মানবতার প্রতি নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অবদান


কিছু সংখ্যক অমুসলিম মানবতার প্রতি নবি মুহাম্মাদের (সঃ) অবদান দেখে বিস্মিত, বিশেষত পশ্চিমা মিডিয়া কর্তৃক তাঁর পবিত্র চরিত্রের মানহানীর পর। অজ্ঞতা ও ভ্রান্ত ধারণার সর্বোত্তম সমাধান হলো শিক্ষা। 

 

বিষয়সূচি

 

১। এক আল্লাহ্‌র আনুগত্য

–মহাপ্রতিপালক আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানুষকে অন্য মানুষের আনুগত্য স্বীকার ও আত্মসমর্পণ হতে বের করে সেই এক আল্লাহ্‌র আনুগত্য স্বীকার ও আত্মসমর্পণের দিকে নিয়ে গেছেন, যিনি এক, অদ্বিতীয়, যাঁর কোনো অংশীদার নেই। ফলস্বরূপ মানবজাতি আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্যদের দাসত্ব হতে মুক্তি পেয়েছে। আর এটাই মানবজাতির জন্য সর্বাপেক্ষা সম্মানের বিষয়।

 

২। উপাসনার বাতিল বিষয়াদি হতে মুক্তি

–আল্লাহ্‌ তাআলার পক্ষ হতে অহির মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানবমস্তিষ্ককে কুসংস্কার, চাতুরী ও বাতিল উপাস্যদের আনুগত্য হতে মুক্ত করেছেন। অনুরূপ ওই সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গী হতে মুক্ত করেছেন, যেগুলো যুক্তিসঙ্গত নয়। যেমন এই দাবি করা যে, আল্লাহ্‌র একটা মানবসন্তান ছিল, যাকে তিনি মানবতার পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ কুরবানি করেছেন।

 

৩। অমুসলিমদের অধিকারের বিবরণ

–মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানুষের মাঝে পরমসহিষ্ণুতার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। কুর্‌আনে আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর নবির ওপর প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ করেন যে, “ধর্মের (গ্রহণের) ব্যাপারে বল প্রয়োগ নেই”। [সূরা বাকারা ২:২৫৬] মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও ওই সমস্ত অমুসলিমদের অধিকারের বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না এবং তাদের জীবন, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ ও সম্মান-সম্ভ্রমের নিরাপত্তার মুচলেকা দিয়েছেন। আজও বহু মুসলিম দেশে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করছে।  

 

৪। সকলের জন্য অনুকম্পা

–আল্লাহ্‌ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জাতি, ধর্ম, বিশ্বাস নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকম্পাস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন। এ এক নির্ঘাত সত্য যে, তাঁর শিক্ষায় পশু-পক্ষীর ওপরও দয়া করার কথা বলা হয়েছে এবং অকারণে ও অনাধিকার তাদের ক্ষতি করতে নিষেধ করা হয়েছে।(সহি বুখারি : ৩৩১৮, আবুদাউদ : ২৬৭৫ ও ২৮১৬)

 

৫।নবিদের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই

–মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত নবি ও রসূলের প্রতি অনুপম শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করতেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইব্রাহিম, মুসা ও ইসা (আঃ)। ইসলাম মনে করে, সমস্ত নবি ভাই ভাই। তাঁরা সকলেই এই বিশ্বাস স্থাপনের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন যে, আল্লাহ্‌ ব্যতীত সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র সত্যিকারের প্রভু। [কুর্‌আন ২১:২৫]

 

৬। মানবাধিকার নির্ধারণ করেছেন

–মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানবাধিকারের প্রতিরক্ষা করেছেন। তারা নারী হোক বা পুরুষ হোক, যুবক হোক বা বৃদ্ধ, আর তাদের সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন। তিনি এক গুচ্ছ সুন্দর নীতি স্থির করেছিলেন; যার একটি উদাহরণ, যেটি বিদায় হজ্জে তাঁর শেষ ভাষণে বলেছিলেন। তাতে তিনি মানবজীবন, ধন-সম্পদ ও সম্মানের প্রতি অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। (সহি বুখারি : ১৬২৩, ১৬২৬, ৬৩৬১)

 

বিশ্ব ১২১৫ সালে মাগনা চারটার, ১৬২৮ সালে “অধিকার ঘোষণা”, ১৬৭৯ সালে ব্যক্তি স্বাধীনতা আইন, ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার আমেরিকি ঘোষণা, ১৭৮৯ সালে মানবিক ও নাগরিক অধিকার অধ্যায় এবং ১৯৪৮ সালে মানবাধিকার ঘোষণার কথা জেনেছে। এগুলোর অনেক পূর্বে (নবির) এই নীতিগুলি স্থির হয়েছে।

 

৭। মন্দ জিনিসের ব্যাপারে সতর্কবাণী দিয়েছেন

–মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানবজীবনে নৈতিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি কামনা করেছেন সদাচরণ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও সতীত্ব। তিনি সামাজিক বন্ধনকে বলিষ্ঠ করেছেন, যেমন পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি দায়িত্ববান হওয়া, যা বলেন তা সর্বদা কর্মে বাস্তবায়িত করা। তিনি মিথ্যা, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতারণা, অবৈধ যৌনাচার ও পিতামাতার প্রতি অশ্রদ্ধার মতো নেতিবাচক আচরণগুলিকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন এবং সেগুলির ব্যাপারে সতর্কবাণী দিয়েছেন। আর এই সমস্ত ব্যাধি হতে জাগ্রত সমস্যাগুলির সমাধান তিনি বলে দিয়েছেন। (সহি বুখারি : ১৬২৩, ১৬২৬, ৬৩৬১) (আরও জানার জন্য প্রণিধান করুন : নবি (সঃ)-এর শেষ ভাষণ,

http://www.askislampedia.com/wiki//wiki/English_wiki/Last+Sermon+of+Prophet+Muhammad+%EF%B7%BA

 

৮। মানুষকে গবেষণা করার প্রতি আহ্বান করেছেন

–মহান আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে প্রাপ্ত প্রত্যাদেশের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানুষকে আহ্বান করেছেন তাদের মস্তিষ্কের ব্যবহারের প্রতি, তাদের চারিপাশের পৃথিবীর আবিষ্কারের প্রতি এবং জ্ঞানেন্বষণের প্রতি।

 

৯। ইসলাম ধর্ম ফিত্‌রাহ্‌র (সত্যের প্রতি স্বভাবজাত ও নিরঙ্কুশ অনুরাগ) ওপর প্রতিষ্ঠিত

–মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে প্রত্যাদেশ নিয়ে আবির্ভুত হয়েছিলেন। তিনি মানবপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধর্ম ইসলাম উপহার দিয়েছেন। এই ধর্ম পার্থিব কার্যক্রম ও পরকালের উদ্দেশ্যে কার্যক্রমের মধ্যে ভারসম্য রক্ষা করে। এই ধর্ম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনাকে নিয়মানুবর্তী ও সুবিন্যস্ত করে, সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে দমন করে না যা ঘটেছে অন্যান্য সভ্যতায়। অন্যান্য সভ্যতা মানবপ্রকৃতি বিরোধী আদর্শে পরিপূর্ণ। তারা উপাসনার জন্য ধার্মিক লোকদেরকে বিবাহের মতো স্বভাবজাত মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া থেকে বঞ্চিত রাখে। তারা অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে, এই আশা তাদের ওপর থাকে না। এটাই এই সমস্ত সভ্যতার সদস্যগণকে ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যানের পথ দেখিয়েছে। তারা পদার্থ দুনীয়ায় নিমগ্ন হয়েছে। এক শোচনীয় অবস্থায় তাদের আত্মাকে ফেলে কেবল দৈহিক আমোদে তাদেরকে নিবিষ্ট করেছে।

 

১০। ভ্রাতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ দিয়েছেন

–মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানবসমাজে ভ্রাতৃত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো এক জাতি অপর জাতির ওপর শ্রেষ্ঠ নয়। জন্মগতভাবে সবাই সমান। সবার দায়িত্ব ও অধিকার অভিন্ন। কারো বিশ্বাস ও আল্লাহ্‌ভীতিই শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড। তাঁর সাহাবাবর্গকে ধর্মের সেবা ও ধর্ম পালনের সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুহাইব, একজন বাইজান্টাইনবাসী; বিলাল, একজন আবিসিনীয়; সলমান, ফরাসী; এছাড়াও ছিলেন অসংখ্য অনারবীয় (রাঃ)।

 

উপসংহার

পরিশেষে বলতেই হয় যে, এই দশটি পয়েন্টের আরও বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মানবতার প্রতি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অবদান এতই বেশি যে, এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের অনেক বৈষয়িক গবেষক মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত অধ্যয়নের পর তাঁর সম্পর্কে অনেককিছু লিখেছেন।

 

তথ্যসূত্র

www.islamhouse.com

 

170 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page