ইসলামের মূল উৎস


ইসলাম আল্লাহ্‌ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি একটি মূল্যবান উপহার যা তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর পথ দেখায়। এটি একটি একত্ববাদী ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম যার ভিত্তি কুরআন এবং নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ্‌ এবং সাহাবাবর্গের বোধ।

 

বিষয়সূচি

 

কুরআন

আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর দ্বিনকে পরিপুর্ণ করে দিয়েছেন। যেমন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে : “আজ আমি তোমার জন্য তোমার দ্বিনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমার প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং ইসলামকে তোমার জন্য দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম”। [সূরা মায়িদা ৫:৩]

 

যে মুসলমান পথভ্রষ্ট হতে চাই না তার জন্য যাবতীয় বিষয়ে কুরআন ও নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের প্রতি প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “হে মু’মিনগণ ! তোমরা আল্লাহ্‌র আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো রসূল ও তোমাদের কর্তৃত্বকারীদের। অতঃপর যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় তাহলে তা আল্লাহ্‌ ও রসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত করো- যদি আল্লাহ্‌ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাকো। এটাই কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর সমাধান”। [সূরা নিসা ৪:৫৯]

 

সত্য পথনির্দেশনার জন্য আমাদের ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যেভাবে সাহাবা কিরাম বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ্‌ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলছেন : “অনন্তর তোমরা যেরূপ বিশ্বাস স্থাপন করেছ, তদ্রূপ তারাও যদি বিশ্বাস স্থাপন করে তাহলে তারা নিশ্চয়ই সুপথপ্রাপ্ত হবে; কিন্তু যদি তারা বিমুখ হয় তাহলে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং তাদের বিপক্ষে তোমার জন্য আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। [সূরা বাকারা ২:১৩৭] আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন : “সুপথ সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং বিশ্বাসীগণের বিপরীত পথে অনুগামী হয়, তবে সে যাতে অভিনিবিষ্ট আমি তাকে তাতেই প্রত্যাবর্তিত করব ও তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব, আর তা অতিশয় নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল”। [সূরা নিসা ৪:১১৫]

 

হাদিস

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “আমি তোমাদের সাথে দুটো জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দুটোকে ধারণ করে থাকবে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। সেগুলো হলো : আল্লাহ্‌র কিতাব এবং তাঁর নবির সুন্নাহ্‌”। (মুয়াত্তা মালিক, অধ্যায় : ৪৬, হাঃ ১৬২৬; বায়হাকি : ২০৮৩৩)

 

বিদ্বানগণের অভিমত

ইসলামের বিখ্যাত পণ্ডিতগণ ইসলামের মধ্যে কোনো বিভাজন সৃষ্টি না করে এবং বিদ্বানগণের অন্ধানুসরণ না করে ইসলামি মূল উৎসের অনুসরণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। কোনো পণ্ডিত তাঁদের নামে একটি গোষ্ঠী তৈরি করার কথা বলেননি।

 

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন : “চার ইমামই (রহঃ) মানুষকে তাঁদের সব মতামতে অন্ধানুসরণ করতে নিষেধ করেছেন; আর এটা তাঁদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল”।

 

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন : “প্রকৃতপক্ষে সত্য ও সুন্নাতপন্থীগণ রসূলুল্লাহ্‌ সালাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কারো নিঃশর্ত অনুসরণ করে না। তিনি প্রবৃত্তি হতে কিছুই বলতেন না- তিনি যা বলতেন তা হত তাঁর প্রতি প্রত্যাদিষ্ট অহি”। (মাজ্‌মুউ ফাতাওয়া, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২১৬)

 

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন : “হাদিস এবং ধর্মনিষ্ঠ পূর্বসূরীদের অনুসরণ করো এবং সর্বপ্রকার নবাবিষ্কৃত বিদআত হতে সতর্ক থেকো”। (সওনুল মান্তিক্ব ওয়াল কালাম, পৃঃ ৩২)

 

তাঁর আরও একটি বিখ্যাত উক্তি আছে : “যখন সহি হাদিস পাওয়া যাবে তখন সেটাই আমার মাযহাব (মত)”। (আল-হাশিয়া (ইবনে আবিদীন) ১/৬৩; ঈকাযুল হিমাম (শায়খ সালিহ্‌ আল-ফুলানি) পৃঃ ৬২) “যে  ব্যক্তি আমার দলিলের জ্ঞান রাখে না তার জন্য আমার উক্তির উপর ভিত্তি করে ফতওয়া দেওয়া হারাম”। অন্য বর্ণনায় এসেছে : “… আমরা মানুষ; আজ আমরা যা বলছি পরের দিন তা ফিরিয়ে নিচ্ছি”। (ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন (ইবনে কাইয়িম): ২/৩০৯; আল-বাহ্‌রুর রায়িক্ব-র পার্শ্বটীকা (ইবনে আবিদীন) : ৬/২৯৩; আল-মীযান (শা’রানী) : ১/৫৫। ইমাম আবু হানিফার সহচর ইমাম যাফার, আবু ইউসুফ এবং আফিয়া ইবনে ইয়াযীদ হতেও অনুরূপ উক্তি বর্ণিত আছে; দেখুন : ঈকায, পৃঃ ৫২। ইবনে কাইয়িম (রহঃ) দৃঢ়ভাবে ইমাম আবু ইউসুফের বিষয়টির সত্যতা প্রত্যয়িত করেছেন; (ই’লামুল মুওওয়াক্কিঈন : ২/৩৪৪))।

 

“যখন আমি এমন কিছু বলি যা কিতাবুল্লাহ্‌ ও রসূলুল্লাহ্‌র সুন্নাতের বিরোধী তখন তোমরা আমার কথা উপেক্ষা করো”। (ঈকাযুল হিমাম (আল-ফুলানি) : পৃঃ ৫০)

 

ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহঃ) বলেন : “আমি শুধুমাত্র একজন মনুষ্য। আমি শুদ্ধাশুদ্ধ দুই করে ফেলি। সুতরাং আমার মতামতের উপর চিন্তাভাবনা করো; যেগুলো কিতাব ও সুন্নাহ্‌র মোতাবেক হবে সেগুলো গ্রহণ করো এবং যেগুলো কিতাব ও সুন্নাহ্‌র মোতাবেক হবে না সেগুলো উপেক্ষা করো”। (জামিউ বায়ানিল ইল্‌ম (ইবনে আব্দুল বার) : ২/৩২; উসূলুল আহ্‌কাম (ইবনে হায্ম) : ৬/১৪৯ ও ঈকায (আল-ফুলানি : ৭২))

 

“নিশ্চয়ই আমি একজন মানুষ। আমার দ্বারা সঠিক ও বেঠিক দুই ঘটতে পারে, তাই আমার মতামতের উপর চিন্তাভাবনা করো, যে কথা কিতাব ও সুন্নাহ্‌র অনুযায়ী হবে তা গ্রহণ করো এবং যে কথা কিতাব ও সুন্নাহ্‌ অনুযায়ী হবে না তা বর্জন করো”। (জামিউ বায়ানিল ইল্‌ম (ইবনে আব্দুল বার) : ১/৭৭৫)

 

ইমাম শাফিয়ী (রহঃ)বলেছেন :  “তোমাদের কারো কাছ থেকে যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামেরসুন্নাহ ছুটে না যায়। সুতরাং যখন আমি কোনো অভিমত প্রকাশ করি বা কোনো নীতি প্রণয়ন করি,তা যদি রসূল (সঃ)-এর হাদিসের বিপরীত হয় তাহলে রসূল(সঃ)-এরকথাইআমারকথা”। (তারিখে দামিশ্‌ক্ব (ইবনে আসাকির) : ১৫/১/৩; ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন : ২/৩৬৩, ৩৬৪ ও ঈকায : ১০০)  

 

মুসলমানগণসর্বসম্মতিক্রমে একমতযে, যদি কারো সামনে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ্‌ সুস্পষ্ট হয়ে যায় তাহলে তার জন্য অন্য কারো মতপথের নিমিত্ত সেই সুন্নাহ্‌ বর্জন করা বৈধ নয়। (ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন : ২/৩৬১ ও ঈকায : ৬৮)  “যখন সহি হাদিস পাওয়া যাবে তখন সেটাই আমার মাযহাব”। (মাজ্‌মুউন নাবাবি : ১/৬৩, শা’রানি : ১/৫৭)

 

“যে কোনো ক্ষেত্রে যখন মুহাদ্দিসীনগণ রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সহি হাদিস পেয়ে যান যা আমার কথার বিপরীত তখন আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিই, তা আমার জীবদ্দশায় হোক বা মৃত্যুর পর”। (আবু নুয়াইম : ৯/১০৭, হাওয়ারি ৪৭/১, ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন : ২/৩৬৩ ও ঈকায : ১০৪)

 

“যদি তোমরা আমাকে এমন কিছু বলতে দেখ যা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিসের বিপরীত তাহলে বুঝে নাও যে আমার বুদ্ধিমত্তা অন্তর্হিত হয়েছে”। (আল-আদাব (ইবনে আবি হাতিম) : ৯৩, আল-আমালি (আবুল কাসিম সামারকান্দি), যেমন এথেকে আবু হাফ্‌স আল-মুয়াদ্দাবের রচনা হতে গৃহীত : ১/২৩৪, আবু নুয়াইম : ৯/১০৬, ইবনে আসাকির : ১৫/১০/১; ওর সনদটি সহি)

 

প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য বলছি, যদি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিসের বিপরীত আমার কোনো উক্তি পাও তাহলে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রথমে, তাই আমার মতামতের অনুসরণ করো না”। (ইবনে আবি হাতিম, আবু নুয়াইম, ইবনে আসাকির : ১৫/৯/২)

 

আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) বলছেন : তোমরা আমার অভিমতের অনুসরণ করো না; আর না মালিক, শাফিয়ী, আওযাঈ, সাওরির অভিমতের অনুসরণ করো, রবং তাঁরা যেখান থেকে গ্রহণ করেছেন সেখান থেকে তোমরাও গ্রহণ করো”। (জামিউ বায়ানিল ইল্‌ম (ইবনে আব্দুল বার) : ২/১৪৯, ফুলানি : ১১৩ ও ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন : ২/৩০২)

 

“এঁদের কারো নিকট হতে দ্বিন গ্রহণ করো না, কিন্তু যা কিছু রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাবর্গ হতে এসেছে তা গ্রহণ করো; পরবর্তী স্তর তাঁদের পূর্বসূরীগণ, তাঁদের নিকট হতে গ্রহণ করা বা প্রত্যাখ্যান করা একজন মানুষের ইচ্ছাধীন”। ইমাম আহমাদের মাসায়িলে আবুদাউদ (পৃঃ ২৭৬-৭) বলছেন : “যে কেউ রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের একটি বাণী অস্বীকার করবে সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে”। (ইবনে জাওযি, পৃষ্ঠা ১৮২)   

 

উপসংহার

সুতরাং, যে পথ একজন মুসলমানকে জান্নাতের পথ প্রদর্শন করতে পারে তা হলো : মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাবর্গ হতে গৃহীত পথ। যে ব্যক্তি এই পথের অনুগামী হবে সে সফলকাম হবে এবং যে ব্যক্তি এই পথ হতে বিমুখ হবে তার বিনাশ ঘটবে। “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রসূলুল্লাহ্‌র মধ্যে রয়েছে অনুপম আদর্শ”। [সূরা আল-আহ্‌যাব ৩৩:২১]

 

তথ্যসূত্র

http://www.saudigazette.com.sa/index.cfm?method=home.regcon&contentID=20111021110918

ইমামগণের উক্তিগুলি গৃহীত এই ওয়েবসাইট হতে :  http://muttaqun.com/taqleed.html,

http://the-finalrevelation.blogspot.in/2012/08/4-imams-forbidding-taqleed.html

411 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page