মুহাম্মাদ কে ?


অসচেতনতা ও সংশয়ের সর্বোত্তম সমাধান শিক্ষা। মুহাম্মাদ কে ছিলেন ? কতিপয় মানুষ তাঁকে অসাধারণ ভালোবাসেন আর কতিপয় মানুষ তাঁকে অত্যন্ত ঘৃণা করেন, কেন ? তিনি সত্যিই কি আল্লাহর নবি ছিলেন ? তিনি কি স্বীয় দাবি অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করেছিলেন ? তিনি কি যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সন্ত্রাসের প্রতি উৎসাহ দিয়েছিলেন ? এই লোকটি সম্পর্কে প্রকৃত সত্যিটা কী ? সম্প্রতি এই ধরনের কিছু প্রশ্নের জবাব মুসলমানদের জানা অতীব প্রয়োজন।

 

আল্লহ্‌র নবি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের একটি পরিচিতি, তিনি ১৪০০ বৎসর পূর্বে সমগ্র মানবজাতিকে সৎপথের অনুসরণের প্রতি আহ্বান করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে কোথায় বা কখন, সাদা কি কালো এমন কোনো প্রশ্ন ওঠে না। তাঁর বাণী মুসলিম, অমুসলিম, নর-নারী নির্বিশেষে সবার জন্য ছিল। তাঁর বাণীই ছিল সর্বশেষ ও চিরস্থায়ী। তাঁর পরে কোনো নবি আসবেন না। তিনিই ছিলেন সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবি। সুতরাং পশ্চিমা উৎসের পক্ষপাতপুষ্ট না হয়ে উদার মস্তিষ্কে তাঁর সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করুন। আসুন, তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পূর্বে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমরা কিছু জেনে নিই।

 

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র উপর ইসলাম ধর্মের ভিত্তি। কুরআন আল্লাহ্‌র কথা এবং সুন্নাহ্‌ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা। “ইসলাম” একটি আরবি শব্দ। শব্দটি সালাম ও সিল্‌মুন দুটি মূল শব্দ হতে উদ্ভূত। সালামের অর্থ শান্তি এবং সিল্‌ম-এর অর্থ আত্মসমর্পণ। ইসলামি পরিভাষায় ইসলাম বলতে আল্লাহ্‌ তাআলার ইচ্ছার সামনে নিজের ইচ্ছা-বাসনাকে সমর্পণ করে শান্তি অর্জনকে বোঝায়। অর্থাৎ যে সমস্ত বিষয়ের নির্দেশ মহান আল্লাহ কুরআনে দিয়েছেন এবং যা তাঁর প্রিয়নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর সুন্নাতের মাধ্যমে অভিব্যক্ত করেছেন, সেগুলো পালন করা যেমনভাবে তাঁর সাহাবাবর্গ (রাঃ) বুঝেছেন এবং কর্মে বাস্তবরূপ দিয়েছেন।

 

ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। যথা :

(১) শাহাদাহ্‌ অর্থাৎআল্লাহ্‌ ওতাঁররসূলসম্পর্কেসাক্ষ্যবাণী

(২) ফরজস্বালাত

(৩) যাকাত

(৪) জীবনেএকবারমক্কারহজ্জযদিসামর্থ্যহয়,

(৫) রমযানেরসিয়াম।(সহিবুখারি: /)

 

ইসলামের প্রথম স্তম্ভ হলো এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রসূল যিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শেখানো পথে জীবনের সমস্ত বিভাগে ইসলামের অনুশীলন মৌলিক ও সর্বোচ্চ কামনা। 

 

বিষয়সূচি

 

ইসলামে যে কোনো ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড হলো প্রকৃত আনুগত্য

একজন কথাবার্তা ও কাজকর্মে নবির আদর্শকে অনুসরণ করে। এটা সুন্নাহ্‌র জ্ঞান ছাড়া পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। অর্থাৎ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামে প্রবেশ বা মুসলিম হওয়ার মানদণ্ড হলো মরণ পর্যন্ত জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণ।

 

কুরআন

জান্নাতের মানদণ্ড

স্বীয় প্রভুর জান্নাতে প্রবিষ্ট হওয়ার জন্য সমস্ত মানুষকে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং তাঁর শরিয়তের অনুসরণ করতে হবে। “যে কেউ আল্লাহ্‌ ও তদীয় রসূলের আনুগত্য করবে তিনি তাকে এমন জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন যার নিম্নে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত, তারা সেখানে সদা অবস্থান করবে এবং এটাই মহা সাফল্য”। [সূরা নিসা ৪:১৩]

 

সুন্নাহ্‌

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে কেউ আমার আনুগত্য করবে সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌র আনুগত্য করবে আর যে কেউ আমার অবাধ্যতা করবে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা করবে। আর যে ব্যক্তি এমন শাসকের আনুগত্য করবে যাকে আমি নিয়োগ করি প্রকৃতপক্ষে সে আমার আনুগত্য করবে এবং যে কেউ তার অবাধ্যতা করবে প্রকৃতপক্ষে সে আমার অবাধ্যতা করবে”। (সহি বুখারি : ৯/২৫১, সুনানে নাসায়ি : ৫/৪১৯৮)

 

তিনি (সঃ) আরও বলেন : “আমার সমস্ত উম্মতি জান্নাতে প্রবেশ করবে শুধু ওই ব্যক্তি ছাড়া যে অস্বীকার করবে”। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন : “কে অস্বীকার করবে ? হে আল্লাহ্‌র রসূল !” তিনি বললেন : “যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করবে সে (জান্নাতে প্রবেশ করতে) অস্বীকার করবে”। (সহি বুখারি : ৯/৩৮৪)

 

মানব-ইতিহাস

আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনের মধ্যে মুসলমানদেকে পুনঃপুনঃ নির্দেশ দেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিদর্শন করতে, গবেষণা করতে এবং বিগত জাতিগুলির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে। এটা বাস্তব সত্য যে, আল্লাহ্‌ তাআলার চুড়ান্ত বাণীর একটা বড়ো অংশ পূর্ববর্তী লোকদের নৈতিক চেষ্টাসাধনা ও উদ্যমের ঘটনাবলির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সত্যিটা ইতিহাস-শিক্ষা এবং শিক্ষান্বেষণের সঠিক উদ্দেশ্য নিয়ে তার শিক্ষণের গুরুত্বের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত। ইসলামের সফল শিক্ষক এবং দাঈগণ সর্বদা ইতিহাসের গভীর জ্ঞান রেখেছেন।

 

কুরআন অনুসারে, আল্লাহ্‌ তাআলা একটি নির্দিষ্ট লক্ষে এই বিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন। এর সমগ্র অংশ অপরিবর্তনীয়ভাবে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন। সবই তাঁর ঐশ্বরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত। এর মধ্যে সামান্য বিচ্যুতিও ঘটে না। অনুরূপ মানুষকেও একটি নির্দিষ্ট লক্ষে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন। মানুষ যা ইচ্ছা তাই করে এবং নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করে। কিন্তু এই স্বাধীনতা সত্ত্বেও তারা সর্বদা আল্লাহ্‌র পরিদর্শনের মধ্যে থাকে, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এমন কোনো বিচ্যুতি ঘটানোর অনুমতি দেন না যা তাঁর সৃষ্টির পরিকল্পনাকে বিঘ্নিত করতে পারে।  

 

ভূপৃষ্ঠের আকারে একটি সুন্দর পৃথিবীকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ্‌ তাআলা প্রথম মানব ও নবি আদম (আঃ) এবং তাঁর সহধর্মিনী হাওওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন। আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম মানব তথা প্রথম নবি। মানবজাতির নিকট স্বীয় প্রত্যাদেশ প্রেরণ করার জন্য তাদেরই মধ্য হতে কাউকে নবিরূপে নির্বাচন করা আল্লাহ্‌ তাআলার নিয়ম। সুতরাং আল্লাহ্‌ তাআলা একজন ফেরেশ্তার মাধ্যমে নবি আদম (আঃ)-কে জানিয়ে দেন ভূপৃষ্ঠে মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য।

 

 মুসলমানরা আল্লাহ্‌র প্রেরিত সমস্ত নবি ও রসূলের প্রতি বিশ্বাস রাখে। কুরআন বলছে : এর অবতরনের পূর্বে প্রত্যেক জাতির নিকট একজন করে নবি বা রসূল প্রেরণ করা হয়েছিল। প্রত্যেক নবিই স্ব-স্বসম্প্রদায়ের মধ্যে নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তা উভয় দিক থেকেই ছিলেন অসামান্য। প্রত্যেক নবিই স্পষ্ট বলেছেন : তাঁরা নিজেদের পক্ষ হতে কিছুই বলেননি, বরং সবটাই মানবজাতির কল্যাণের জন্য আল্লাহ্‌ তাআলার পক্ষ হতে প্রত্যাদেশ।

 

প্রত্যেকই আল্লাহ্‌ প্রদত্ত অলৌকিক ঘটনা দ্বারা সমর্থন ও সহায়তা পেয়েছিলেন। এই অলৌকিকতা ছিল তাঁদের নবুওয়াতের প্রমাণিকা। নবিগণ এমন মানুষ ছিলেন যাঁরা স্ব-স্বসম্প্রদায়ের মধ্যে ঐশ্বরিক বাণী প্রচার ও প্রসার করেছেন, বিভিন্ন নিদর্শন ও অলৌকিকতা কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট হয়েছিলেন। সমস্ত নবি উপদেশাবলির সাথে প্রত্যাদিষ্ট্ হয়েছিলেন। তাঁরা সেগুলো মানুষকে ঠিক ততটাই শিক্ষা দিতেন যতটা তাঁরা আদিষ্ট হতেন।

 

পরিশেষে পৃথিবীতে সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবি ও রসূলরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম)। তিনি ইব্রাহিম (আঃ)-এর তনয় নবি ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। এবং তিনি আরবের কুরাইশ বংশের মানুষ ছিলেন। সর্বপ্রকার উত্তম গুণ এবং নিখুঁত নৈতিক উৎকর্ষ পূর্ণাঙ্গরূপে তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যদিও তিনি কোনো গতানুগতিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ অর্জন করেননি।

 

পূর্ববর্তী সমস্ত নবি যে বিষয়টির প্রতি মানুষকে আহ্বান করেছিলেন, সেই একই বিষয়ের প্রতি সমগ্র মানবজাতিকে আহ্বান করার জন্য এবং তার নির্দেশনা দেয়ার জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হ ওয়া সাল্লাম নিযুক্ত ও মনোনীত হয়েছিলেন। আর বিষয়টি হলো : শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদত এবং তাতে তাঁর সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করা। কুরআন তাঁর নবুওয়াতের সমাপ্তি ঘোষণা করে বলছে : “তিনি হচ্ছেন নবিদের মোহর”। [সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৪০]

 

প্রথমত আল্লাহ্‌ তাআলার একত্ববাদ ও একেশ্বরবাদের বাণীর ডাকে বিভিন্ন মানুষ সাড়া দিয়েছিল। প্রায় ১০০০ বছর পর বিপথগামিতা এতটাই পরিব্যপ্ত হয়েছিল যে, তারা আদম (আঃ)-এর দেখানো পথ হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পরিশেষে আল্লাহ্‌ তাআলা নূহ (আঃ)-কে নবিরূপে প্রেরণ করলেন। তাঁকে ৯৫০ বৎসরের একটি ব্যতিক্রমী জীবন দান করা হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মানুষকে সৎপথ প্রদর্শন করতে থাকেন। এইভাবে আদম এবং ইসার মধ্যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেক জাতির মধ্যে আল্লাহ্‌র নবিগণ আবির্ভূত হতে থেকেছেন। তথাপি খুব অল্প সংখ্যক মানুষ তাঁদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল আর অধিকাংশ মানুষই তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

 

বিপথগামিতার কারণ

এই ক্রমাগত আইন-লঙ্ঘন ও অধর্মেরকারণ কী ছিল?  দুটি প্রধান কারণ ছিল: রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র ও প্রকৃতির দুনিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা। অন্য কারণটিছিল অজ্ঞতা। প্রাচীনকালেমানুষ পৃথিবীএবং তারবিস্ময়কর বস্তুসম্পর্কে খুব কমই জানত। রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র বৈজ্ঞানিক গবেষণারউপর প্রায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা স্থাপন করেছিল। তাই সমস্ত রকম কুসংস্কার প্রাকৃতিক বিষয়াদির উপর জয়ী ছিল। সাধারণভাবে মনে করা হত যে, সূর্য, চন্দ্র এবং নক্ষত্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। 

 

নবুওয়াতের পূর্বে বিশ্ব

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্বে মানবতা ইতিহাসেরসবচেয়ে সংকটপূর্ণসময়েরমধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, বলা যায় : একটি প্রকৃত অন্ধকার যুগ। মানবজীবন অধঃপতনের চুড়ান্ত সীমায় উপনীত ছিল। কিছুই এই অন্ধকার থেকে মুক্ত ছিল না। এটা মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ঘিরে ফেলেছিল, যথা : ধর্মীয়, নৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। মানবতা সীমাতীতঅশান্তিরমাধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অজ্ঞতা একটি জীবনের সকলদিককে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। জীবনকে বেষ্টন করে ফেলেছিল অনর্থ প্রবৃত্তি, অপরাধ, ধর্মান্ধতা এবং বক্রতা।  

 

আল্লাহ্‌র পাঠানো পূর্ববর্তী শিক্ষার প্রভাব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা অদল-বদল ও প্রতিকল্পনের সঙ্গে এতটাই কলুষিত হয়ে পড়েছিল যে, মানবতার প্রতি আল্লাহ্‌র বার্তাস্বরূপ ওগুলোর যে প্রাসঙ্গিকতা ছিল তারা তা হারিয়ে ছিল। এই ধর্মের অনুসারীগণ পরস্পরের সঙ্গে আদর্শগত সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এটা ঘটেছিলমূল ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিমানুষের হস্তক্ষেপ করার কারণে। এটা প্রায়ই তাদের মধ্যে সহিংস যুদ্ধের পথ দেখিয়েছিল। যারা কলুষমুক্ত বিশ্বাসের উপরছিল তাদের সংখ্যা  খুব অল্প ছিল।যেসামাজিক কাঠামোর মধ্যে তারা  বাস করত তাতে নিজেদের জন্য কোনোস্থান পাচ্ছিল না তারা। তাই তারা সন্যাসী জীবনকে প্রাধান্য দিত এবং নিঃসঙ্গতার জীবন কাটাত। 

 

যাদের নিকট ধর্মীয় গ্রন্থ ছিল তারা স্বীয় ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে পিছনে ছুড়ে ফেলেছিল। তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য ধর্মীয় আইন রচনা করত যার অধিকার আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে দেননি। কিছু ছিল প্রাচ্যে আর কিছু ছিল পশ্চিমে।প্রাচ্যে ছিল পারস্য সাম্রাজ্যএবং পশ্চিমে ছিল রোম সাম্রাজ্য। বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের ইতিহাসে রোম সাম্রজ্য ছিল সবে পদটীকা। সাম্রাজ্যের প্রেক্ষিতে পৃথিবীর দুটি সর্বোচ্চ শক্তিই ছিল এক। 

 

সময়ের এই পর্বে আরব

আরবের মানুষ বিশেষ ভালো অবস্থার মধ্যে ছিল না। তারা বিভিন্ন পরিবার ও গোষ্ঠীভুক্ত ছিল। তাদের বৈশিষ্ট্য ও অনুভূতি ছিল বিভিন্ন। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তারা সবাই এক ছিল। তা হলো : তারা অভ্যাস এবং আবেগের দাসছিল। তারা আক্রমণ এবং লুঠতরাজ নিয়ে গর্ব করত। পরন্তু তাদের নৈতিক অধঃপতন এতটাই ঘটেছিল যে, তাদের একটা অংশ স্বীয় কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিয়ে দিত। 

 

তাদের অন্তর তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতিপ্রেমমুগ্ধ ছিল।তারা দাসোচিতভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের আচার-ব্যবহার এবংঐতিহ্যকে অনুসরণ করত। তারা কতটা পথভ্রষ্ট, কীরূপ বক্রপথে পরিচালিত কিংবা তাদের আচার-ব্যবহার কত কলুষিত, এসব নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। এ কারণেই তারা মূর্তিপূজা করত। প্রতিটি গোষ্ঠীর নিকট নিজস্ব পৃষ্ঠপোষক প্রতিমা ছিল। তারা ইব্রাহিমেরএকেশ্বরবাদের স্থলেমূর্তিপূজা, নক্ষত্রপূজা এবং দৈত্যপূজাকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। যে কা’বা শুধুমাত্র অদ্বিতীয় আল্লাহ্‌র জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল সেটাকে তারা মন্দিরে বদলে ফেলেছিল। তাছাড়া আরবের জ্বলন্ত মরুভূমির ন্যায় তাদের মধ্যে উপজাতীয় রেষারেষি, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, চরম শত্রুতা ও রক্ত প্রবাহ চলতে থাকত।  

 

এই প্রধান মূর্তিগুলির পাশাপাশি অগণিত ছোটোছোটো মূর্তিছিল। ওগুলোর মধ্যে কিছু ছিল মৌসুমী। আবু রাজা (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “আমরা পাথর পূজা করতাম। যখনই আমাদের পাথর অপেক্ষা অধিক সুন্দর কোনো পাথর আমরা দেখতাম তখনই আমাদের পাথরখানি সরিয়ে ফেলে তার স্থানে সেই সুন্দর পাথরখানি প্রতিস্থাপিত করতাম। কোনো পাথর পাওয়া না গেলে আমরা কাদার ঢিপি তৈরি করতাম। অতঃপর কোনো ভেড়ার দুধ এনে ওই ঢিপির উপর ঢালতাম। তারপর ঢিপিটিকে প্রদক্ষিণ করতাম”। (সহি বুখারি)

 

যদিও তারা দাবি করত যে, তাদের মূর্তিগুলিতাদের এবংআল্লাহর মধ্যে কেবল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে,  কিন্তু এই বাতিল উপাস্যগুলি তাদের অন্তর, তাদের কর্ম, তাদের আচার-আচরণ এবং তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের উপর সম্পূর্ণ দখল নিয়েছিল। আল্লাহসম্পর্কেতাদের চেতনা ছিল খুবই দুর্বল। 

 

আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “আর আল্লাহ্‌ যেসব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা এর একটি অংশ আল্লাহ্‌র জন্য নির্ধারিত করে। আর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এ অংশ আল্লাহ্‌র জন্য এবং এ অংশ আমাদের শরীকদের জন্য; কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে তা তো আল্লাহ্‌ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, পক্ষান্তরে যা আল্লাহ্‌র জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাদের বিচার-নীতি কতই না নিকৃষ্ট !” [সূরা আনআ’ম ৬:১৩৬]

 

এমনকি নবী ইব্রাহিম(আঃ)-এরধর্ম দুর্নীতি ও প্রতিকল্পন থেকে মুক্ত থাকেনি। হজ্জ হয়ে গিয়েছিল দম্ভপ্রকাশ, শত্রুতা পোষণ এবং পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মরশুম। ধর্মের বিশুদ্ধ বিশ্বাসগুলিদুর্বল, অখ্যাতও অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাতে কুসংস্কার ও উপকথা ঢুকে গিয়ে তার প্রকৃত রূপ বিকৃত হয়ে উঠেছিল এবং তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তার পবিত্র উৎস হতে। 

 

যায় হোক, মানুষ যতই কলুষিত হোক এবং যতই পথভ্রষ্ট হোক, ভূপৃষ্ঠে সর্বদা মানুষের এমন একটি দল থাকবে যারা প্রকাশ্যে, স্পষ্টভাবে এবং নির্দ্বিধায় সত্যের প্রচার ও প্রসার ঘটাবে। এ কাজে তারা কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ করে না এবং কাউকে ভয় পায় না। পরিশেষে যে কোনো প্রকারে সাফল্য তাদেরই হয়।সত্য ও অবিশ্বাসের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের মধ্যে সাফল্য কখনো সত্যের পক্ষে যাবে তো কখনো বাতিলের পক্ষে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “এই দিবসসমূহকে আমি মানবগনের মধ্যে পরিক্রমণ করাই”। [সূরা আল-ইম্‌রান ৩:১৪০]

 

মক্কার মানুষ একটি বিশাল আকারে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ব্যবসা করত। অনেক সময় একশো শতাংশ সুদ নিত। যখন ঋণগ্রস্ত লোকেরা ঋণ পরিশোধ করতে পারত না –আর এমনটা প্রায়ই ঘটত- তখন তাদেরকে দাসত্ব স্বীকার করতে বাধ্য করা হত অথবা তাদের স্ত্রী এবং কন্যাদেরকে বলপূর্বক পাপ করতে বাধ্য করা হত যেন তারা ঋণ পরিশোধ করার জন্য যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করতে পারে।

 

সময়ের এই পর্বে বিশ্ব

অজ্ঞতা আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অজ্ঞতা পৌঁছে গিয়েছিল আরবের প্রত্যন্তে যেখানে মরুভূমি অতিথীপরায়ণ ভূমির পথ দেখায়। অজ্ঞতা পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের দাম্ভিকতা, অর্থাৎ ফরাসী ও রোম সাম্রাজ্যের মতো দুটি অতিশয় শক্তির সদাপরিবর্তশীল সীমানা পর্যন্ত।  

 

অগ্নিপূজক ফরাসিগণ তাদের দ্বৈতবাদের অদ্ভূত দৃষ্টিভঙ্গিসহ মায্‌দাকি মতবাদের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল (মায্‌দাকি মতবাদ ছিল একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন যা সাসানী কাবাদের (৪৮৮-৫৩১ CE) মধ্যে উদ্দীপ্ত ছিল। এটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বামদাদ তনয় মায্‌দাক)। এই মতবাদ সাম্প্রদায়িক মালিকানাকে সমর্থন করত। এর এও বিধান ছিল যে, নারীরা সমস্ত পুরুষের সাধারণ সম্পত্তি। কয়েক শতাব্দী পূর্বে লাইক মানীযীশু ও জরথুষ্ট্রের শিক্ষার মিশ্রন দ্বারা একটি নতুন ধর্মেরদাবি করেছিলেন। মায্‌দাকি আন্দোলন ছিল প্রথাগত যাজকীয় সম্প্রদায়ের দূর্নীতির প্রতিক্রিয়া। উভয় মতবাদই তাদের প্রবক্তাদের প্রাণদণ্ডের পর নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা অল্প-বিস্তর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। অপর পক্ষে জরথুষ্ট্রেরপাদরিবর্গের সাথে দলবদ্ধ সাসানী অভিজাত-সম্প্রদায় আনন্দের মধ্যে নিমগ্ন ছিল। নিপীড়িত জনগণের উপরতারা ভারী শুল্ক ও নিপীড়নের বোঝা চাপিয়ে তাদেরকে নিষ্পেষিত করত। 

 

অন্য দিকে ছিল বাইজান্টাইন বিশ্ব। তারা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে বলে দাবি করত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা নবি ইসা (আঃ)-এর একেশ্বরবাদী বার্তাকে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান পৌত্তলিক চিন্তার বর্জ্যদিয়ে দূষিত করে ফেলেছিল, যার ফলে খ্রিষ্টীয় ধর্মের আবির্ভাব ঘটে।৩৮১খ্রিস্টাব্দে গ্রেকো-রোমান চার্চ কাউন্সিল আলেকজান্দ্রিয়ার  আর্‌ইয়ুস মতবাদ বাতিলকরে দেয়।সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অধিকাংশমানুষ এর অনুগত ছিল।এর স্থলে কাউন্সিল এই বিশ্বাস উদ্ভাবন করল যে, ইশ্বর এবং যিশু একই সত্তা আর তাই তাদের অস্তিত্ব অভিন্ন। আর্‌ইয়ুস এবং তার অনুসারীরা এই বিশ্বাস পোষণ করত যে, ইশ্বর সার্বভৌম এবং অদ্বিতীয়। তারা বলত : ইশ্বর অনাদী ও অনন্ত, অপরপক্ষে যিশু একটি সময়ে সৃজীত হয়েছে। 

 

পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ইহুদিদের উপনিবেশ। তাদের নিকট আল্লাহ্‌ তাআলা অনেক নবি প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের সংশোধন ও সংস্কার হয়ে ওঠেনি। মুসা (আঃ)-এর নিকট পাঠানো আইনে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল এবং তাতে বিকৃতি ঘটানো হয়েছিল।  

 

 আরও পূর্বে চিন ও ভারতের সংস্কৃতি আড়ম্বরপূর্ণ অবস্থায় বিরাজিত ছিল, যা প্রকৃতপক্ষে ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। কনফিউসিয়াস মতবাদ চিনে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেই মতাবাদ তাদের মস্তিষ্ক হতে ইতিবাচক চিন্তাধারা হরণ করেছিল। অপর দিকে হিন্দুধর্ম কোনো সার্বজনীন দাবি করত না এবং ভৌগলিকভাবে তা ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, অথবা বিশেষ করে উত্তর ভারত এবং আর্য সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল।

 

এক কথায়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তলিলা, দাসত্ব, নারীদের উপর অত্যাচার ও বঞ্চনা সর্বত্র ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সত্যের উপর শাসন চালাত ক্ষমতা। বিশ্ব ভয়ানক দুর্দশার মধ্যে ছিল, কিন্তু তাকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে কেউ সক্ষম ছিল না। ওই সময় কোনোধর্ম, মতাদর্শ, ধর্মবিশ্বাস বা অর্চনামানবজীবনের দুঃসহ যন্ত্রণা ও নৈরাশ্যের সামনে আশার কোনো আলো দেখাতে পারেনি।  

 

প্রচলিত কোনো ধর্মেরই কোনো সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি বা দাবি ছিল না এবং অনতিক্রম্য ভৌগোলিক ও মানসিক বাধার মধ্যেসীমাবদ্ধ ছিল এবং একটি নির্দিষ্ট জাতির বৈষম্য ও সংকীর্ণমনা শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করত। 

 

নবির প্রয়োজন

সর্বত্র যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তলিলা, দাসত্ব, নারীদের উপর অত্যাচার ও বঞ্চনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সত্যের উপর ক্ষমতা শাসন চালাত। বিশ্ব ভয়ানক দুর্দশার মধ্যে ছিল, কিন্তু তাকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে কেউ সক্ষম ছিল না। ওই সময় কোনোধর্ম, মতাদর্শ, ধর্মবিশ্বাস বা অর্চনামানবজীবনের দুঃসহ যন্ত্রণা ও নৈরাশ্যের সামনে আশার কোনো আলো দেখাতে পারেনি। 

 

 প্রচলিত কোনো ধর্মেরই কোনো সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি বা দাবি ছিল না এবং অনতিক্রম্য ভৌগোলিক ও মানসিক বাধার মধ্যেসীমাবদ্ধ  ছিল এবং একটি নির্দিষ্ট জাতির বৈষম্য ও সংকীর্ণমনা শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করত। 

 

তাই এহেন সংকটপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ তাআলা সর্বশেষ মহানবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে ইসলামের সার্বজনীন বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন মানবজাতিকে অবিশ্বাস, অন্যায়-অনাচার, কলুষতা, অজ্ঞতা ও নৈতিক অধঃপতন থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য যা মনবতাকে বিনাশের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

 

বানি-ইস্রাইলের মধ্যে বিবাদ-বিচ্ছিন্নতা জন্ম নিয়েছিল। তারা স্বীয় ধর্মবিশ্বাস ও আইনের মধ্যে পরিবর্তন ও পরিবর্জন করে ফেলেছিল। এভাবে সত্য নির্বাপিত হয়েছিল এবং মিথ্যা মাথা চাড়া দিয়েছিল। অন্যায়-অনাচার ও অনৈতিকতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। মানুষের প্রয়োজন ছিল এমন একটি ধর্মের যা সত্য প্রতিষ্ঠিত করবে, মন্দের মূলৎপাটন ঘটাবে এবং মানুষকে সোজা পথের সন্ধান দেবে। এজন্যই আল্লাহ্‌ তাআলা মহানবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন :

 

 “আমি তোমার প্রতি কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি যেন তুমি তাদেরকে ওই সমস্ত বিষয় সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও যাতে তারা মতভেদ করেছে এবং মু’মিনদের জন্য পথনির্দেশ ও অনুগ্রহস্বরূপ”। [সূরা নাহ্‌ল ১৬:৬৪]

 

ইব্রাহিম পর্যন্ত নবি মুহাম্মাদের বংশপরম্পরা

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশ ও পরিবার 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশধরের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি ! তাঁর বংশ-পরম্পরার তিনটি পর্যায় বর্ণিত আছে। প্রথমটিকেজীবনীকার ও বংশধারাবিশেষজ্ঞগণ বিশুদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন। এই পর্যায়ে তাঁর বংশধারা আদনান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। দ্বিতীয়টিতে মতভেদ ও সন্দেহ রয়েছে। এই পর্যায়ে তাঁর বংশধারা আদনা হতে উপরে ইব্রাহিম (আঃ) পর্যন্ত যায়। তাঁর বংশধারার দৃতীয় পর্যায় নবি ইব্রাহিম হতে উপরে নবি আদম (আঃ) পর্যন্ত। এর একাংশ নিশ্চিত অশুদ্ধ। 

 

প্রথম পর্যায় : মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্‌ বিন আব্দুল মুত্তালিব (তাঁকে শায়বা বলা হত) বিন হাশিম (তাঁর নাম আম্‌র) বিন আব্দে মানাফ (মুগিরা নামে পরিচিত ছিলেন) বিন কুসাই (যায়দ) বিন কিলাব বিন মুররাহ্‌ বিন কা’ব বিন লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহ্‌র (তাঁর উপাধি ছিল কুরাইশ, এই সূত্রেই কুরাইশ বংশের উদ্ভব) বিন মালিক বিন আন-নায্‌র (কায়স) বিন কিনানাহ্‌ বিন খুযায়মা বিন মুদ্‌রিকাহ্‌ (আমির) বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নিযার বিন মা'’দ বিন আদনান। (ইবনে হিশাম : ১/১,২; রহ্‌মাতুল্লিল আ-লামীন : ২/১১-১৪, ৫২)

 

নবিইব্রাহিম (সঃ)-কেব্যাপকভাবে তাওহিদেরকুলপতি এবং ইহুদি,  খ্রিস্টান ও মুসলমানদের সাধারণ পিতা  হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর দ্বিতীয় পুত্রইসহাকেরসূত্রে  সমস্ত ইস্রাইলীয় নবিগণএসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন : ইয়াকুব, ইউসুফ, মুসা, দাউদ, সুলায়মান এবং ইসা (তাঁদের সকলের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)।আল্লাহ্‌ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নবি ইব্রাহিম (আঃ)-এর বংশধরের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির প্রতি অনুগ্রহ করার। [সূরা জুম্‌আহ্‌ ৬২:২]  এই মহান নবিগণের আবির্ভাব ছিল আল্লাহ্‌ তাআলার প্রতিশ্রুতি রক্ষার অংশস্বরূপ। এমন প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা মুসলমানগণ মনেপ্রাণে গ্রহণ করে যাদের ঈমানের একটি অঙ্গ সমস্ত নবির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। 

 

আল্লাহ্‌ তাআলা আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি নবি ইসমাঈল (আঃ) এবং তাঁর বংশধরের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। [সূরা বাকারা ২:১২৯] সর্বশেষ ইস্রাইলীয় নবি ও রসূল “ইসা (আঃ)”-এর পর আল্লাহ্‌ তাআলা এই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেছিলেন। ইসা (আঃ)-এর প্রায় ৬০০ বছর পর আল্লাহ্‌ তাআলার সর্বশেষ রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নবি ইসমাঈলের সূত্রে নবি ইব্রাহিমের বংশধর হতে আবির্ভূত হন। নবিমুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামছিলেননবিইসমাঈলের বংশধর। তার সূত্র ছিল ইসমাঈলের দ্বিতীয় পুত্র কেদারের বংশ। ইব্রাহিমের পরিবার পরম্পরার মূল শাখা দুটিরই প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ পূর্ণতা লাভ করেছিল।  

 

 

 

 

আদম

 
 

 

 

 

 

 

 

     

 

     

 

 

 

নূহ

 

 

 
 

 

 

 

 

 

 

             

 

             

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ইব্রাহিম

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

     

 

ইসমাঈল

 

ইসহাক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

     

 

 

 

 

 

     

 

 

 

 

মুসা

 

 

     

 

     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

     

 

     

 

 

 

 

 

দাউদ

     

 

     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

           

 

             

 

 

 

 

ইসা

         

 

         

 

 

 

 

       

 

           

 

                     

 

 

আব্দুল মুত্তালিব

             

 

             

 

 

 

 

 

 

 

 

           

 

             

 

 

 

মুহাম্মাদ (সঃ)

         

 

         

 

                                             

 

 

বিঃদ্রঃ বিন্দু দ্বারা চিহ্নিত লাইনগুলি একাধিক নির্দেশ করে

অহির সূচনা

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উপর প্রথম অহি অবতীর্ণ হয়েছিল হেরা গুহায়। সেখানে তিনি গিয়ে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। হঠাৎ একদিন জিব্রাইল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করে বললেন : পড়ো। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “আমি পাঠক নই”। আবার এর পুনরাবৃত্তি ঘটল। তৃতীয়বার তিনি তাঁকে বললেন : “পড়ো সেই প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক অধিকতর মহানুভব”। [সূরা আলাক্ব ৯৬:১-৩]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন; সে সময় তাঁর হৃদয়-স্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। তিনি পত্নী খাদিজা (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত তাঁকে খুলে বললেন। তিনি বললেন : “আমি খুব ভয় পাচ্ছি”। খাদিজা (রাঃ) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন : “আল্লাহ্‌র শপথ ! আল্লাহ আপনাকে কখনোপরিত্যাগ করবেননা। কারণ আপনি আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেন, দুর্বলদের সহযোগিতা করেন, আতিথীদের সম্মান সেবাযত্ন করেন, অভাবগ্রস্থদের অভাব মোচন করেন এবং বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন”।

 

পরের দিন খাদিজা (রাঃ) তাঁকে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারক্বা বিন নাওফালের নিকট নিয়ে গেলেন। তিনি খ্রিস্টান ধর্মালম্বী ছিলেন। তিনি তাঁকে সব ঘটনা খুলে বললেন। সবকিছু সবিস্তারে শুনে ওয়ারক্বা তাঁকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন : এ তো না-মুস (একজন ফেরেশ্তা) যাঁকে আল্লাহ্‌ তাআলা নবি মুসা (আঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। ওয়ারক্বা তাঁকে ধৈর্যধারণের প্রতি উৎসাহ দিলেন যদি তাঁর সম্প্রদায় তাঁর উপর অত্যাচার করে এবং তাঁকে দেশ হতে বহিষ্কার করে দেয়। (সহি বুখারি, অহি অধ্যায়, হাঃ ৩) এরপর অহি আসা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় আর এ সময় রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন। একদিন তিনি পথ ধরে চলছিলেন, হঠাৎ তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থানে ওই ফেরেশ্তাকে পুনরায় দেখতে পেলেন। তিনি গৃহে ফিরে ভয়ে বিস্ময়ে বস্ত্রাবৃত হলেন। অতঃপর আল্লাহ্‌ তাআলা অহি অবতীর্ণ করলেন : “ওহে বস্ত্রাবৃত ব্যক্তি ! ওঠো এবং সতর্ক করো”। [সূরা মুদ্দাস্‌সির ৭৪:১-২]

 

তারপর থেকে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উপর ক্রমাগত অহি অবতীর্ণ হতে থাকে। নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ১৩ বছর মক্কায় অবস্থান করলেন। প্রথমে গোপনে এবং পরে প্রকাশ্যে তিনি মানুষকে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদতের প্রতি আহ্বান করতে থাকেন। তিনি কোনো সংঘাতে না গিয়ে অত্যন্ত মৃদু, ভদ্র ও সদয় পদ্ধতিতে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। প্রথমে তিনি নিজের বংশ এবং নিকটতম আত্মীয়-স্বজনকে আহ্বান করেন, তারপর পারিপার্শ্বিক লোকজনকে আহ্বান করেন, অতঃপর সমগ্র আরববাসীকে আর পরিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে সতর্কবাণী দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন : “অতএব যে বিষয়ে তুমি আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং উপেক্ষা করো মুশরিক্‌দেরকে (বহুদেববাদীদের, মূর্তিপূজকদের এবং অবিশ্বাসীদের)”। [সূরা হিজ্‌র ১৫:৯৪]

 

মক্কী জীবন

মক্কী জীবনকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায় :

১।গোপনআহ্বানেরপর্যায়:  তিনবছর।

২।মক্কায়প্রকাশ্যআহ্বানেরপর্যায় : নবুওয়াতেরচতুর্থবছরহতেপ্রায়দশমবছরেরশেষাবধি।

৩।মক্কারবাইরেইসলামেরপ্রচারওপ্রসারেরপর্যায় :  নবুওয়াতেরদশম বছরেরশেষভাগহতেমদিনায়হিজরতপর্যন্ত।

 

কতিপয় ধনী ও উচ্চপদস্থ লোক, কতিপয় দুর্বল ও দরিদ্র, নর ও নারী নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা সকলেই তাঁদের ঈমানের জন্য নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন। একাংশ উৎপীড়নের স্বীকার হয়েছিলেন আর একাংশ শহিদ হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কুরাইশদের নিপীড়ন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যআবিসিনিয়াহিজরত করে চলে যান। আর কেউ কেউ নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে নির্যাতিত হতে থাকেন যে পর্যন্ত না আল্লাহ্‌ তাআলা স্বীয় ধর্মকে সমুন্নত করেন। 

 

যখন রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বয়স পঞ্চাশ এবং তাঁর মিশনের বয়স দশ তখন তাঁর চাচা আবু তালিব মৃত্যুবরণ করেন, যিনি তাঁকে কুরাইশের নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতেন। তারপরেই তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) মৃত্যুবরণ করেন, যে খাদিজা ছিলেন তাঁর স্বান্তনা। এরপর থেকেই তাঁর কওমের নির্যাতন তীব্রতর হয়ে ওঠে। তারা তাঁর প্রতি আক্রমণ করত, তাঁকে সর্বতোভাবে যন্ত্রণা দিত। কিন্তু তিনি সবকিছুই ধৈর্যের সাথে সহ্য করতেন এবং তার প্রতিদান আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট কামনা করতেন। তাঁর উপর অসংখ্য শান্তির ধারা বর্ষিত হোক !

 

যখন কুরাইশেরনিপীড়ন অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠেতখন তিনি তায়েফ গেলেন এবং সেখানকার মানুষকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করলেন। কিন্তু তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তাঁকে অপমানিত করেছিল এবং তাঁর উপর পাথর বর্ষণ করেছিল, এমনকি তাঁর পাদুকাদ্বয় রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি মক্কা প্রত্যাবর্তন করে হজ্জের মরশুম তথা অন্য সময়ে মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার কাজ অব্যাহত রাখেন। 

 

অতঃপর আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর নবির (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য কিছু লোককে পাঠালেন। হজ্জের মরশুমে মদিনার খায্‌রাজ গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় ফিরে গিয়ে ইসলামের প্রচারকার্য চালাতে শুরু করেন। পরবর্তী বছর দশজনেরও কিছু বেশি লোকের সঙ্গে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরাও ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রত্যাবর্তনকালে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সঙ্গে মুস্‌আব বিন উমায়ের (রাঃ)-কে পাঠালেন তাঁদেরকে কুরআন ও ইসলামের শিক্ষা দেয়ার জন্য। তাঁর হাতে আ’স, সা’দ ইবনে মুআয এবং উসায়েদ ইবনে হুযায়ের গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গসহ প্রচুর মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যান।

 

পরবর্তী হজ্জের মৌসুমে আ’স এবং খায্‌রাজ গোত্রের সত্তরজনেরও অধিক মুসলিম মক্কা আগমন করেন এবং মক্কাবাসীর উৎপীড়ন ও বয়কট হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে মদিনা আগমনের আমন্ত্রণ জানান। আয়্যামে তাশরিকের কোনো এক রাত্রে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আকাবা প্রান্তে তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করার বন্দোবস্ত করেন। রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচা আব্বাসের সঙ্গে ছিলেন। তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন যে, আপন ভ্রাতুষ্পুত্রের সমস্যায় উপস্থিত থাকেন এবং তাঁর যত্ন নেন। আব্বাস, রসূলুল্লাহ্‌ এবং মদিনা থেকে আগত লোকজন স্বাচ্ছন্দে কথাবার্তা বলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁদের আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করলেন এই কথার উপর যে, তিনি মদিনায় তাঁদের নিকট হিজরত করে যাবেন আর তাঁরা তাঁকে নিরাপত্তা দেবেন, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করবেন, তাঁর প্রতিরক্ষা করবেন এবং বিনিময়ে তাঁরা জান্নাত প্রাপ্ত হবেন। তাঁরা এক এক করে আনুগত্যের শপথ দিলেন অতঃপর সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। কুরাইশ তাঁদের সম্পর্কে জানতে পেরে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁদেরকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আরও কিছুদিন মক্কায় অবস্থান করেন।

 

“নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ মহাশক্তিশালী, পরাক্রমশালী”। [সূরা হাজ্জ ২২:৪০]

 

তারপর রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবাবর্গকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন, তাই তাঁরা দলবদ্ধভাবে মদিনায় হিজরত করেন। তবে যে সকল মুসলমান নরনারী কুরাইশদের দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত ও বন্দী হয়েছিলেন তাঁরা হিজরত করতে পারেননি। তাছাড়া রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, আবু বাক্‌র এবং আলি (রাঃ) ব্যতীত মক্কায় কোনো মুসলমান অবশিষ্ট ছিলেন না। মুশরিক্‌রা অনুভব করল রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গীরা মদিনায় হিজরত করেছেন, তাই তারা ভয় পেল মুহম্মদ(সঃ) সেখানে পালিয়ে গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন। তাই তারা তাঁকে হত্যা করার জন্য ঐক্যমত হল। জিব্রাইল মারফত রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকুরাইশদের ষড়যন্ত্রের কথা অবগত হলেন। অতঃপর তিনি আলি (রাঃ)-কে তাঁর শয্যায় শয়ন করতে আদেশ করলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উপর আমানতস্বরূপ যেসব জিনিস ন্যাস্ত ছিল তিনি সেগুলো প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিলেন। মুশরিক্‌রা রাত্রি জেগেনবির গৃহ পাহারা দিতে লাগল এবং প্রত্যুষে যখন তিনি ঘর থেকে বের হবেন তখন তাকে হত্যা করার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।কিন্তু তিনি তাদের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে গিয়ে আবু বাকরের ঘরে গিয়ে পৌঁছলেন। এভাবে আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করলেন। আল্লাহ্‌ তাআলা অবতীর্ণ করেন : “এবং(হে মুহম্মদ(সঃ)! সেই ঘোর বিপদের কথা স্মরণ করো) যখন অবিশ্বাসীরা তোমার সম্বন্ধে- তোমাকে বন্দী করে রাখবে কিংবাতোমাকে হত্যা করে ফেলবেকিংবাতোমাকে দেশ হতে বহিস্কার করে দেবে- এ নিয়ে ষড়যন্ত্র করছিল”। [সূরা আন্‌ফাল ৮:৩০]

 

সুতরাং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের  দ্রুতই হিজরত করার সংকল্প নিলেন। অতঃপর তিনি আবু বাক্‌রকে নিয়ে সাওর গুহার দিকে রওয়ানা হলেন। সেখানে তাঁরা তিন রাত অবস্থান করলেন। তাঁরা আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে উরাইক্বিত নামক একজন মুশরিককে তাঁদের পথপ্রদর্শক হিসেবে মজুরির উপর নিযুক্ত করেছিলেন এবং তার নিকট দুটি উঁটও রেখেছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর কুরাইশ তাঁকে সর্বত্র খোঁজ করল, কিন্তু আল্লাহ্‌ তাআলা স্বীয় নবিকে রক্ষা করলেন। যখন তাদের তল্লাশি-প্রচেষ্টা কিছুটা শিথিল হল তখন তাঁরা মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। যখন কুরাইশ তাঁদেরকে পাওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়ল তখন তারা ঘোষণা করল যে, যে কেউ তাঁদের উভয়কে কিংবা কোনো একজনকে ধরে আনতে পারবে তাকে দুশো উঁট পুরস্কার দেয়া হবে। ফলে মানুষ তাদের অনুসন্ধান-প্রচেষ্টা জোরদার করে দিল। মদিনার পথে সুরাকা ইবনে মালিক তাঁদেরকে দেখতে পেলেন। তিনি সে সময় মুশরিক ছিলেন। তিনি তাঁদের পিছু ধাওয়া করলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তার জন্য বদদুআ করলেন। ফলে তাঁর অশ্বের সম্মুখের পদদ্বয় মাটিতে প্রোথিত হল এবংতিনিছিঁটকে ভুপাতিত হলেন। তিনি বুঝতে পারেন রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিরাপদ রয়েছেন। তিনি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে দুআ করতে বললেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তিনি তাঁদের কোনো ক্ষতি করবেন না। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করলেন এবং তিনি সেখান থেকে ফিরে গেলেন এবং তাঁদের দিক থেকে মানুষকে অন্যমনষ্ক করে দিলেন। অতঃপর মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

 

মাদানী জীবন

মদিনার সময়কালকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে :

১। এই পর্যায়ে ছিল অসংখ্য কষ্ট, বিভেদ ও বাধা-প্রতিবন্ধকতা, ছিল ইসলামের প্রতিকূল তরঙ্গ এবং ক্রমবর্ধমান ঈমানের মূলৎপাটনের পরিকল্পনা। এই পর্যায়টি ৬ হিজরির যুল-কা’দা মাসে হুদায়বিয়ার শান্তি চুক্তিতে সমাপ্ত হয়।  

২। দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিলপৌত্তলিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির এবং এর সমাপ্তি ঘটেছিল ৮ হিজরির রমযান মাসে মক্কা বিজয়ে। এই পর্যায়কে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আরবের বাইরের রাষ্ট্রনায়কদেরকে ইসলামের পরিমণ্ডলে প্রবিষ্ট হওয়ার জন্য আহ্বান করার পর্যায় বলা হয়।

 

২। তৃতীয় পর্যায়ে মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণের প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মুখপাত্রগণ রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য মদিনায় আগমন করতেন। এই পর্যায়টির সমাপ্তি ঘটেছিল ১১ হিজরির রাবিউল আওওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইনতিকালে।

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা পরিত্যাগ করে মদিনায় আগমন করেন। তাঁকে মদিনায় প্রবেশ করতে দেখেই মুসলমানগণ আনন্দে উচ্চকণ্ঠে তাকবির বলতে শুরু করেন। মক্কা হতে মদিনায় এই অভিপ্রয়াণকে হিজরত বলা হয়। এই বিশাল ও মহত্বপূর্ণ ঘটনার উপর ভিত্তি করেই মুসলিম পঞ্জিকার গণনা হয়। নর, নারী ও কচিকাচারা প্রফুল্ল মনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি কুবায় অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি মুসলমানদেরকে সঙ্গে নিয়ে কুবা মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তিনি চারদিনসেখানে অবস্থানকরেছিলেন। শুক্রবারে তিনি সেখান থেকে রওয়ানা হলেন এবং বানি সালিম ইবনে আওফের আবাসস্থানে জুমআর স্বালাত আদায় করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর উষ্ট্রীতে আরোহণ করে মদিনায় প্রবেশ করলেন। মানুষ তাঁর চারপাশে থেকে তাঁর উষ্ট্রীর লাগাম ধরেছিলেন। সবাই চাচ্ছিলেন তিনি যেন তাঁদের সঙ্গে এসে থাকেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে বললেন : “উষ্ট্রীর পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে নির্দেশিত রয়েছে। ফলে উষ্ট্রী চলতেই থাকল এবং সেই স্থানে গিয়ে বসে পড়ল যেখানে মসজিদে নাবাবি রয়েছে।  

 

আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর নবির জন্য মসজিদের পার্শ্বে তাঁর মামাদের সাথে থাকার সুযোগ করে দিলেন। তাই তিনি আবু আইয়ুব আনসারির গৃহে অবস্থান করলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা হতে তাঁর পরিবার ও কন্যাদেরকে এবং আবু বাকরের পরিবারকে নিয়ে আসার জন্য কাউকে পাঠালেন এবং তিনি তাঁদেরকে মদিনায় নিয়ে এলেন।

 

তারপর মহানবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাবর্গ তাঁর মসজিদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ করলেন সেই স্থানে যেখানে তাঁর উষ্ট্রী বসে পড়েছিল। তিনি বায়তুল মাক্বদিসের অভিমুখে ক্বিবলা তৈরি করেছিলেন।এর খুঁটিগুলিগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এবং এর ছাঁদ তৈরি করা হয়েছিল খেজুরের শাখাপ্রশাখা দিয়ে। অতঃপর মদিনায় তাঁর আগমনের দশমাস পর ক্বিবলা কা’বা শরিফের দিকে পরিবর্তন করা হয়। 

 

অতঃপর মহানবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইহুদিদের সঙ্গে মদিনার নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষার উপর একটি চুক্তিপত্র তৈরি করেছিলেন। ইহুদি পণ্ডিত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সালাম মুসলিম হয়েছিলেন, কিন্তু অধিকাংশ ইহুদি কুফ্‌রের অবস্থায় অবিচল ছিল। সেই বছরেই রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রাঃ)-কে বিবাহ করেছিলেন। দ্বিতীয় বছর আযানের বিধান জারি হয়েছিল, আল্লাহ্‌ তাআলা ক্বিবলা পরিবর্তন করেছিলেন এবং রমযানের সিয়াম ফরজ করা হয়েছিল।

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনায় ছিলেন এবং আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। মুহাজির এবং আনসারগণ তাঁর পার্শ্বে সুসংহত ছিলেন এবং তাঁদের হৃদয় তাঁর উপর উৎসর্গিত ছিল।

 

ষষ্ঠ হিজরিতে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা পরিদর্শন করার এবং তার তওয়াফ করার সংকল্প গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি মুশরিকদের দ্বারা ওই কাজে বাধাপ্রাপ্ত হন। হুদাইবিয়া প্রান্তে তিনি তাদের সঙ্গে দশ বছরের যুদ্ধ বিরতির চুক্তি সাক্ষরিত করেন। এই সময়কালে মানুষ নিরাপদ থাকবে এবং যে যা ইচ্ছা গ্রহণ করবে, ফলস্বরূপ মানুষ যুগ্মভাবে আল্লাহ্‌র দ্বিনে প্রবিষ্ট হতে থাকে। [সূরা নাস্‌র ১১০:২] তিনি (সঃ) পৃথিবীর রাজন্যবর্গের নিকট তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন।

 

অষ্টম হিজরিতে মক্কার কাফের সম্প্রদায় চুক্তি ভঙ্গ করল। ফলে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামএকটি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে অগ্রসরহলেন এবং মক্কা জয় করলেন। তিনি (সঃ) কা’বাকে প্রতিমা এবং কাফেরদের তত্ত্ববধান হতে মুক্ত করলেন। অতঃপর তিনি এবং তাঁর সাহাবাবর্গ উমরা করে মদিনা ফিরে গেলেন।

 

বিদায় হজ্জ

১০হিজরিতে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হজ্ব সম্পাদনকরার সংকল্প গ্রহণ করলেন। একইভাবে অন্যদেরকে হজ্জ করার ডাক দিলেন। মদিনা এবং অন্যত্রের অনেক মানুষ তাঁর সঙ্গে হজ্জ পালন করলেন। যুল-হুলায়ফাতে ইহ্‌রাম বেঁধে তিনি যুল-হিজ্জা মাসে মক্কায় গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি তাওয়াফ ও সাঈ করলেন এবং লোকদেরকে তার নিয়মবিধি শিখিয়ে দিলেন। আরাফার ময়দানে তিনি (সঃ) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক ভাষন দেন। ওতে তিনি ইসলামের কতিপয় বিশেষ আহকাম বর্ণনা করেন। তিনি বলেন : ““হে লোকসকল ! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো; কারণ আমি জানি না, এবছরের পর এই জায়গায় তোমাদের সাথে আর মিলিত হতে পারবো কিনা। যেভাবে তোমরা এই মাস, এই দিন, এই শহরটিকে পবিত্র মনে করছ, ঠিক একইভাবে প্রত্যেকটি মুসলমানের জীবন ও ধন-সম্পদকে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় মনে করো। জাহিলিয়্যাতের প্রত্যেক অপকর্ম ও অনাচার আমার পদতলে দলিত-মথিত হয়ে গেল এবং জাহিলিয়্যাতের রক্তপ্রবাহ বাতিল করা হচ্ছে। আমি প্রথমেই ইবনে রাবিআহ্‌ ইবনে হারিসের খুনের দাবি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি, যিনি বানি সা’দ গোত্রে দুগ্ধ পান করেছিলেন এবং হুযায়েলের হাতে নিহত হয়েছিলেন। জাহিলিয়্যাতের সুদ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সর্বপ্রথম আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদ আমি প্রত্যাহার করছি। এটা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।  

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শেষ ভাষণ

নারীদের ব্যাপারে আল্লাহ্‌ তাআলাকে ভয় করো, কারণ তোমরা তাদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলার তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাণী দ্বারা তাদের দেহকে নিজেদের জন্য বৈধ করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হলো যে, তারা এমন কাউকে গৃহে প্রবেশের অনুমতি দেবে না তোমার বিছানায় যার উপবেশনকে তুমি অপছন্দ করো। যদি তারা এমন করে তাহলে তাদেরকে আঘাত করো, তবে সেটা যেন নৃশংস না হয়। তোমাদের উপর তাদের অধিকার হলো যে, তোমরা তাদের প্রতি অনুগ্রহশীল হবে এবং তাদেরকে যথার্থ পানাহার ও বস্ত্র দেবে।

 

আমি তোমাদেরকে এমন কিছু দিয়ে যাচ্ছি, যদি তোমরা তার আনুগত্য করো তাহলে আমার চলে যাওয়ার পর তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, আর তা হলো : আল্লাহ্‌ কিতাব এবং আমার সুন্নাত। যদি তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে তোমরা কী বলবে ?” তাঁরা বললেন : “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি বাণী পৌঁছে দিয়েছেন, অঙ্গীকার পূরণ করেছেন এবং আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে উপদেশ প্রদান করেছেন”। অতঃপর তিনি প্রথমে তাঁর তর্জনি আঙ্গুল আকাশের দিকে তুললেন এবং পরে জনগণের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন : “হে আল্লাহ্‌ ! তুমি সাক্ষী থেকো, হে আল্লাহ্‌ ! তুমি সাক্ষী থেকো”, তিনবার বললেন।

 

যখন আল্লাহ্‌ তাআলা এই দ্বিনকে মনোনীত করলেন এবং তার নীতিমালা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল তখন আল্লাহ্‌ তাআলা আরাফা-প্রান্তে তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করলেন : “আজ আমি তোমার জন্য তোমার দ্বিনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমার উপর আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম”। [সূরা মায়িদা ৫:৩]

 

এই হজ্জটিকে বিদায় হজ্জ বলা হয়, কারণ এতেই রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানুষকে বিদায় জানিয়ে ছিলেন এবং এরপর তিনি আর কোনো হজ্জ করেননি। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর হজ্জ সম্পন্ন করার পর মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

 

১১ হিজরির সফর মাসে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। যখন তাঁর যন্ত্রণা তীব্র হয়ে ওঠে তখন তিনি আবু বাক্‌র (রাঃ)-কে মানুষের স্বালাতে ইমামতি করার নির্দেশ দেন। রবিউল আওওয়াল মাসে তাঁর অসুখ আরও বেড়ে যায় এবং ১১ হিজরির রবিউল আওওয়াল মাসের ৯ তারিখে সোমবার দিন ইহলোক ত্যাগ করেন। এতে মুসলমানগণ মর্মাহত হলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে গোসল দেয়া হল এবং ১০ তারিখ সন্ধায় মুসলমানগণ সবাই পৃথক পৃথকভাবে তাঁর জানাযার স্বালাত প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর আয়েশার গৃহে তাঁকে সমাধিস্ত করা হয়। বর্তমানে এই গৃহটি মসজিদে নাবাবির সীমানার মধ্যে অবস্থিত।  

 

অতঃপর মুসলমানগণ এমন একজন সাহাবিকে তাঁদের খলিফা নির্বাচিত করলেন যিনি হিজরতে সময় এবং সওর গুহায় রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন, আর তিনি হলেন : আবু বাক্‌র (রাঃ)। এই নির্বাচনের ভিত্তি ছিল রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদিস। তাঁর মৃত্যুর পর যথাক্রমে খলিফার পদে আসীন হয়েছিলেন উমার, উসমান এবং আলি (রাঃ)। এঁরা খুলাফায়ে রাশিদুন নামে অভিহিত।

 

এই মহৎ ও প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্যগুলির দ্বারা তিনি (সঃ) মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন এবং তাদের হৃদয়কে নমনীয় ও বিনয়ী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এসব কিছু ঘটেছিল মহান আল্লাহ্‌র অপার করুণায়। আল্লাহ্‌ তাআলা ইরশাদ করছেন : ““এটা আল্লাহ্‌ তাআলার অনুগ্রহ যে, তুমি তাদের প্রতি কোমলচিত্ত। তুমি যদি কর্কশভাষী ও কঠোরহৃদয় হতে তাহলে তারা তোমার সংসর্গ হতে দূরে সরে যেত। তাই তুমি তাদেরকে ক্ষমা করো, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন তুমি কোনো সংকল্প গ্রহণ করবে তখন আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাঁর প্রতি নির্ভরশীলগণকে ভালোবাসেন”। [সূরা আল-ইমরান ৩:১৫৯]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সমগ্র মানবজাতির নিকট প্রেরণ করেছিলেন। তিনি তাঁর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছিলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মানুষকে আল্লাহ্‌র প্রতি আহ্বান করতে। যেমন আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “হে নবি ! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারীরূপে। আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে (ইসলামি একত্ববাদ, অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ইবাদতের দিকে)আহ্বানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে”। [সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৪৬]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে ছয়টি বিষয়ে অন্যান্য নবিদের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করেছিলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “আমাকে ছয়টি বিষয়ে অন্যান্য সমস্ত নবিদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আমাকে অতি সংক্ষেপে অধিক অর্থপূর্ণ কথা বলার শক্তি দান করা হয়েছে, ভীতি (আমার শত্রুদের হৃদয়ে) দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে, গনীমত আমার জন্য জায়েয করা হয়েছে,  পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্র এবং মসজিদস্বরূপ করা হয়েছে, আমাকে সমগ্র মানবজাতির নিকট প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমি সমস্ত নবির মোহর”। (মুসলিম : ৫২৩) 

 

তাঁর বাণী সংরক্ষণের প্রমাণ

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানব-ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি যাঁর জীবনের সমস্ত ইতিবৃত্ত সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত। শুধু তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি নয়, বরং জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর দৈনন্দিন জীবনের আদ্যোপান্ত তত্ত্ব ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে – তাঁর সমস্ত কথাবর্তা, কৃতকর্ম, সমর্থন, তাঁর আচার-আচরণ ও চরিত্রের বিশদ বিবরণ; এমনকি তাঁর জীবনধারার বৃত্তান্ত, যেমন : তিনি কীভাবে হেঁটেছেন, কথা বলেছেন, বস্ত্র পরিধাণ করেছেন, নখ কেটেছেন এবং দাড়ি ও চুল আঁচড়িয়েছেন; অনুরূপ পত্নীগণ, বন্ধুবর্গ, শত্রু, শ্রমিক ও দাস-দাসীদের সঙ্গে তিনি কীরূপ ব্যবহার করতেন। সুতরাং তাঁর জীবন সম্পূর্ণরূপেতাঁর সাহাবিদেরকাছে পরিচিত ছিলএবং একটি খোলা পুস্তকের ন্যায় সংরক্ষিত ছিল, যেন বিশ্বের সমস্ত প্রান্তের পরবর্তী প্রজন্মরা তাঁকে অনুসরণ করতে পারে এবং শিক্ষা নিতে পারে, এই অনুপম দৃষ্টান্ত হতে অনুপ্রেরণা পায় এবং তাদের ব্যক্তিগত তথা সামাজিক জীবনে কল্যাণ, পুণ্য এবং সাফল্য অর্জন করতে পারে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্‌ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহ্‌কে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রসূলুল্লাহ্‌র মধ্যে রয়েছে অনুপম আদর্শ”। [সূরা আহ্‌যাব ৩৩:২১] 

 

 আর এই সমস্ত বিষয় তাঁর উম্মতের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে প্রথমত পবিত্র কুরআনের উপস্থাপনের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়ত আরও প্রত্যক্ষ ও স্পষ্ট পথে নবির উপস্থাপনের মধ্যমে। এখানে তাঁর সুন্নাত ও হাদিসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অভিব্যক্ত হয়। আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনের মধ্যে আমাদেরকে স্বালাত প্রতিষ্ঠা করতে বলেছেন, কিন্তু কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সে কথা ব্যাখ্যা করেননি। যদি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত না থাকত তাহলে স্বালাত প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া আমরা জানতেই পারতাম না।

 

এটা সহস্রাধিক পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। তাই আল্লাহ্‌ তাআলা যাঁকে মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন, সেই নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদিস এবং কুরআন করিমের মধ্যে যে গভীর সংযোগ রয়েছে তার উপর জোর দেয়া প্রায় অপ্রয়োজনীয়।

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের মান অন্য সমস্ত মানুষের থেকে অনেক উন্নত। একটি বালক, একজন পুরুষ, একজন স্বামী, একজন পিতা, একজন ব্যবসায়ী, একজন আইনপ্রণেতা, একজন শাসক, একজন কূটনীতিজ্ঞ, একজন শিক্ষাবিদ এবং একজন শিক্ষক হিসেবে একজন মানুষের সর্বোত্তম ও আদর্শনীয় গুণাবলির অধিকারী ছিলেন তিনি।মুহাম্মদ  সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সর্বোচ্চ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা সাধন করেছিলেন এবং সমৃদ্ধি, ন্যায়পরায়ণতা এবং ন্যায্যতার সর্বোত্তম আদর্শ তৈরি করেছিলেন। মনে হচ্ছে, যাবতীয় কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্ব মুহাম্মাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে একত্রিত করা হয়েছিল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের উপর রয়েছ”। [সূরা কালাম ৬৮:৪] 

 

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে তিনি সর্বোচ্চ চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনের মধ্যে বলছেন : “আমি তোমাকে সমগ্র বিশ্বের অনুগ্রহস্বরূপ প্রেরণ করেছি”। [সূরা আন্বিয়া ২১:১০৭]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কায় যে দাওয়াতের কাজ আরম্ভ করেছিলেন তা কোনো বিশেষ একটি শ্রেণির জন্য ছিল না, বরং তা সমগ্র মানবজাতির জন্য ছিল। এটি একটি ছোটোজাতির নির্মাণের জন্য ছিল না বরং এটিছিল সমস্ত জাতি ও প্রজন্মের জন্য একটি নতুন রেনেসাঁ। এটা বিশ্বের অন্তিম সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বের সর্বপ্রান্তে সত্যের প্রচার ও প্রসার করতে থাকবে। বিশ্বের সমস্ত বিপ্লবের মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিপ্লব ছিল মানবজাতির মানসিক ও শারীরিক মুক্তির একটি ব্যবস্থা। 

 

 আল্লাহ্‌ তাআলা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে মনোনীত করেছিলেন এবং তিনি যেন এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং আল্লাহ্‌র সৎ বান্দাদের নেতৃত্ব দিতে পারেন, তজ্জন্য তাঁকে প্রথম থেকেই তৈরি করেছিলেন। তিনি পূর্ণাঙ্গরূপে তাঁর বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং সর্বদা অন্ধকারে একটি উজ্জ্বল প্রদীপের ন্যায় ছিলেন।  

 

আল্লাহ্‌ তাআলা স্বয়ং কুরআনের মধ্যে মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে তাদের অনুপম আদর্শস্বরূপ গ্রহণ করতে এবং তাঁর কথা শুনতে ও আনুগত্য করতে। কুরআন ৩:৩১, ৩২, ১৩২; ৪:১৩, ৫৯, ৬১, ৬৪, ৬৫, ৬৯, ৮০; ৫:৯২; ৮:১, ২০, ৪৬; ২৪:৪৭, ৪৮, ৫১, ৫২, ৫৪, ৫৬, ৬৩; ৪৭:৩৩; ৫৯:৭; ৩৩:৩৬, ৭১; ৪৮:১৭; ৪৯:১৪; ৬৪:১২। সুন্নাহ ইসলামের চূড়ান্ত আদর্শেরব্যবহারিক অভিব্যক্তি। এটি স্বয়ং কুরআনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও বটে। তা ছাড়া ইসলামের বাস্তবায়নের কোনো বোধগম্য উপায় নেই। 

 

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আজ আমরা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদিস সংরক্ষণের বিষয়ে কথা বলছি, আরও কথা বলছি ইসলাম ধর্মকে বোঝার জন্য নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আদর্শ এবং সুন্নাতের কত গুরুত্ব, সে বিষয়ে।

 

বিশিষ্ট অমুসলিমগণ নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কী বলেছেন ?

মাইকেল এইচ হার্ট

 

 “বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় প্রথম নম্বরে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নাম আমি উল্লেখ করেছি, এটা বহু মানুষকে বিস্মিত করতে পারে এবং অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে, কিন্তু তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় এবং পার্থিব উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সফল ছিলেন”।  

(মাইকেল এইচ হার্ট, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী, পৃষ্ঠা : ৩৩)

 

নসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মন্তব্য করছে : “…… প্রাথমিক সূত্রে সবিস্তার আলোচনা হতে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি এমনই একজন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিছিলেন যিনি অন্যান্য সৎ ও সাহসী লোকদের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য লাভ করেছিলেন”। (নসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, দ্বাদশ খণ্ড)

 

লামার্টিন  

তিনি নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলছেন: “দার্শনিক, বাগ্মী, নবি, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, আদর্শসমূহের বিজেতা, কোনো প্রতিমূর্তি ছাড়াই বিচারবুদ্ধি-সম্পন্ন ধ্যানধারণা ও ধর্মীয় পদ্ধতির পুনরুদ্ধারকারী, কুড়িটি পার্থিব সাম্রাজ্য এবং একটি অদ্বিতীয় আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি হলেন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। যে সমস্ত মানদণ্ডে মানুষের মহত্ব বিচার করা যায়, ওগুলোর ভিত্তিতে আমরা জিজ্ঞাসা করতে পারি : তাঁর থেকেও মহান আর কোনো মানুষ আছে কি ?” (তুরস্কের ইতিহাস, প্যারিস, খণ্ড II, পৃষ্ঠা ২৭৬-২৭৭)

 

জর্জ বার্নার্ড শ 

 

বলছেন : “তাঁকেমানবতার ত্রাণকর্তা বলা যায়। আমার বিশ্বাস, যদি তাঁর মতো কোনো ব্যক্তি আধুনিক বিশ্বের একনায়কতন্ত্রের অধিকারী হত তাহলে সে সাফল্যের সাথে এর যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে পারত যার ফলে এতে বিরাজিত হত অত্যাধিক প্রয়োজনীয় শান্তি ও প্রসন্নতা”। (দ্যা জিনুইন ইসলাম, সিঙ্গাপুর, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮) 

 

 কে.এস. রামকৃষ্ণ রাও 

 

একজন দর্শনের ভারতীয় হিন্দু অধ্যাপক তাঁর সম্পর্কে বলছেন : “মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ”। কে.এস. রামকৃষ্ণ রাও  তাঁর এই উক্তি ব্যাখ্যা করে বলছেন : “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ সত্যতা উপলব্ধি করা সবচেয়ে কঠিন। আমি শুধু তার একটি আভাস উপলব্ধি করতে পারি। চিত্রানুগ দৃশ্যের একটি কী সুন্দর নাটকীয় অনুক্রম ! নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম :  

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) যোদ্ধা;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) ব্যবসায়ী;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) সাংবাদিক;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) বক্তা;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) সংস্কারক;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) অনাথদের আশ্রয়;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) ক্রীতদাসদের অবিভাবক;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) নারীদের মুক্তিদাতা;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) বিচারক;

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) সিদ্ধপুরুষ। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় এবং মানুষের সমস্ত কর্মবিভাগে তিনি ছিলেন একজন বীর নায়ক। 

 (ইসলামের নবি মুহাম্মাদ, প্রণেতা : অধ্যাপক কে.এস. রামকৃষ্ণ রাও)

 

মহাত্মা গান্ধী  

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের চরিত্রের উপর কথা বলতে গিয়ে “ইয়াং ইন্ডিয়া”র মধ্যে মহাত্মা গান্ধী বলছেন : “এমন একজন উৎকৃষ্টতম ব্যক্তি সম্পর্কে আমার জানতে ইচ্ছে করছিল যিনি আজও লক্ষাধিক মানুষের মনের উপর অবিতর্কিত প্রভাব বিস্তার করেন…।

আমি আরও বিশ্বাসী হয়ে উঠি যে, তৎকালীন জীবনের রাজপথে ইসলাম যে স্থান অধিকার করেছিল তা তরবারির বলে ঘটেনি।

এটা ছিল অনমনীয় সরলতা,

নবির অবিমিশ্র আত্মবিলোপ, 

স্বীয় অঙ্গীকার পূরণ,

স্বীয় বন্ধু ও অনুগামীদের প্রতি তাঁর তীব্র নিষ্ঠা,

তাঁর সাহসিকতা,

তাঁর নির্ভীকতা,

আল্লাহ্‌ ও নিজের কার্যের উপর পূর্ণ আস্থা। 

 

তরবারী নয়, বরং এই সমস্ত মহৎ গুণগুলি তাঁদের সামনে সবকিছু এনে দিয়েছিল এবং সমস্ত বাধাবিপত্তি দূরীভূত করেছিল। যখন আমি “নবির জীবনী”র দ্বিতীয় খণ্ডটি বন্ধ করলাম তখন আমি খুব দুঃখিত ছিলাম, কারণ এই মহৎ জীবনটি সম্পর্কে অধিক কিছু জানার সুযোগ আমি আর পায়নি”। (ইয়াং ইণ্ডিয়া ১৯২৪)

 

টমাস কার্লাইল 

 

বলছেন : আমি এটা দেখে অতিশয় বিস্মিত ছিলাম যে, “কীভাবে একজন মানুষ স্বাচ্ছন্দভাবে দুই দশক থেকেও কম সময়ের মধ্যে যুদ্ধরত উপজাতিগুলিকে এবং বিক্ষিপ্ত বেদুইনদেরকে একটি শক্তিশালী ও সভ্য জাতিতে পরিণত করেছিলেন”।  (টমাস কার্লাইল-র ‘হিরোজ এন্ড হিরো ওয়ারশিপ)

 

অ্যানি বেসান্ত 

 

মন্তব্য করছেন : “যে কেউ আরবের মহান নবির জীবনচরিত এবং চরিত্র নিয়ে গবেষণা করে এবং জানে তাঁর শিক্ষাদান এবং জীবনধারা সম্পর্কে জানে তার জন্য এছাড়া আর কিছুই অনুভব করা সম্ভব নয় যে, এটা ছিল ওই শক্তিশালী নবি, মহান স্রষ্টার অন্যতম একজন দূতের নিষ্ঠা। আমি তোমাদের সম্মুখে যা কিছু উপস্থাপন করব, যদিও তার মধ্যে আমি অনেক কিছু এমন বলব যার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত, তবে আমি নিজে অনুভব করি : যখনই আমি নতুনভাবে তাঁর সম্পর্কে পড়ি তখনই আমার সামনে ওই শক্তিশালী আরবীয় শিক্ষকের প্রশংসার একটি নতুন দিক, তাঁর নিষ্ঠার একটি নতুন অনুভূতি উম্মোচিত হয়”। (মুহাম্মাদের জীবন ও শিক্ষা, মাদ্রাজ, ১৯৩২, পৃষ্ঠা ৪)

 

সরোজিনী নাইডু 

 

বলছেন : “এটাই প্রথম ধর্ম ছিল যে ধর্ম গণতন্ত্রের প্রচার করেছে এবং তার বাস্তবায়ন করেছে। যেমন  প্রত্যহ পাঁচবার নামাযে ইসলামের গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন মসজিদে নামাযের জন্য আযান দেয়া হয় এবং উপাসকগণ সকলে একত্রিত হয় এবং কৃষক ও রাজা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে : “আল্লাহ্‌ সুমহান”…, আমি বারবার অভিভুত হয়েছি ইসলামের এই অবিভাজ্য ঐক্য দেখে যা মানুষকে সহজাত ভাইয়ে পরিণত করে দেয়”। (এস নাইডু, ইসলামের আদর্শ, বক্তৃতা ও লেখা, মাদ্রাজ, ১৯১৮, পৃষ্ঠা ১৬৯)

 

বেঞ্জামিন স্মিথ  

 

 “তিনি রাষ্ট্র ও চার্চের প্রধান, তিনি সম্রাট এবং ধর্মযাজক উভয়ই ছিলেন; কিন্তু ধর্মযাজকের দাবি ছাড়াই ধর্মযাজক এবং সম্রাটের সৈন্যদল, স্থায়ী সৈন্যবাহিনী, কোনো দেহরক্ষী, কোনো পুলিশ বাহিনী, কোনো নির্দিষ্ট রাজস্ব ছাড়াই সম্রাট ছিলেন। যদি কখনো কেউ সঠিক ঐশ্বী আইন দ্বারা রাজত্ব করে থাকেন তাহলে তিনি ছিলেন মুহাম্মাদ, কারণ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তাঁর সর্বশক্তি ছিল। তিনি শক্তির প্রলেপের কোনো পরোয়া করেননি। তাঁর ব্যক্তিজীবনের সরলতা নিহিত ছিল তাঁর জনজীবনের সঙ্গে থাকার মধ্যেই”। (বোসওয়ার্থ স্মিথের “মুহাম্মাদ ও মুহাম্যাডানিজম”, লন্ডন, ১৮৭৪)

 

বিশ্বের অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রে তাঁর উল্লেখ

নবি মুহাম্মাদ হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে

Øনরাশংস

ঋগ্বেদ – ১:১৩:৩, ১:১৮:৯, ১:১০৬:৪, ১:১৪২:৩, ২:৩:২, ৩:২৯:১১, ৫:৫:২, ৭:২:২, ১০:৬৪:৩, ১০:১৮২:২, ১৯:৭০:২,

অথর্ববেদ – ২০:২৭ ও ২০:১৭২তম অনুচ্ছেদ।

সামবেদ – মন্ত্র নং ১৩৪৯।

যজুর্ব্বেদ – ২৯:২৭।

Øঅন্তিম ঋশী

Øকাল্কি অবতার

ভগবত পুরাণ ১২:২:১৮ – ২৯

কাল্কি পুরাণ ২:৪-২৫

 

ভবিষ্য পুরাণে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উল্লেখ

ভবিষ্য পুরাণ, পর্ব III, খণ্ড ৩, অধ্যায় ৩, শ্লোক ৫-৮,

ভবিষ্য পুরাণ, পর্ব III, খণ্ড ৩, অধ্যায় ৩, শ্লোক ১০-২৭,

ভবিষ্য পুরাণ, পর্ব III, খণ্ড ১, অধ্যায় ৩, শ্লোক ২১-২৩। 

 

অথর্ববেদে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উল্লেখ

তাঁর উল্লেখ আছে অথর্ববেদে, বুক ২০, স্তব ১২৭, শ্লোক ১-১৩।

 

ঋগ্বেদে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উল্লেখ

ঋগ্বেদ, বুক ১, স্তব ৫৩, শ্লোক ৯।

 

সামবেদে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উল্লেখ

সামবেদ, বুক ২, স্তব ৬, শ্লোক ৮।

 

খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মশাস্ত্রে নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম)

পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে : “যারা নিরক্ষর রসূল নবি (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম)-র অনুসরণ করে চলে যাঁর কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়”। [সূরা আ’রাফ ৭:১৫৭] 

বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথা উল্লেখ আছে :

ডিউটেরোনোমি, অধ্যায় ১৮, শ্লোক১৮,

ডিউটেরোনোমি, অধ্যায় ১৮, শ্লোক১৯,

বুক অফ ইশাইয়াহ্‌, অধ্যায় ২৯, শ্লোক১২,

সং অফ সলোমন, অধ্যায় ৫, শ্লোক১৬,

বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথা উল্লেখ আছে :

জন, অধ্যায় ১৪, শ্লোক ১৬

গোস্পেল অফ জন, অধ্যায় ১৫, শ্লোক ২৬

গোস্পেল অফ জন, অধ্যায় ১৬, শ্লোক ৭

গোস্পেল অফ জন, অধ্যায় ১৬, শ্লোক ১২-১৪।

 

ওই প্যারাক্লীট মুহাম্মাদ

যিশুর সময় পর্যন্তইস্রাইলীয়রা মুসার মতো ওই নবির অপেক্ষা করছিল যাঁর উল্লেখ ডিউটেরোনোমি ১৮:১৮-তে রয়েছে। যখন জন বাপ্টিস্ট এলেন, তারা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন : আপনি কি যিশু ? তিনি বললেন : না। তারা জিজ্ঞাসা করলেন : আপনি কি ইলিয়াস ? তিনি উত্তর দিলেন : না। তারা জিজ্ঞাসা করলেন : আপনি কি সেই নবি যাঁর উল্লেখ ডিউটেরোনোমি ১৮:১৮-তে রয়েছে ? তিনি উত্তর দিলেন : না। (জন ১:১৯-২১) 

গোস্পেল অফ জন, অধ্যায় ১৪, ১৫ ও ১৬-তে উল্লেখ আছে, যিশু “প্যারাক্লীট” বা সান্ত্বনাকারীসম্পর্কে বলছেন : তিনি তাঁর পরে আগমন করবেন, তিনি অন্য প্যারাক্লীটের ন্যায় পিতা কর্তৃক প্রেরিত হবেন, তিনি এমন নতুন কিছু শিক্ষা দেবেন যার জ্ঞান সমসাময়িক খ্রিস্টানরা রাখে না। প্যারাক্লীটের অর্থ : সত্যের আত্মা (যার অর্থ মুহাম্মাদের উপাধি আল-আমীন বা বিশ্বস্তের অর্থের ন্যায়), একটি শ্লোকে পবিত্র আত্মারূপে তাঁর পরিচিতি দেয়া হয়েছে (জন ১৪:২৬)। ওই পারাক্লীটের সংক্ষিপ্ত জীবনকথার সাথে এ ধরনের উপাধি সংগতিহীন। বাইবেলের অভিধানে উল্লেখ আছে : “এটা স্বীকার করতেই হয় যে, এই বিষয়গুলি একটি সম্পূর্ণ সুসঙ্গত চিত্র দেয় না”। 

 

বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রে নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) 

বুদ্ধ মৈত্রেয়র আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছিলেন। প্রায় সমস্ত বৌদ্ধ-গ্রন্থে এই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এ কথা উল্লেখ আছে চিক্কবত্তি সিংহনাথ সুতান্তে, ডি, ১১১৭৬, স্যাকরেড বুক অফ ইস্ট, ৩৫তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৫, গোস্পেল অফ বুদ্ধ, পৃষ্ঠা ২১৭ ও ২১৮।

বুদ্ধের মতবাদ ছিল গূঢ় এবং সহজবোধ্য। 
(স্যাকরেড বুক অফ ইস্ট, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬, মহা-পারিনিব্বন সুত্ত, অধ্যায় ৫, শ্লোক ৩২)। 
বুদ্ধদের অনুগত পরিচালক। 
(স্যাকরেড বুক অফ ইস্ট, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৭, মহা-পারিনিব্বন সুত্ত, অধ্যায় ৫, শ্লোক ৩, গোস্পেল অফ বুদ্ধ, পৃষ্ঠা ২১৪)।   

 

নবুওয়াতের সীল ও প্রমাণাদি  

üসার্বজনীন নবি : তাঁর নবুওয়াত বিশেষ একটি জনগোষ্ঠী, উপজাতি বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। [সূরা সাবা ৩৪:২৮, সূরা আন্বিয়া ২১:১০৭, সূরা ফুরকান ২৫:১, সূরা আ’রাফ ৭:১৫৮]

 

üসময়-সীমা : যেমন ভৌগলিকভাবে তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না, অনুরূপ তাঁর শিক্ষা কোনো বিশেষ সময়ের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না যা পূর্ববর্তী নবিদের ক্ষেত্রে ছিল। [সূরা মায়িদা ৫:৩]

 

üসার্বজনীন বাণী : তাঁর বাণী এই পৃথিবীর অন্তিম সময় পর্যন্ত সার্বজনীন।[সূরা মায়িদা : ৫:৪৮]

 

üজীবন-দর্শন : তাঁর শেখানো জীবনদর্শন কেবল মুসলামনদের জন্য নয়, বরং তা সমগ্র মানবজাতি এবং সারা বিশ্বের জন্য।[সূরা আন্বিয়া ২১:১০৭]

 

üধর্মশাস্ত্র : আল্লাহ্‌ তাআলা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সার্বজনীন বার্তাস্বরূপ কুরআন অবতীর্ণ করেছিলেন। [সূরা বাকারা ২: ১৮৫]  

 

üআদর্শ : সমগ্র মানববিশ্বের জন্য তিনি ছিলেন একটি অনুপম আদর্শ। [সূরা আহ্‌যাব ৩৩:২১]

 

üনবিদের সীল: “আমাকে ছয়টি বিষয়ে অন্যান্য সমস্ত নবিদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আমাকে অতি সংক্ষেপে অধিক অর্থপূর্ণ কথা বলার শক্তি দান করা হয়েছে, ভীতি (আমার শত্রুদের হৃদয়ে) দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে, গনীমত আমার জন্য জায়েয করা হয়েছে,  পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্র এবং মসজিদস্বরূপ করা হয়েছে, আমাকে সমগ্র মানবজাতির নিকট প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমি সমস্ত নবি মোহর”। (মুসলিম : ৫২৩) আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনের মধ্যে বলছেন যে, নবি মুহাম্মাদ  হলেন নবিদের সীল।[সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৪০]

 

উপসংহার

অতএব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পথে জীবনের সমস্ত বিভাগে ইসলামের বাস্তবায়ন মৌলিক ও দুড়ান্ত কামনা। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র রসূল, এই ঘোষণা করা ঈমানের অবিচ্ছদ্য অঙ্গ। ইসলামের বিষয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বর্ণিত সর্ববিষয়ে আস্থা রাখা অত্যাবশ্যক। তাঁর সমস্ত নির্দেশ পালন এবং তাঁর কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় হতে বিরত থাকা ফরজ। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যই আল্লাহ্‌র আনুগত্য। তিনি আমাদেরকে জান্নাত অর্জনের যাবতীয় পথ দেখিয়েছেন এবং জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

 

তথ্যসূত্র

http://english.islamweb.net/emainpage/index.php?page=articles&id=134448

http://www.islamindepth.com/contents/details/174

www.quran.com

http://www.allahuakbar.net/muhammad/INDEX.HTM

http://mercyprophet.org/mul/taxonomy/term/4

841 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page