নবি মুহাম্মাদ ﷺ -এর শেষ ভাষণ


এই ভাষণটি১০ হিজরির যুল্‌হিজ্জাহ্‌ মাসের ৯ম তারিখে আরাফার ময়দানের নেম্‌রাহ প্রান্তরে দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল বাৎসরিক ইবাদত “হজ্জ”-র মরশুমে। এটা বিদায় হজ্জ নামেও পরিচিত। আল্লাহ্‌ সুব্‌হানাহু ওয়া তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও প্রশংসার পর রসূলুল্লাহ্‌ ﷺ তাঁর   ভাষণ দেন। তিনি বলেন : “হে লোকসকল ! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো; কারণ আমি জানি না, এবছরের পর এই জায়গায় তোমাদের সাথে আর মিলিত হতে পারবো কিনা। সুতরাং আমি তোমাদেরকে যাকিছু বলছি, তা মনোযোগ সহকারে শোনো এবং যারা আজ এখানে উপস্থিত নেই, তাদেরকে একথাগুলো জানিয়ে দিও।

 

বিষয়সূচি

 

বিদায় ভাষণের বিশ্লেষণ

বিদায় ভাষণে রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য উপদেশবাণী।

 

জীবন ও ধন-সম্পদ অলঙ্ঘনীয়

হে লোকসকল ! যেভাবে তোমরা এই মাস, এই দিন, এই শহরটিকে পবিত্র মনে করছ, ঠিক একইভাবে প্রত্যেকটি মুসলমানের জীবন ও ধন-সম্পদকে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় মনে করো। যে সম্পদ তোমাদের নিকট গচ্ছিত রাখা হয়, তা তোমরা তার আসল মালিককে ফিরিয়ে দাও। তোমরা কাউকে আঘাত করো না, যাতে তোমাদেরকে কেউ আঘাত না করে।

 

হিসাব-নিকাশের দিন

মনে রেখো, তোমাদেরকে স্বীয় প্রভুর সম্মুখীন হতেই হবে এবং তিনি অবশ্যই তোমাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব নেবেন।

 

সুদ নিষিদ্ধ

আল্লাহ্‌ সুব্‌হানাহু ওয়া তাআলা সুদ নিতে তোমাদের বারণ করেছেন। সুতরাং এখন থেকেই সমস্ত রকম সুদ একান্তভাবে বর্জনীয়। তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা না অত্যাচার করবে আর না অত্যাচারিত হবে। আল্লাহ্‌ তাআলা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, আর কোনো সুদ থাকবে না এবং সমস্ত সুদ-বর্জনের কাজ আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (নবি-এর চাচা) হতে শুরু হবে।

 

শয়তানের ব্যাপারে সতর্কবাণী

তোমাদের দ্বিনের রক্ষার্থে শয়তান থেকে সাবধান থেকো। সে বড়ো ধরনের কোনো বিষয়ে তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না; এবিষয়ে সে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং ছোট ছোটো বিষয়ে তাকে অনুসরণ করা থেকে সাবধান থেকো।

 

নারীর অধিকার

হে লোকসকল ! এটা সত্য যে, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে; তবে এটাও সত্যি যে, তোমাদের ওপর তাদেরও অধিকার রয়েছে। মনে রেখো, তোমরা তাদেরকে স্ত্রীস্বরূপ গ্রহণ করেছ কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার তত্ত্বাবধানে এবং তাঁর অনুমতিতে। যদি তারা তোমাদের অধিকার প্রদান করে, তাহলে তোমাদেরও দায়িত্ব, তাদের খাওয়ানো ও পরানো সংক্রান্ত অধিকারগুলি দয়া ও মমতার সাথে তাদেরকে দেওয়া। তোমাদের পত্নীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো এবং তাদের প্রতি দয়াপরবশ হও, কারণ তারা তোমাদের অংশীদার, তোমাদের সহযোগী। আর এটা তোমাদের অধিকার যে, তারা তোমাদের অনুমতি ছাড়া কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে না, অনুরূপ অসতী হয়ে পড়বে না।

 

ইস্‌লামের স্তম্ভসমূহ

হে লোকসকল ! আন্তরিকতার সহিত আমার কথা শোনো, আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদত করো, পাঁচ ওয়াক্তের স্বালাত প্রতিষ্ঠা করো, রমযানে সিয়াম পালন করো, যাকাত প্রদান করো এবং সামর্থ্য হলে হজ্জ করো।

 

তাক্বওয়ার (আল্লাহ্‌ভীতি) শ্রেষ্ঠত্ব

সমগ্র মানবজাতি আদম ও হাওয়া থেকে। আল্লাহ্‌ভীতি ও সৎকর্ম ব্যতিরেকে কোনো অনারবীয়র ওপর আরবীয়র কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবীয়্র ওপর অনারবীয়র কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কৃষ্ণকায়ের ওপর শুভ্রকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শুভ্রকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জেনে রেখো, মুসলমানরা পরস্পপরে ভাই-ভাই। মুসলিমজাতি একই ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে। এক মুসলমানের কোনো কিছু অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য ততক্ষণ বৈধ হবে না, যতক্ষণ না তা অবাধে ও আনন্দচিত্তে দেওয়া হয়।

 

ন্যায়পরায়ণতা ও সৎপথ

সুতরাং তোমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করো না। মনে রেখো, একদিন আল্লাহ্‌ তাআলার সম্মুখে তোমাদেরকে উপস্থিত হতে হবে এবং তোমাদের কৃতকর্মের জবাবদিহি করতে হবে। তাই সাবধান, আমার চলে যাওয়ার পর ন্যায়পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যেও না।

 

দ্বিন ও নবুঅত পূর্ণতা লাভ করেছে

হে মানবকুল ! আমার পরে আর কোনো নবি বা রসূল  আসবে না এবং নতুন কোনো ঈমান জন্ম নেবে না।

 

কুর্‌আন ও সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো

সুতরাং, হে লোকসকল ! ভালোভাবে চিন্তা করো, আমি তোমাদের নিকট যে বাণী পৌঁছে দিলাম তা বোঝো। আমি আমার পরে দুটি জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি; তা হলো : কুর্‌আন ও আমার আদর্শ “সুন্নাহ্”। যদি তোমরা সেদুটির অনুসরণ করো তাহলে কখনোই তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।

 

ইস্‌লামি শিক্ষার তাব্‌লিগ

যারা আমার কথা শুনছে তারা আমার কথাগুলো অন্যদের নিকট পৌঁছে দেবে এবং তারা আবার অন্যদের নিকট পৌছে দেবে। হতে পারে, যারা আমার কথা সরাসরি শুনছে তাদের তুলনায় পরবর্তীরা আমার বাণী বেশি বুঝবে। হে আল্লাহ্‌ ! তুমি আমার সাক্ষী থেকো, আমি তোমার বাণী তোমার বান্দাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছি।

 

উপসংহার

এই ভাষণের অংশস্বরূপ রসূলুল্লাহ্‌ তাঁদের সম্মুখে আল্লাহ্‌ সুব্‌নাহু ওয়া তাআলার একটি আয়াত পাঠ করেছিলেন। ওই সময়েই তিনি সেটা পেয়েছিলেন এবং সেটাই কুর্‌আনকে সম্পূর্ণ করেছে, কেননা সেটাই ছিল তাঁর প্রতি সর্বশেষ প্রত্যাদেশ। “আজ অবিশ্বাসীরা তোমাদের দ্বিনের বিপক্ষে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, ভয় করো শুধুমাত্র আমাকে। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করলাম এবং ইস্‌লামকে তোমাদের দ্বিন মনোনীত করলাম”। [সূরা মায়িদা ৫:৩]

 

রসূলুল্লাহ্‌ -এর শেষ ভাষণটি ‘খুত্‌বাতু বিদা’’ নামে পরিচিত। এটা হাদিসের প্রায় সমস্ত গ্রন্থে উল্লেখ আছে। উল্লেখিত হাদিসগুলি উল্লেখ রয়েছে সহি বুখারি, হাঃ ১৬২৩, ১৬২৬, ৬৩৬১, সহি মুসলিম, হাঃ ৯৮, তির্‌মিযি, হাঃ ১৬২৮, ২০৪৬, ২০৮৫ এবং মুস্‌নাদে আহ্‌মাদ, হাঃ ১৯৭৭৪-তে।

 

তথ্যসূত্র

http://www.huda.tv/articles/prophet-muhammad/420-the-last-sermon-of-prophet-muhammad

http://www.allaahuakbar.net/hajj/prophet_muhammads_last_sermon.htm

http://www.beconvinced.com/archive/en/article.php?articleid=0039&catid=05&subcatname=A%20mercy%20To%20Mankind

 

625 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page