ইসলামে পরকালের অতুলনীয় ধারণা


ধর্মের কথা আলোচনা হলেইঅনেক মানুষের মাথায় বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের কথা প্রথমেই আসে। অধিকাংশ ধর্মে আধ্যাত্মিক দিক এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়াদি সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে, যেমন : মৃত্যুর পর কাফন-দাফন, জন্মের পর ধর্মীয় আচার, বিবাহ, তালাক, পারিবারিক বিষয়াদি, একটি সুস্থ ও সফল জীবন যাপন প্রভৃতি। মানবজাতির উপর যাবতীয় দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং ওই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিণতি তুলে ধরা হয় না আর কাউকে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।  

 

এই জন্যই মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছে যে, যদি তারা আধ্যাত্মিক বিষয়াদি যথানিয়মে পালন করে তাহলে অন্য লোকদের উপর তারা অন্যায়-অবিচার করলেও তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। উদাহরণস্বরূপ : একজন মানুষ জনসাধারণের অর্থ আত্মসাৎ করে, অপরদিকে মন্দিরে স্বর্ণ-রৌপ্য দান করে এবং এই আশায় থাকে যে, এহন সৎকার্যের বিনিময়ে সমাজবিরোধী পাপাচার ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিছু সংখ্যক মানুষ পাপমুক্ত হওয়ার জন্য পবিত্র নদিতে স্নান করে আর একাংশ লোক ক্ষমা প্রার্থনার জন্য কোনো সাধুর নিকট তাদের অপরাধ স্বীকার করে এই ভেবে যে, এর বিনিময়ে দেবতা তাদেরকে ক্ষমা করে দেবে। আর এগুলো সাব্যস্ত করার জন্য মানুষ বিভিন্ন ধরনের যুক্তি দেয়।

 

বিষয়সূচি

 

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের দায়িত্ব

আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষের কর্তব্যকে দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যথা :

  • আল্লাহ্‌ সম্পর্কিত কর্তব্য
  • মানব সম্পর্কিত কর্তব্য

 

আমাদের সহযোগী মানুষের প্রতি আমাদের কর্তব্যের গুরুত্ব কত, তা আল্লাহ্‌ তাআলা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন।

 

কুরআন ও হাদিস হতে তার কয়েকটি নমুনা :

কুরআন

 “তোমরা আল্লাহর উপাসনা করোকোনোকিছুকে তাঁর অংশী করো না, এবং পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো[সূরা নিসা:৩৬]

 

“পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই;কিন্তু পুণ্য আছে আল্লাহ্‌,পরকাল,ফেরেশতা,ঐশী গ্রন্থও নবিদের ওপর বিশ্বাস করলে আর আল্লাহ্‌র ভালোবাসায় আত্মীয়স্বজন,পিতৃহীন,অভাবগ্রস্ত,মুসাফির,সাহায্যপ্রার্থীদেরকে ও দাসমুক্তির জন্য অর্থদান করলে,সালাতপ্রতিষ্ঠাকরলে ও যাকাত প্রদান করলেআর প্রতিশ্রুতিরক্ষা করলে,আর দুঃখ-কষ্ট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যবাদী ও সাবধানী”।[সূরা বাকারা ২:১৭৭]

 

হাদিস

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “ওই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার অন্যায় আচরণ হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়”। [সহি মুসলিম : ৭৪]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে অন্যাদের জন্য তাই ভালোবাসে যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে”। [সহি বুখারি : ১৩]

 

আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “যার হৃদয়ে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না”। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন : প্রত্যেক ব্যক্তিই চাই তার পোশাক-পরিচ্ছদ সুন্দর হোক, তার জুতো সুন্দর হোক। তিনি (স.) বললেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাআলা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। অহংকার সত্যের অবজ্ঞা এবং মানুষের জন্য ঘৃণ্য”। [সহি মুসলিম : ১৬৪]

 

যখন আমরা কুরআন ও হাদিসের বাণীগুলি অধ্যায়ন করি তখন নিঃসন্দেহে আমরা অনুধাবন করি যে, মানুষের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে এবং পরকালে আমাদের সাফল্যের জন্য ওই কর্তব্য পালন অত্যন্ত গুরুত্ব রাখে।

 

আমাদের কর্মের দায়বদ্ধতা

আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষকে তার দুই প্রকার দায়িত্ব সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করবেন, তবে মানব সম্পর্কিত দায়িত্ব পালনে ত্রুটির জন্য আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষকে ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীকে ক্ষমা না করে।

 

এ কথা নিম্নোক্ত হাদিস হতে স্পষ্ট :

“যে ব্যক্তি তার কোনোমুসলমান ভাইয়ের প্রতি সম্মান কিংবা অন্য কোনোবিষয়ে অন্যায়করেছে, সে যেন আজই তার নিকট থেকে তা ক্ষমাচেয়েনেয়;ওই দিন আসার পূর্বে যেদিন তার নিকটে কোনোদিরহাম ও দীনার থাকবে না। যদি তার নিকট সৎকর্মথাকেতবে তাত্থেকে তার অন্যায়পরিমাণ সওয়াবনিয়ে অত্যাচারিত ব্যক্তিকে দেয়া হবে।আর যদি তার কাছে সওয়াবনা থাকেতবে অত্যাচারিতব্যক্তির গোনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে”। [সহি বুখারি : ২২৬৯]

 

“একদা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন:“তোমরা কি জানোনিঃস্ব কে ?”সাহাবিগণ বললেন:আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই তো নিঃস্ব যার দিরহামও ধন-সম্পদ নেই। তখন নবিকরিমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন:“যে দুনিয়া হতে সালাত, সিয়াম ও যাকাত আদায় করে আসবে এবং সাথে ঐ সকল লোকেরাও আসবেযাদের কাউকে সে গালি দিয়েছে,কারো অপবাদ রটিয়েছে,কারো ধনসম্পদ গ্রাসকরেছে,কাউকে হত্যা করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। সুতরাং এই হকদারকে (অন্যায়েরবিনিময়ে) তার সওয়াবহতে প্রদান করা হবে। এভাবে সকল অধিকারীরঅধিকারপরিশোধ করার পূর্বে যদি তার সওয়াবশেষ হয়ে যায়,তখন তাদের গোনাহসমূহওইব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে”। [সহি মুসলিম : ৬২৫১]

 

উপরোল্লেখিত হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষকে অন্যদের বিষয়ে তাদের কর্তব্যে যত্নবান হতে হবে যেমন তারা আল্লাহ্‌ তাআলা সম্পর্কিত কর্তব্যে যত্নবান থাকে। শুধু সালাত ও সিয়াম পালন করে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, বরং এর জন্য তাকে মানুষের সঙ্গে সদাচারীও হতে হবে।

 

ইসলামে পরকালের এই অতুলনীয় দিকটি অনুধাবন করতে পারলে একটি নৈতিক, প্রেমময়, সম্প্রীতিপূর্ণ ও যত্নশীল সমাজের পথ সুগম হবে।

 

নিরাপদ বিকল্প

সর্বদা নিরাপদ বিকল্প নির্বাচন করা একটি মানবপ্রকৃতি। যেমন : আপনার সামনে দুটি আপেল আছে। একটি টাটকা আর অন্যটি দশদিনের পুরানো। যদি আপনাকে ওই দুটির মধ্যে যেকোনো একটি নিতে বলা হয় তাহলে তাজাটা নেবেন, অর্থাৎ আপনি সর্বদা চাইবেন নিরাপদ অবস্থান অবলম্বন করতে। যদি আপনি নিজেকে অন্যায়, অনাচার, অসদাচরণ হতে বিরত রাখতে পারেন তাহলে আপনি সবার প্রিয়পাত্র হবেন। আর যদি আপনি অপরাধ করেন তাহলে পৃথবীর কোনো আইনে বা সংবিধানে অপরাধ অনুমোদিত নয়। যারা পরকালে বিশ্বাসী তারা পৃথিবীতে যাবতীয় অপরাধ হতে পবিত্র ও নিরাপদ থাকবে এবং পরকালে সে পুরস্কৃত হবে। সুতরাং সর্বদা নিরাপদ অবস্থান গ্রহণ করাই শ্রেয়।

 

উপসংহার   

১। আল্লাহ্‌র অধিকার ও বান্দার অধিকারে আমাদের কর্তব্যের ব্যাপারে কিয়ামতদিবসে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।

২। যে ব্যক্তি মানবসম্পর্কিত কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে ও কারো অধিকার হরণ করে ও অন্যায় করে তাহলে আল্লাহ্‌ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীকে ক্ষমা করে।

৩। বান্দার অধিকারে আমাদের যথাযথ কর্তব্য পালন পরকালে আমাদের বাসস্থানের উপর প্রভাব ফেলে।

৪। যখন মানুষ অনুধাবন করবে একজনের জন্য আরেক জনের কী দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং সেগুলো তারা কর্মে বাস্তবায়িত করবে তখন সমাজ হয়ে উঠবে নৈতিক, সম্প্রীতিশীল ও শান্তিপূর্ণ।

 

তথ্যসূত্র

http://dawah.invitetogod.com/Questions-asked-by-Non-Muslims/

249 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page