি, ৮:৪৩১]

 

৪। আস্‌-সিদ্‌ক্ব (সত্যবাদিতা)

সত্যবাদিতাএই ঘোষণার অর্থপূর্ণ বোধগম্যতার পথ প্রশস্ত করে। এটা স্বীয়সৃষ্টিকর্তাআল্লাহ্‌র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের দিকে মানুষের গতিকেশক্তিশালীকরে দেয়। মুনাফিক্‌রা এই সাক্ষ্যবাণী উচ্চারণ করে, কিন্তু তারা তাদের হৃদয়ে কুফ্‌র (প্রত্যাখ্যান) গোপন রাখে। “তারা মুখে তা বলে, যা তাদের অন্তরে থাকে না”। [কুর্‌আন, সূরা আল-ফাত্‌হ, ৪৮:১১] 

 

অন্তর সম্রাটসদৃশ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি সেনাসদৃশ। রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেন : “শোনো, মানবশরীরে এক টুকরো মাংস রয়েছে, যদি সেটা সুস্থ থাকে তাহলে পুরো শরীর সুস্থ থাকে, আর যদি সেটা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়”। [সহি মুস্‌লিম : ১৫৯৯, ৩৮৮২ ও সহি বুখারি ১:৪৯]

যখন অন্তর আল্লাহ্‌র ভালোবাসায় সমৃদ্ধ থাকে, তখন সত্যবাদিতা ও সততাও অন্তরকে সমৃদ্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রবৃত্তি যখন অন্তরে ঢুকে পড়ে তখন দুর্নীতি ও ভণ্ডামিরপথ খুলে যায় এবং মানুষ তা বলে, যা প্রকৃতপক্ষে তার অন্তরে থাকে না। সুস্থ ও সুষ্ঠু অন্তর এই কয়েকটি জিনিস থেকে মুক্ত থাকে :

ক) আল্লাহ্‌র ইবাদতে কাউকে বা কোনো জিনিসকে অংশী করা,

খ) মিথ্যা গৌরব ও অহংকার,

গ) বিদ্বেষ,

ঘ) কার্পণ্য,

ঙ) জীবনের ভালোবাসা,

চ) নেতৃত্ব এবং আধিপত্যেরভালবাসা,

ছ) কামপ্রবৃত্তি,

জ) বিদ্‌আত।

 

এই ধরনের অন্তর শাহাদাতের ঘোষণাকে পূর্ণতা দেয়। কুর্‌আনের ভাষায় এটা ‘আল-ক্বাল্‌বুস্‌ সালিম’ নামে পরিচিত, অর্থাৎ পরিষ্কার, সুস্থ, নিরাপদ ও স্বাভাবিক অন্তর। আর প্রকৃতপক্ষে হিসাব-নিকাশের দিন এরই হিসাব হবে। “যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সেই ব্যক্তি যে সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে আসবে (শির্‌ক ও নিফাক্ব বা কপটতা হতে পবিত্র)”। [কুরআন, সূরা শুআ’রা, ২৬:৮৮-৮৯] 

 

৫। ভালোবাসা

ভালোবাসা হলো :

ক) আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে অন্য সবকিছু অপেক্ষা অধিক ভালোবাসা।

খ) ওসবকিছুকে ভালোবাসা যেগুলোকে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ভালোবাসতেন।

গ) ইসলাম-সংক্রান্ত বিষয়ে সেই জিনিসকে ঘৃণা বা অপছন্দকরা যা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঘৃণা বা অপছন্দ করেছেন।

 

এটাই ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত ভালোবাসা। ‘আল-ওয়ালাওয়াল-বারা’(বিশ্বস্ততা ও শত্রুতা)ধারণারপিছনে মূলত এই তিনটি উপাদাননিহিত থাকে।

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি তিনটি গুণের অধিকারী হবে সে ঈমানের মাধুর্য্য আস্বাদন করবে : (ক) যার নিকট আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অন্য সবকিছু থেকে বেশি প্রিয় হবে, (খ) সে কাউকে কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনার্থেই ভালোবাসে ও (গ) কুফ্‌র হতে মুক্তি পাওয়ার পর তাতে প্রত্যাবর্তন করতে ঠিক সেইরূপ অপছন্দ করে যেরূপ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হতে অপছন্দ করে”। [সহি বুখারি ১:১৫ ও সহি মুস্‌লিম ৬৭]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা ও তাঁর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা তাঁদের নির্দেশাবলির আনুগত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। এই ভালোবাসা বিদআতিকে বা তাদের বিদআতকে অস্বীকার করে। যারা ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে অসঙ্গত মতপথ বা দৃষ্টভঙ্গি প্রবর্তন করে, যেমন সুফিবাদের অতীন্দ্রিয়বাদীরা এবং তাদের তথাকথিত তারিকা (মতপথ), যেগুলোর ইসলামের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ধারণাগুলির উদ্ভাবন ঘটেছে অন্যান্য ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি হতে। তারা তাদের সুফি শায়খ ও নেতাদেরকে (আক্বতাব) আল্লাহ্‌র স্তরে পৌঁছে দেয়। “আর কিছু সংখ্যক লোক আছে, যারা অন্যান্যকে (আল্লাহর) সমকক্ষ বলে মনে করে এবং তাদেরকে আল্লাহ্‌কে ভালোবাসার মতো ভালোবাসে, কিন্তু যারা বিশ্বাস করেছে, তারা আল্লাহ্‌র ভালোবাসায় দৃঢ়তর”। [কুর্‌আন, সূরা বাকারা, ২:১৬৫]

 

নিম্নোক্ত বর্ণনায় আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাস্‌উদ (রাঃ) বলেন : “রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এক কথা বললেন আর আমি অন্য এক কথা। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্যকিছুকে তাঁর সমকক্ষস্বরূপ মনে করে মৃত্যুবরণ করে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। আর আমি বললাম : “যে ব্যক্তি কোনো কিছুকে আল্লাহ্‌র সমকক্ষ প্রতিপন্ন না করে মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [সহি বুখারি, ৬:২৪]

 

আল্লাহ্‌ এবং তাঁর ইসলামের বাণীর ভালোবাসা আল্লাহ্‌ এবং তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলির জ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মানুষ আল্লাহকে যতবেশি জানবে, তার ভালোবাসা ততই বলিষ্ঠ হবে। এই ভালোবাসা বিশ্বাসীকে পরকালে আল্লাহ্‌র সাক্ষাত, তাঁর দর্শন ও তাঁর কথা শ্রবণের প্রতি অধিক আগ্রহী করে তোলে। এটা হয়ে যায় মুক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং জাগতিক সমস্তকিছু হয়ে যায় দুর্বল থেকে দুর্বলতর। আগ্রহ স্ফীতি লাভ করে। এর লক্ষ থাকে স্রষ্টার দিকে উন্নীত হওয়া। এটা তাকে এমন কোনো পথে নিক্ষেপ করে না, যা তাকে এক আল্লাহ্‌র আনুগত্য ব্যতীত অন্য কোনো দিকে নিয়ে যাবে। মানুষ সর্বশক্তি ব্যয় করে আল্লাহ্‌ তাআলার নির্দেশানুযায়ী কার্যসম্পাদনে গতিশীল থাকে। এটাই তৈরি করে ইহকালে তথা পরকালে প্রকৃত প্রসন্নতা ও আনন্দ। 

 

৬। ইন্‌কিয়াদ বা আনুগত্য

সাক্ষ্যবাণী পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে আল্লাহ্‌ ও তাঁর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যেরে মাধ্যমে এবং আল্লাহ্‌র নিষেধাবলি হতে দূরত্ব অবলম্বনের মাধ্যমে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “যে কেউ সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহ্‌র নিকট আত্মসমর্পণ করে, সে আসলে এক মজবুত হাতল ধারণ করে”। [কুর্‌আন, সূরা লুকমান ৩১:২২]

 

শাহাদাহ্‌র ঘোষণাবাণীর সাথে সম্মতি হবে সম্পূর্ণ দ্বিধামুক্ত। তাছাড়া এটা তো পূর্ণ আনুগত্যের বিষয়। আল্লাহ্‌ তাআলার বাণীতে এর সুন্দর বিবরণ রয়েছে : “আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো বিশ্বাসী নর-নারীর সেবিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না। কেউ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে”। [কুর্‌আন, সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৩৬]  আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের বিধানসমূহ মানুষের মূল্যায়নের বিষয় নয়। সেই বাণী একটি অহি। এর সবকিছুই মানুষের উপকারের জন্য। অতএব, ইসলামের প্রতি মানুষের আনুগত্য তার নিজের কল্যাণের জন্য।

 

৭। আল-ক্ববুল (গ্রহণ)

ইসলামের মহত্ব এবং এটা যে সত্য, তা স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়, বরং তা বীনিতভাবে ও অবনত মস্তকে গ্রহণ করে সেই স্বীকৃতিকে বাস্তবরূপ দিতে হবে। এই সাক্ষ্যবাণীর অর্থের প্রতি আনুগত্য বিশ্বাসীকে মিথ্যা গৌরব, অহংকার ও অবজ্ঞা হতে রক্ষা করে। “তাদের নিকট ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই’ বলা হলে তারা অহংকারবশত অগ্রাহ্য করত”। [কুর্‌আন, সূরা আস্‌-স্বাফফাত, ৩৭:৩৫] একজন মুসলিমের একথা হৃদয়ংগম করা উচিত যে, এই সাক্ষ্যবাণী সংকীর্ণ ও অন্ধানুসরণে বাধা দেয় এবং সৎপথের অনুসারীদের মতানুসারে ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান করে। তাঁরা হলেন সাহাবাবর্গ এবং তাঁরা, যাঁরা কিয়ামতদিবস পর্যন্ত তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। এই পথ সালাফে স্বালিহীনের (সৎ ও নিষ্ঠাবান পুর্বপুরুষগণের) পথ নামে পরিচিত।

 

যারা ইসলামের পথনির্দেশিকা ও শিক্ষা গ্রহণ করে আর যারা তা গ্রহণ করে না, উভয় প্রকার লোকের জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একটি অসাধারণ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলছেন : “আল্লাহ্‌ তাআলা যে পথনির্দেশিকা ও শিক্ষা দিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত হলো ভূপৃষ্ঠে বর্ষিত প্রবল বৃষ্টি। কোনো কোনো ভূমি থাকে উর্বর, যা সেই পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা ও সবুজ তরুলতা উৎপাদন করে। আর তার কিছু অংশ থাকে কঠিন যা বৃষ্টির পানি আটকে রাখে এবং আল্লাহ্‌ তাআলা তাদ্বারা মানুষকে উপকৃত করেন। তারা নিজেরা পান করে, পশুপালকে পান করায় এবং চাষাবাদ করে। আবার কিছু ভূখণ্ড আছে একদম মসৃণ ও সমতল, যা না পানি আটকে রাখে আর না ঘাসপাতা উৎপাদন করে (অর্থাৎ মানুষের কোনো উপকারে আসে না)। প্রথম দৃষ্টান্তটি হলো সেই ব্যক্তির যে আল্লাহ্র দ্বিনের জ্ঞান লাভ করে এবং আল্লাহ্‌ তাআলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাদ্বারা উপকৃত হয়। ফলে তা নিজে শেখে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়। শেষাক্ত দৃষ্টান্তটি হলো সে ব্যক্তির যে সেটাকে কোনো প্রকার গ্রাহ্য করে না এবং আমি যে পথনির্দেশিকা নিয়ে প্রেরিত তা গ্রহণ করে না”। [সহি বুখারি, ১:৭৯]

 

৮। আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা করা হয়,সেসবকিছুর প্রতি অবিশ্বাস

আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “যে ব্যক্তি তাগূতকে (আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যান্য বাতিল উপাস্যসমূহকে) অস্বীকার করবে এবং আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, নিশ্চয়ই সে এমন শক্ত হাতল ধারণ করবে যা কখনো ভাঙ্গার নয়। আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী”। [কুর্‌আন, সূরা বাকারা, ২:২৫৬]

 

আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ্‌ বিন বাযও (রহঃ)তাঁর পুস্তক “আদ-দুরুসুল মুহিম্মাহ্‌ লি-আম্মাতিল উম্মাহ্‌”-র মধ্যে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌র এই শর্তটি অষ্টম নম্বরে উল্লেখ করেছেন।

 

তথ্যসূত্র

http://www.almuflihoon.com/index.php?option=com_content&view=article&id=64:the-conditions-of-laa-ilaaha-illallaah-muhammadun-rasoolullaah-&catid=34:aqeedah&Itemid=140

551 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page