যুলহিজ্জাহ্


যুলহিজ্জাহ্‌ ইসলামি বর্ষপঞ্জীর দ্বাদশ এবং সর্বশেষ মাস। এই মাস মুসলমানদের বর্ষপঞ্জীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত মাস। এই মাসেই অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র হজ্জ।

 

“যুলহিজ্জাহ্‌” শব্দের আক্ষরিক অর্থ হজ্জের অধিকারী। এই মাসেই বিশ্বের সর্বপ্রান্ত থেকে হজ্জ পালন করার উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে সমবেত হয়। হজ্জের আসল কার্যাবলি সম্পাদিত হয় এই মাসের ৮ম থেকে ১৩শ তারিখ পর্যন্ত। এই মাসের ৯ম তারিখে আরাফার দিন অনুষ্ঠিত হয়। ঈদুল আয্‌হা (কুরবানির ঈদ) অনুষ্ঠিত হয় এই মাসেরই দশ তারিখে এবং কুরবানি করার সময় অব্যাহত থাকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত।

 

পরিচ্ছদসূচি

 

সূচনা

যুলহিজ্জাহ্‌ একটি বিশাল মহিমান্বিত ও গুরুত্বপূর্ণ মাস, যাতে অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র হজ্জ (মক্কা অভিমুখে বার্ৎসরিক তীর্থযাত্রা)।এই মাস আল্লাহ্‌ তাআলার অঢেল অনুগ্রহ অর্জনের মাস। এই মাসে দশটি রাত রয়েছে আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনের মধ্যে যার শপথ করেছেন, সূরা ফাজ্‌র ৮৯:১-৩। কুরআনের অধিকাংশ ভাষ্যকার বলেছেন এই রাতগুলি দ্বারা যুলহিজ্জাহ্‌ মাসের প্রথম দশটি রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসির ইবনে কাসির, সূরা ফাজ্‌র ৮৯:২)

 

যুলহিজ্জাহ্‌ মাস হলো ইবাদতের একটি মরশুম। ইবাদতের মরশুমগুলি সঙ্গে নিয়ে আসে আল্লাহ্‌ তাআলার অসাধারণ অনুগ্রহ, করুণা ও নেয়ামত। আরও নিয়ে আসে ঈমানশুদ্ধি এবং ভুলত্রুটির ব্যাপক মার্জনার কিছু সুবর্ণ সুযোগ। প্রতিটি সুবর্ণ সুযোগের সাথে সম্পৃক্ত থাকে কিছু ইবাদত, যা বান্দাকে তার প্রভুর নিকটস্থ করে দেয়। আর আল্লাহ্‌ তাআলা যাকে ইচ্ছা অঢেল অনুগ্রহ, করুণা ও কল্যাণ দান করেন। সৌভাগ্যবান তো ওই ব্যক্তি যে এই বিশেষ মাস, দিন ও ঘন্টাগুলির সদ্ব্যবহার করবে এবং আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদত-বন্দেগি করবে। ওই ব্যক্তি আল্লাহ্‌ তাআলার অনুগ্রহ পাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত বান্দা। (ইবনে রাজাব, আল-লাতা-য়িফ, পৃ. ৮)

 

সুন্নাহ্‌

মহানবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী অনুসারে এই মাসের প্রথম দশদিন ইবাদতের বিশেষ সময়। এই সুবর্ণ সুযোগ ওই সমস্ত লোকের জন্যও যারা হজ্জের জন্য ভ্রমণ করে না। এই বিশেষ মুহূর্ত আল্লাহ্‌ তাআলাকে স্মরণ করার এবং তাঁর ইবাদত ও সৎকার্যে অধিক সময় ব্যয় করার। যুলহিজ্জাহ্‌ মাসের প্রথম দশদিনকে কুরআনে লায়া-লি আশারা বলা হয়েছে। (সূরা ফাজ্‌র ৮৯:২) এবং ১১, ১২ এবং ১৩ তারিখকে আইয়ামে তাশরিক্ব বলা হয়েছে।

 

যুলহিজ্জাহ্‌ মাসে সাধারণ ইসলামি কার্যাবলি

  • ৮ম – ১৩শ হজ্জ সম্পাদিত হয়
  • ৯ম যুলহিজ্জাহ্‌, আরাফা-দিবস
  • ১০ম মুসলমানগণ ঈদ উদ্‌যাপন করে
  • ১১-১২ আইয়ামে তাশরিক্ব (ঈদের পর তিনদিন) [২]

 

গুরুত্ব

নিঃসন্দেহে যুলহিজ্জাহ্‌ মাস অসাধারণ ফজিলত ও অনুগ্রহের একটি মাস। বিশেষত এই মাসের প্রথম দশদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামি বর্ষপঞ্জীর সর্বাধিক মাহাত্মপূর্ণ দিনগুলির অন্তর্ভুক্ত। ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “এই দশটি দিন ছাড়া আর এমন কোনোদিন নেই যাতে সৎকর্ম আল্লাহ্‌র কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়”।তখন সাহাবিরা বললেন : “আল্লাহ্‌র রসূল ! আল্লাহ্‌র রাস্তায় জিহাদ করাও নয় ?”আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন : “আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ করাও নয় (অর্থাৎ আল্লাহ্‌র পথে জেহাদ করা থেকেও এই দিনগুলিতে সৎকর্ম করা অধিক প্রিয়)। তবে ব্যতিক্রমওই (জিহাদকারী) ব্যক্তিটি যে বের হয়ে থাকে নিজের জীবন ও সম্পদ হাতে নিয়েএবং এসবের কিছুই নিয়ে ফিরে না আসে (অর্থাৎ যে শহিদ হয়ে যায়)”। (বুখারি : ৯৬৯)

 

যুলহিজ্জাহ্‌ মাসের দশদিনের তুলনায় অন্য কোনো দিনের সৎকর্ম আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় ও মূল্যবান নয়। সুতরাং এই দিনগুলিতে অধিকমাত্রায় পাঠ করা উচিত : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু, আল্লা-হু আক্‌বার, আল্‌হামদুলিল্লা-হ্‌ সুবহা-নাল্লা-হ্‌”।

 

এই হাদিস এবং এই ধরনের আরও অন্যান্য হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই এই দশদিন বছরের অন্য সমস্ত দিন থেকে উত্তম, এমনকি রমজানের শেষ দশদিন থেকেও বেশি। কিন্তু রমজানের শেষ দশ রাত উত্তম, কারণ তার মধ্যে রয়েছে লায়লাতুল ক্বাদ্‌র, যা একহাজার মাস থেকে উত্তম। (তাফসির ইবনে কাসির : ৫/৪১২)

 

এই মরশুমের ফজিলত তথা আল্লাহ্‌ তাআলার পবিত্র গৃহের হজ্জের ফজিলতের জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমসগ্র বিশ্বের মানুষকে সৎকর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করেছেন।

 

আব্দুল্লাহ্‌ বিন উমার (রা.) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “আল্লাহর দৃষ্টিতে এই দশদিন অপেক্ষা অধিক প্রিয় আর কোনো দিন নেই এবং এই দিনগুলির সৎকর্ম যতটা প্রিয় অন্য কোনো দিনের সৎকর্ম ততটা প্রিয় নয়। সুতরাং এই সময় তোমরা অধিকমাত্রায় তাসবিহ্‌ (সুবহানাল্লা-হ), তাহলিল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হ) এবং তাকবির (আল্লা-হু আকবার) পাঠ করো”। (মুসনাদে আহ্‌মাদ : ৭/২২৪)

 

আরাফার রোযা

আবু ক্বাতাদাহ্‌ (রা.) বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “আরাফার দিনের রোযা তার পূর্বাপর দুই বছরের পাপের প্রায়শ্চিত্য”। (সুনানে বাসায়ি : ৪/২০৫; সহি আবু দাউদ : ২/৪৬২)

 

প্রথম দশদিনের কার্যসমূহ

এই দিনগুলিতে যে সমস্ত ইবাদত করা যায় : প্রত্যেকের জানা উচিৎ বান্দাদের জন্য এই দিনগুলি আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহ, আন্তরিক তৎপরতার সাথে সৎকর্মের মাধ্যমে সেগুলোর মূল্যায়ন করতে হবে। সুতরাং যুলহিজ্জার এই দশদিনে যেসব সৎকর্ম সম্পাদন করা মুসলমানদের জন্য বাঞ্ছনীয় ওগুলো নিম্নরূপ :

১। রোযা : যুলহিজ্জাহ্‌ মাসের নবম তারিখে রোযা রাখা সুন্নাত। (নাসায়ি : ৪/২০৫)।

২। “লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আক্‌বার, আল্লা-হু আক্‌বার ওয়ালিল্লা-হিল্‌ হাম্‌দ”, এই দুআটি প্রতি ফরজ সালাতের শেষে পাঠ করতে হবে। এই পাঠকর্ম আরম্ভ করতে হবে যুলহিজ্জাহ্‌র ৯ তারিখের ফজর সালাতে এবং শেষ করতে হবে ১৩ তারিখের আসর সালাতে। (শামি : ১/৪০৬)

৩। কুরবানি : “এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে জীবিকা হিসেবে যা দান করেছেন ওর উপর নির্দেষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে”। [সূরা হাজ্জ্‌ ২২:২৮] অধিকাংশ বিদ্বানের মতানুসারে নির্দিষ্ট দিনগুলি বলতে যুলহিজ্জাহ্‌ মাসের প্রথম দশদিনকে বোঝানো হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন : “নির্দিষ্ট দিনগুলি” হলো যুলহিজ্জাহ্‌ মাসের প্রথম দশদিন।

৪। হজ্জ ও উমরা সম্পাদন : এই দিনগুলিতে একজন মানুষ সবচেয়ে উত্তম যে কাজটি করতে পারে তা হলো পবিত্র কা’বার হজ্জব্রত পালন।

৫। আন্তরিক তওবা : এই দিনগুলির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ্‌ তাআলার সামনে তওবা করা এবং যাবতীয় অবাধ্যতা ও পাপকার্য পরিত্যাগ করা। [৩]  

 

তথ্যসূত্র

[১] http://www.aimnewlife.com/

[২] http://www.ahya.org/amm/modules.php?name=Sections&op=viewarticle&artid=116

[৩] http://islamqa.info/en/ref/books/66

348 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page