রমজান


আল্লাহ্ তাআলা রমজান মাসকে কল্যাণময় করেছেন। এতে অন্যান্য মাস অপেক্ষা অধিক সুফল ও ফজিলত রেখেছেন। এই মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এই মাসের শেষ দশকের কোনো এক বিজোড় রাতে হয় শবে-কদর (লায়লাতুল ক্বাদ্র)। এই রাতে আল্লাহ্ তাআলার ইবাদত অন্য এক হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। রমযান মাস শুরু হলেই জান্নাতের দরজাগুলি উম্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলি রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। রমযানের প্রত্যেক রাতের শেষাংসে আল্লাহ্ তাআলা ওই ব্যক্তির সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন যে যথানিয়মে সওম পালন করে এবং সর্বধরনের অবাধ্যতা হতে বিরত থাকে।

 

আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করছেন, রসূলুল্লাহ্‌ বলেন : “রমযানের প্রথম রাতেই শয়তান ও অহংকারী জিনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়, অতঃপর তার কোনো দরজা উম্মুক্ত করা হয় না। আর জান্নাতের দরজাগুলি খুলে দেওয়া হয়, অতঃপর তার কোনো দরজা বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে: হে কল্যাণকামী ! সামনে অগ্রসর হও। হে অনিষ্টকামী ! ক্ষান্ত হও। আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দেন আর এমনটা প্রত্যেক রাত্রেই হয়”। (তিরমিযি : ৬৮২; ইবনে মাজাহ্‌ : ১৬৪২; সুনানে নাসায়ি : ৩/২১০৯; সহিহুল জামি’ : ৭৫৯)

 

বিষয়সূচি

 

সওম (রোযা)

সওম শব্দের আভিধানিক অর্থ পরিহার করা, বিরত থাকা। ইস্‌লামি পরিভাষায় এর অর্থ : সওম পালনের সংকল্প (নিয়ত) করে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্তওই সমস্ত জিনিস থেকে বিরত থাকা, যা সিয়ামকে ভেঙে দেয়, নষ্ট করে দেয়।

 

আমরা কেন রোযা করি ?

মানুষে কেন কোনো কাজ করে তা জিজ্ঞাসা করা ও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করা মানুষের স্বভাব। মুসলমানরা কার্য সম্পাদন করে আল্লাহ্‌ তাআলাকে খুশি করার জন্য। আল্লাহ্‌ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর দ্বীন পালন করে তারা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে চায়। এটা আল্লাহ্‌ তাআলার পক্ষ থেকে আমাদের উপর প্রকাশ্য নির্দেশ। আল্লাহ্‌ তাআলার ভীতি এবং তাঁর প্রতি অনুরাগবশে তাঁর আনুগত্য করতে হবে। এছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন : “হে ঈমানদারগণ ! তোমাদের ওপর সিয়ামকে অপরিহার্য কর্তব্যরূপে নির্ধারিত করা হলো যেরূপ নির্ধারিত করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা আত্মসংযমী হতে পার”। [সূরা বাকারা ২:১৮৩]

 

ইবনে উমার (রা.) বর্ণনা করেন : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত :

১। এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর রসূল।

২। পাঁচ ওয়াক্তের সালাত প্রতিষ্ঠা,

৩। যাকাত প্রদান,

৪। হজ্জব্রত পালন,

৫। রমজানের রোযা পালন। (সহি বুখারি : ৭)

 

রোযা কখন আরম্ভ হয় ?

আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “তোমরা (রমজানের) চাঁদ দেখে রোযাশুরু করবে এবং (ঈদের) চাঁদ দেখেই রোযাছাড়বে। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় (এবং চাঁদ দেখা না যায়) তাহলে মাসের ৩০ দিন পূর্ণ করবে”। (মুসলিম : ১০৮১ ও নাসায়ি : ১/১৬৫৪)

 

নতুব চাঁদ দেখার দুআ

 

اللَّهُمَّ أَهْلِّهُ عَلَيْنَا بِالْأمْنِ وَالإِيمَانِ وَالسَّلاَمَةِ وَالإِسْلاَمِ رَبِّي وَرَبُّكَ اللَّهُ ‏

“আল্লা-হুম্মা আহিল্লাহু ‘আলায়না বিল্‌-আমনি, ওয়াল-ঈমানি ওয়াস্‌-সালা-মাতি ওয়াল- ইসলা-মি, রব্বি ওয়া রব্বুকাল্লা-হু”, (হে আল্লাহ্‌ ! তুমি তাকে আমাদের উপর উদিত করো নিরাপত্তা, বিশ্বাস, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে। আমার এবং তোমার প্রভু আল্লাহ্‌)।(তিরমিযি : ৩৪৫১, আলবানি হাদিসটিকে সহি বলেছেন)।

 

রোযার উদ্দেশ্য

 

সূরা বাকারার ১৮৩নং আয়াতে আল্লাহ্‌ তাআলা রোযার অপরিহার্যতার কথা উল্লেখ করেছেন। তার পরেই রোযার উদ্দেশ্য বিবৃত করেছেন। এই আয়াত তাঁর এই বাণী দিয়ে শেষ হচ্ছে : “لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ”  অর্থাৎ (যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো)।

 

রমজানের রোযা পালন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে এটি একটি। রমজান মাসের ফজিলত সীমাহীন যা অন্য কোনো মাসে পাওয়া যায় না। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “যে কেউ ঈমান সহকারে এবং আল্লাহর নিকট সওয়াবপ্রাপ্তির আশায় রমজানের রোযা রাখবে তার বিগত সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে”।(বুখারি : ২০১৪)

 

রোযার জন্য আবশ্যিকভাবে করণীয়

রোযার স্তম্ভসমূহ

১। নিয়ত, অর্থাৎ কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনার্থে রোযা রাখতে হবে। নিয়তের জন্য মৌখিক উচ্চারণের প্রয়োজন নেই। নিয়ত প্রকৃতপক্ষে অন্তরের কাজ, এতে জিহ্বাকে কাজে লাগাতে হবে না। “ওই ব্যক্তির কোনো রোযা নেই যে রাত থেকেই রোযার নিয়ত না করে”। (আবু দাউদ : ২৪৫৪)

 

২। রোযা ভঙ্গকারী সমস্ত কাজ ও জিনিস থেকে বিরত থাকতে হবে। (সূরা বাকারা ২:১৮৭)

 

ইসলামের নিরিখে ইফতার

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে : “রসূলুল্লাহ্‌ সালাত আদায়ের পূর্বেই তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর খেতেন। শুকনো খেজুর না পাওয়া গেলে তিনি কয়েক ঢোক পানি পান করে নিতেন”। (তিরমিযি ৩/৭৯, তিনি বলেন এটি গারিব হাসান হাদিস। আল্‌বানি হাদিসটিকে সহি বলেছেন, দেখুন : আল-ইর্‌ওয়া :৯২২)

 

ফজিলত

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “যে কেউ ঈমান সহকারে এবং আল্লাহর নিকট সওয়াবপ্রাপ্তির আশায় রমজানের রোযা রাখবে তার বিগত সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে”।(বুখারি : ২০১৪)

 

কিয়ামুল লায়ল

আল্লাহ্‌ তাআলা সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় এবং তাঁর নৈকট্য কামনা করে এমন যে কোনো প্রকৃত মু’মিনের জন্য তারাবিহ্‌র সালাত সুন্নাত।

 

আয়িশাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন :আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীর রাতে বের হয়ে মসজিদে সালাত আদায় করেন,কিছু সংখ্যক পুরুষ তাঁর পিছনে সালাত আদায় করেন। সকালে লোকেরা এ সম্পর্কে আলোচনা করেন, ফলে লোকেরা অধিক সংখ্যায় সমবেত হন। তিনি সালাত আদায় করেন এবং লোকেরা তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করেন। সকালে তাঁরা এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। তৃতীয় রাতে মসজিদে মুসল্লীর সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে সালাত আদায় করেন ও লোকেরা তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করেন। চতুর্থ রাতে মসজিদে মুসল্লীর সংকুলান হল না,কিন্তু তিনি রাতে আর বের না হয়ে ফজরের সালাতে বেরিয়ে আসলেন এবং সালাত শেষে লোকদের দিকে ফিরে প্রথমে তাওহিদ ও রিসালতের সাক্ষ্য দেয়ার পর বললেন:শোনো,তোমাদের (গতরাতের) অবস্থান আমার অজানা ছিল না,কিন্তু আমি এই সালাত তোমাদের উপর ফরজ হয়ে যাবার আশংকা করছি (বিধায় বের হইনি)। কেননা তোমরা তা আদায় করায় অপারগ হয়ে পড়তে। (সহি বুখারি ২০১২; মুসলিম : ৭৬১)

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত রাত্রে সালাত প্রতিষ্ঠার প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। এই সালাত কিয়ামুল লায়েল বা তাহাজ্জুদ নামেই সমধিক পরিচিত। রমজান মাসে এই সালাতকে তারাবিহ্‌ও বলে। ইশার সালাতের পর থেকে ফজর সালাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারাবিহ্‌ সালাত প্রতিষ্ঠা করা যায়। রমজান সহ অন্যান্য সমস্ত মাসে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা রাত্রের সালাত এগারো রাকাত আদায় করেছেন। (সহি বুখারি : ১১৪৭ ও ২০১৩; মুসলিম : ৭৩৬; আবুই দাউদ : ১৩৩৫; তিরমিযি : ৪৪০; নাসায়ি : ২/১৬৯৭)

 

ফজিলত

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যে কেউ রমজানে রাত্রের সালাত ঈমান সহকারে এবং আল্লাহ্‌র নিকট সওয়াবপ্রাপ্তির আশায় আদায় করবে তার পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে”।(বুখারি : ২০০৮)

 

ই’তিকাফ

ই’তিকাফ রমজান মাসের একটি বিশেষ ইবাদত। শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার উপাসনার উদ্দেশ্যে যাবতীয় পার্থিব ও ব্যক্তিগত কার্যক্রম ত্যাগ করে মসজিদে নিজেকে আটকে রাখার নাম ই’তিকাফ। ই’তিকাফকারী ব্যক্তির মন-মানসিকতা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উপর নিবদ্ধ হয়ে যায়। ওই সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করে, তওবা করে, আল্লাহ্‌ তাআলার ক্ষমাপ্রার্থনা করে। যতবেশি সম্ভব সে নফল সালাত আদায় করে, যিক্‌র-আয্‌কার করে, দুআ করে ইত্যাদি। এই অর্থে ই’তিকাফ হলো বিভিন্ন ইবাদতকার্যের সমষ্টির নাম।

 

রমজানে ই’তিকাফের সময়কাল  

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন।(বুখারি : ২০২৫)

 

লায়লাতুল ক্বাদ্‌র

লায়লাতুল ক্বাদ্‌র এক হাজার মাস অপেক্ষা অধিক মাহাত্মপূর্ণ ও মূল্যবান একটি রাত। এটি রমজানের একটি রাত যাতে কুরআন লাওহে মাহ্‌ফূয হতে বায়তুল ইযযাতে অবতীর্ণ হয়েছিল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন : “আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে। শবে-কদর সমন্ধে আপনি কি জানেন ?শবে-কদর হলোএক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ”। [সূরা ক্বাদ্‌র ৯৭:১-৩]

 

ফজিলত

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে ও আল্লাহ্‌ তাআলা নিকট সওয়াবপ্রাপ্তির আশায় লায়লাতুল ক্বাদ্‌রে সালাত প্রতিষ্ঠা করবে তার পূর্ববর্তী সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে”। (বুখারি : ২০১৪)

 

কখন এটা আসে ?

এই রজনী প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ দশকের কোনো একটি বিজোড় রাত্রে আসে। এর নির্দিষ্ট সময় অজানা। কেবল এতটুকু জানা যে, এই রজনীটি রমজানের শেষ দশকে কোনো একটি বিজোড় রাত্রে আসে। (বুখারি : ২০২০)

 

রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলিতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) যে দুআ পঠিতব্য

 

اَللَّهُمَّ اِنَّكَ عَفُوٌّ ، تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

“আল্লা-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউন, তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা’ফু ‘আন্নী”, (হে আল্লাহ্‌ ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন)। (ইবনে মাজাহ্‌ : ৩৮৫০; তিরমিযি : ৩৫১৩)

 

আরও দেখুন

যাকাত; যাকাতুল ফিত্‌র; ভাগ্যের প্রতি ঈমান; সওম বা রোযা; ই’তিকাফ; ঈদ;

 

তথ্যসূত্র

[১] http://www.quran4u.com/Tafsir%20Ibn%20Kathir/002%20Baqarah%20I.htm

[২] http://www.islamqa.com/en/49794

[৩] http://quran.com/

[৪] http://www.sunnah.com/

441 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page