কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস


কুরআনের বিষয়ে একটি সাধারণ আলোচনা বিশালাকারে হয়ে আসছে। তা হলো : বর্তমানে আমাদের নিকট যে কুরআনটি আছে সেটি ওই কুরআন নয়, যে কুরআন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। বেশ কিছু আয়াত নিরুদ্দিষ্ট রয়েছে এবং উসমান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে যে কুরআনটি সরকারীভাবে প্রমিত হয়েছিল, তদ্‌ভিন্ন এক একটি করে কুরআন নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রত্যেক সাহাবির নিকট ছিল।

 

এই প্রবন্ধটি লেখার মুল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন প্রজন্মে কুরআন সংরক্ষণের বিষয়ে কুরআন ও হাদিস হতে কিছু বরাত উল্লেখ করা, এটা কীভাবে সম্বভ হয়েছিল, কতিপয় সাহাবির ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং প্রকৃত কুরআন যেটা উসমান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে সংকলিত হয়েছিল, প্রভৃতি আলোচনা করা।

 

জবাব

কুরআন কী ?

কুরআন হলো মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। এটা আল্লাহ্‌ তাআলা সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি তাঁর মক্কা ও মদিনার জীবনে অবতীর্ণ করেছিলেন। কুরআন হলো সর্বশেষ ও চুড়ান্ত গ্রন্থ, এটা অবতীর্ণ করা হয়েছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য। এতে আছে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি আল্লাহ্‌ তাআলার প্রত্যাদেশের মৌলিক রচনা।

 

কুরআন একটি গ্রন্থ। কুরআন শব্দটির আভিধানিক অর্থ পাঠ করা বা আবৃত্তি করা বা এমন কিছু যা নিরবচ্ছিন্নভাবে আবৃত্তি করা হয়। কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ যার হাফিযের (আত্মস্থকারীর)সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যাতে প্রয়োজনীয় সর্ববিষয়ের শিক্ষা অতিসংক্ষেপে দেয়া হয়েছে, যেমন : পদার্থবিদ্যা, ইতিহাস, জীববিদ্যা, ভূতত্ত্ব, উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদি। ইহ-পরকালে সাফল্যের জন্য যে সমস্ত তত্ত্ব একান্ত জরুরি, সবই এর মধ্যে বিদ্যমান। এই কুরআন এমনভাবে সুবিন্যস্ত যে, প্রেক্ষাপট অনুযা্য়ী তা বোঝা সম্ভব। এছাড়া কুরআন একটি ঘটনাকে অন্যটির সঙ্গে, সংক্ষিপ্ত তত্ত্বকে বিস্তারিত তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। 

 

বিষয়সূচি

 

কুরআন সংরক্ষণ পদ্ধতি

কুরআন প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে ৭ম খ্রিষ্ট-শতাব্দীর প্রারম্ভে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এটা অবতীর্ণ হয়েছিল ২৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে। যখন প্রথম অহি অবতীর্ণ হয় তখন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লামের বয়স ছিল ৪০ বছর। যখন প্রথম অহি অবতীর্ণ হয় তখন তিনি হিরা পর্বতের একটি গুহায় ছিলেন। পর্বতটি পবিত্র শহর মক্কার পূর্বদিকে অবস্থিত।

 

অহি পাওয়ার পর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লাম কুরআনের বাণী তাঁর পার্শ্ববর্তী জনসমাজে প্রচার করতে শুরু করেন। যখনই তিনি অহি পেতেন, জিব্রীল (আঃ)-এর শিক্ষানুক্রমে প্রথমেই তিনি সেটা আত্মস্থ করে ফেলতেন। আত্মস্ত করার পর তিনি স্বীয় সাহাবাবর্গের মধ্যে সেটা আবৃত্তি করতেন, ফলে তাঁরাও নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লামের তত্ত্ববধানে তা মুখস্ত করে নিতেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে হাড়, পাতা, ফলক ইত্যাদিতে লিখে নেয়ার নির্দেশ দেন এবং তিনি নিজেই সেগুলো যাচাই করতেন। যেহেতু রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লাম পড়তে ও লিখতে জানতেন না, তাই সাহাবাবর্গ প্রথমে তা লিখতেন অতঃপর তাঁরা তাঁদের লেখাগুলো তাঁর সম্মুখে উচ্চস্বরে পাঠ করতেন। কোনো ভুলত্রুটি হলে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লাম তা ধরিয়ে দিতেন এবং তাঁদের সংশোধন করতেন।

 

স্মৃতি এবং মৌখিক প্রেষণ ছিল তৎকালীন ত্তত্ব সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার দুটি মূল পদ্ধতি। অর্থাৎ এই দক্ষতাগুলি এতটাই প্রয়োগ হত এবং এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তা আজ প্রায় অজানা ও অকল্পনীয়। ইবাদতস্বরূপ নিয়মিত কুরাআন পাঠের প্রয়োজন হত, বিশেষত প্রত্যহ পাঁচ ওয়াক্তের স্বালাতে। এইভাবে কুরআনের বারবার শ্রুত আয়তগুলি পাঠ করা হত, ফলে সেগুলো দ্রুত মুখস্থ হয়ে যেত। কুরআন ২৩ বৎসর ধরে ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছিল। ফলস্বরূপ প্রতিবার অহি অবতরনের পর যে পরিমাণ কুরআন কণ্ঠস্থ করার প্রয়োজন হত, তা সামলানো এবং মুখস্থ করা সহজ ছিল।

 

এভাবেই নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ কুরআন লেখা হয়েছিল।

 

নবি কর্তৃক কুরআন হৃদয়ঙ্গম

প্রত্যেক রমযানে জিব্রীল (আঃ) সে সময় পর্যন্ত কুরআনের যতটা অবতীর্ণ হত, তার পুরোটাই আবৃত্তি করতেন এবং তাঁর পরে পরেই রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তার পুনরাবৃত্তি করতেন। সেটা করতেন তাঁর কিছু সংখ্যক সাহাবির বর্তমানে।

 

শেষ বছরে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পূর্ণ কুরআন আবৃত্তি করেছিলেন। স্বীয় সাহাবাবর্গের উপস্থিতিতে দুবার কুরআন খতম করেছিলেন তাঁদের স্মৃতিকে যাচাই করার জন্য এবং চাঙ্গা করার জন্য। (সহি বুখারি : ৬/৫২০)

 

প্রথম পর্বের হাফিযগণ

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবাবর্গকে কুরআন শেখা ও শেখানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। যে সমস্ত সাহাবি কুরআন মাজিদ আত্মস্থ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কতিপয় হলেন : আবু বাক্‌র, উমার, উসমান, আলি ইবনে আবি তালিব, ইবনে মাসউদ, আবু হুরাইরা, আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আম্‌র ইবনে আ’স, আয়েশা, হাফ্‌সা এবং উম্মে সাল্‌মা (রাযিয়া- আল্লাহু আনহুম)।

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর একাংশ সাহাবিকে কুরআন কারিম মুখস্ত করার সাথে সাথে তাঁদের হস্তাক্ষরে তা সংরক্ষণ করার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। যাঁদেরকে অন্যদের কুরআন শেখানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাঁদের মধ্যে প্রসিদ্ধতম হলেন : উসমান, উবাই ইবনে কা’ব, আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ, আবু মুসা আশ্‌আরি, সালিম (আবু হুযাইফার মক্কেল) ও মুয়ায ইবনে জাবাল (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)।

 

আবূ বাক্‌র (রাঃ)-এর খিলাফতকালে

উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) কুরআন সংরক্ষণ ও সংকলনের জন্য আবু বাক্‌র (রাঃ)-কে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। ফলস্বরূপ আবু বাক্‌র (রাঃ) কুরআনের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অংশগুলিকে এক জায়গায় একত্রিত করার নির্দেশ দেন। এটা ঘটেছিল ইয়মামা যুদ্ধের পরে, যাতে বাগ্মীদের মধ্যে যাঁরা শহিদ হয়েছিলেন তাঁদের একটা বড়ো অংশ ছিলেন কুরআনের হাফিয। মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন কুরআনের হাফিয শহিদ হয়েছিলেন।

 

আবু বাক্‌র (রাঃ) কুরআন জমা করার দায়িত্ব যায়দ ইবনে সাবিস (রাঃ)-এর উপর অর্পণ করেছিলেন। (সহি বুখারি : ৬/২০১) রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শেষবার যখন কুরআন পাঠ করে জিব্রীল (আঃ)-কে শুনাচ্ছিলেন, সেসময় যায়দ (রাঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

 

যে সমস্ত সাহাবি কুরআনের আয়াত আত্মস্থ করেছিলেন এবং লিখেছিলেন, তাঁদের সহযোগিতা নিয়ে যায়দ (রাঃ) এই মহৎ কাজটি সম্পন্ন করেন এবং কুরআনের প্রথম প্রামাণ্য মুসহাফ আবু বাক্‌র (রাঃ)-কে পেশ করেন। সেই মুসহাফটি উমার (রাঃ)-এর কন্যা এবং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পত্নী হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে রাখা হয়েছিল।

 

উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকালে

উসমান বিন আফফান (রাঃ)-এর খিলাফতকালে আবার কুরআন সংকলনের প্রয়োজন অনুভূত হয়। খিলাফত অনেক বেশি বিস্তৃতি লাভ করেছিল। বিচ্ছিন্ন মতবাদের বিভিন্ন সভ্যতার অনেক নতুন নতুন মানুষ ইসলামের পরিমণ্ডলে প্রবিষ্ট হচ্ছিল। এই নবমুসলিমরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলত, কিন্তু আরবি ভাষা ভালো জানত না, তাই কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ লিখিত গ্রন্থ সংকলন করতে হয়েছিল। তাছাড়া কুরআন সংকলনের আরেকটি কারণ হলো যে, যাঁরা কুরআন আত্মস্থ করে রেখেছিলেন তাঁদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করছিলেন, বিশেষত যুদ্ধক্ষেত্রে।

 

তাই উসমান (রাঃ) হাফসা (রাঃ)-এর নিকট বার্তা পাঠালেন : আপনি আমাদের নিকট কুরআনের হস্তলিপিটা পাঠিয়ে দিন। আমরা সেটা যথার্থ কপিতে (মুসহাফে) লিপিবদ্ধ করব অতঃপর সেটা আপনাকে আমরা ফিরিয়ে দেব। হাফসা (রাঃ) সেটা উসমান (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর উসমান (রাঃ) যায়দ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে যুবাইর, সাঈদ ইবনে আ’স এবং আব্দুর রহমান ইবনে হারিস (রাঃ)-কে সেই হস্তলিখিত গ্রন্থের নতুন অনুলিপি তৈরি করার নির্দেশ দিলেন। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল কুরাইশের ভাষায়। তাই তাঁরা কুরাইশের ভাষায় কুরআন লিপিবদ্ধ করলেন। যখন তাঁরা বেশকিছু মুসহাফ তৈরি করে ফেললেন তখন উসমান (রাঃ) মূল মুসহাফটি হাফসা (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। অত:পর উসমান (রাঃ) প্রত্যেক মুসলিম রাষ্ট্রে একটি করে মুসহাফ প্রেরণ করলেন এবং এই নির্দেশ জারি করলেন যে, যার কাছেই এটা ছাড়া পূর্ণ কুরআন বা কুরআনের কোনো অংশ লিখিত আকারে রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়া হোক। (সহি বুখারি : ৬/৫১০)

 

অতএব, উসমান (রাঃ)-এর নির্দেশেই সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে কুরআন জনসমক্ষে এসেছিল। (সহি বুখারি : ৬/৫০৭) কুরআনের বেশকিছু পূর্ণ পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছিল এবং সেগুলো হাফসা (রাঃ)-এর নিকট সংরক্ষিত প্রামাণ্য পাণ্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে নেয়া হয়েছিল। অতঃপর সেই অনুলিপিগুলো মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়েছিল, যেমন : মদিনা, সিরিয়া, ইয়ামান, মিশরের কায়রো, তুরস্কের ইস্তান্বুল ও তাশখন্দ প্রভৃতি।

 

কুরআন সংরক্ষণের জ্ঞান

কুরআন কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল, সেই ঘটনা সহি হাদিসে সম্পূর্ণ আলোচিত হয়েছে। এই ধরনের বর্ণনার বিশুদ্ধতা যাচাই করার জন্য মুসলিম বিদ্বানগণ প্রথমেই সবচেয়ে নিখুঁত নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত এবং সাহাবাদের সম্পর্কে আমরা যাকিছু জানি, তার বেশিটাই মুতাওয়াতির হাদিস হতে প্রমাণিত। এই অব্যাহত ও গতিশীল নীতি মুসলিম ইতিহাসের অত্যন্ত সঠিক বিবরণকে উজ্জীবিত রেখেছে। হাদিস সংরক্ষণের প্রথম চার শতাব্দীর বিদ্বানগণ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন মতবাদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। কুরআন সংরক্ষণের বিষয়ে তাঁদের সকলের একই ধরনের তত্ত্ব পাওয়া যায়।

 

কুরআন সংরক্ষণের বিষয়ে অমুসলিমদের কতিপয় উক্তি

  • জেফরি লংমন্তব্য করছেন : “মুসলিম পণ্ডিতদের ইতিহাস বিষয়ক সিদ্ধান্ত তাদের প্রাচ্যবিদদের প্রতিলিপির তুলনায় অধিক দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রমাণসহ নিজের স্থান ধরে রেখেছে”।
  • গিব,একজন প্রাচ্যবিদ : “এটা যুক্তিসঙ্গতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত বলে মনে হয় যে, মুহাম্মাদের বাণীর মধ্যে কোনো বৈষয়িক পরিবর্তন সাধিত হয়নি এবং বিবেকসম্পন্ন যথার্থতার সাথে তা সংরক্ষিত আছে”।
  • জন বার্টন, কুরআন সংকলনের উপর তাঁর সারগর্ভ আলোচনার শেষে, হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয়ের যে সমালোচনা করা হয়েছে তার বরাত দিয়ে বলছেন : “উসমানীয় লিপির উপর যে সামন্তরাল পাঠের ভিত্তি, তার ভিত্তিতে মতবাদের কোনো বড় ধরনের পার্থক্য চিহ্নত করা সম্ভব নয়, তথাপি তাঁর মুসহাফ ব্যতীত অন্য মুসহাফে তা আরোপিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে সমগ্র পাঠ এক ও অভীন্ন বক্তব্য অভিব্যক্ত করে। তাঁরা যে অনুলিপি তৈরি করেন, তাতে তাঁরা সম্পূর্ণরূপে সম্মত”।
  • কেনেথ ক্রাজ(Keneth Cragg) বর্ণনা করছেন যে, কুরআনের অনুলিপি অহির সময় হতে আজ পর্যন্ত নিষ্ঠার এক আস্ত উজ্জীবিত অনুক্রমে বিদ্যমান রয়েছে।
  • Schwally ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, “যতদূর অহির বিভিন্ন অংশের বিষয়, তো আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, ওগুলোর অনুলিপি সাধারণত ঠিক সেভাবেই তৈরি করা হয়েছিল যেমন নবির উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গিয়েছিল”।
  • স্যার উলিয়াম মুয়েরবর্ণনা করছেন : “বিশ্বে সম্ভবত এমন কোনো পুস্তক নেই যা এত নিখুঁত রচনাসহ বারো শতাব্দী (এখন পনেরো) ধরে বিদ্যমান রয়েছে”।

 

কুরআন অবিকৃতআছে

বিভিন্ন প্রাচীন কুরআন গ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। ওগুলোর মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। তাথেকে এ কথা প্রকাশ পায় যে, ওগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

 

জার্মানির মুনিচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কুরআন-সংস্থা প্রায় ২৪০০০ পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ প্রাচীন কুরআন গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিল। প্রায় ৫০ বৎসর ধরে গবেষণার পর তাঁরা জানান দেন যে, এই সমস্ত কুরআন গ্রন্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

 

উপরের তত্ত্ব ও গবেষণা হতে একজন মানুষ প্রমাণসহ মন্তব্য করতে পারে যে, কুরআন কীভাবে আমাদের নিকট এসেছে, সেবিষয়ে যে ঘটনা বর্ণিত আছে, তা সত্য, যেমন প্রথম চার শতাব্দীর হাদিসের পণ্ডিতগণ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বিবরণ পরস্পরের সঙ্গে সম্মত এবং যে ঘটনা কুরআনকে এনে বর্তমান অবস্থায় উপনীত করেছে তাকে সাব্যস্ত করে।

 

আল্লাহ্‌ কর্তৃক কুরআনের সুরক্ষা

আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনে বলছেন : “নিশ্চয়ই আমিই যিক্‌র (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি আর আমিই তা রক্ষা করব”। [সূরা হিজ্‌র ১৫:৯]

 

কুরআন মৌখিক এবং লিখিত উভয়রূপে সংরক্ষণ করা হয়েছে এমন একটি পথে যা অন্য কোনো পুস্তকের ক্ষেত্রে বিরল। সংরক্ষণের একটি রূপ অপরটির প্রামাণিকতা ও ভারসাম্য রক্ষা করে। তাছাড়া কুরআনই একমাত্র এমন সাহিত্য যা বিশ্বের অনেক মুসলমান একদিক থেকে এবং অক্ষরে অক্ষরে সম্পূর্ণ আত্মস্থ করে ফেলে। এটা স্বয়ং একটা অলোকিকতা।

 

উসমান (রাঃ) যে সমস্ত কুরআন গ্রন্থ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়েছিলেন এবং যা আজও তার প্রকৃত আকারে বিদ্যমান, ওই প্রাচীন গ্রন্থসমূহ দ্বারা যেকোনো নতুন কুরআন গ্রন্থ যাচাই করা সম্ভব। এটা একটা বাস্তব সত্য। আর সত্যিটাই এর অলৌকিকতার প্রমাণ। কুরআন লিখিত আকারে সংরক্ষিত হোক কিংবা স্মৃতির মাধ্যমে, সবই প্রকৃত আকারে বিদ্যমান। এই সত্যিটা এর প্রমাণ যে, অহির প্রথম সময় হতে আজ পর্যন্ত কুরআন সংরক্ষিত আছে। এই অপরিবর্তন অবিকৃতি এটাও দেখিয়ে দেয় যে, কুরআনকে বিকৃত করার যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

 

কুরআনে পরিবর্তন অসম্ভব

কুরআনের সংখ্যা এত বেশি যে, পৃথিবীর প্রতিটি মুসলিম বাড়ি এবং মসজিব ধ্বংস না করে সমস্ত কুরআনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আর এটা তো লিখিত কুরআনের জন্য। অসংখ্য মানুষ কুরআনকে নিজের স্মৃতিতে সংরক্ষিত রেখেছে, সেটা পরিবর্তন করা তো আরও কঠিন, বরং অসম্ভব।  

 

যদি কেউ এক বা একাধিক লিখিত কুরআনে পরিবর্তন করে ফেলে, নিজের ব্যক্তিগত শব্দ তাতে প্রবিষ্ট করে দেয় তাহলে যখনই সেটা কুরআন মুখস্ত আছে এমন কোনো মুসলমান পাঠ করবে কিংবা জনসমাজে পাঠ করা হবে তখনই তা দ্রুত প্রকাশ পাবে। পাঠক ব্যক্তিই বুঝিয়ে দেবে যে, এটা প্রকৃত কুরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর যদি এমন কোনো ব্যক্তি তা পাঠ করে যার কুরআন মুখস্ত নেই এবং তা জনসমক্ষে পাঠ না করা হয় তবুও ভাষাপ্রবাহের মধ্যেই তার অসঙ্গতি প্রকাশ পাবে।

 

যদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো তুমুল যুদ্ধে সমস্ত লিখিত কুরআন নষ্ট হয়ে যায়, তাতে পরিবর্তন করে ফেলে অথবা ধ্বংস করে দেয়, তবুও মুসলমানদের মধ্যে পুনরায় তা প্রস্তুত করার শক্তি থাকবে, কারণ অসংখ্য মুসলমান নিজের স্মৃতিতে সেই কুরআন সংরক্ষিত রেখেছে।

 

তথ্যসূত্র

http://www.freewebs.com/proofofislam/authenticityofquran.htm, http://www.islamreligion.com/articles/18/

  • স্যার উইলিয়াম মুয়ের, মুহাম্মাদের জীবনী, লন্ডন, ১৮৯৪, খণ্ড ১, সূচনা
  • এচ.এ.আর. গিব, ইসলামধর্ম, লন্ডন, অক্সফর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৬২, পৃঃ ২৫
  • আর্থার জেফরি, Materials for the History of the text of the Qur’an, পৃঃ ৩১
  • উইলিয়াম গ্রাহাম, beyond the written Word, পৃঃ ৮০
  • কেনেথ ক্রাগ, The Mind of the Qur’an, পৃঃ ২৬
  • গোল্ডযিহার, Muslim Studies II,
  • বেলাল ফিলিপ্স, উসূলে তাফসির, পৃঃ ১৫৯
  • জেফরি লঙ, struggling to surrender, পৃঃ ৯২

775 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page