ইসলামের বিনাশক


ইসলামের বিনাশক ওই সমস্ত জিনিস যা ইসলামকে বাতিল করে দেয়। সেগুলোকে ইসলামের সংহারক এজন্য বলা হয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি সেগুলোর মধ্যে কোনো একটিও করে ফেলে তাহলে তার ইসলাম বাতিল হয়ে যায় এবং একজন মুসলমান ও মু’মিন হওয়ার পর সে ওই সমস্ত লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় যারা শির্‌ক করে, প্রতিমাপুজো করে। আমরা আল্লাহ্‌ তাআলার নিরাপত্তা ও রক্ষণ কামনা করি।   

 

বিষয়সূচি

 

সূচনা

ইসলামের সংহারক বিষয়সমূহ একজন মানুষের দ্বিন, তাওহিদ ও ঈমানকে নষ্ট করে দেয়; যেরূপ পবিত্রতা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ তার পবিত্রতার অবস্থা হতে তাকে বের করে দেয়। তাই যদি কোনো ব্যক্তি অযু করে এবং পবিত্রতার অবস্থাতেই থাকে, অতঃপর সে পেশাব, পায়খানা বা বায়ু নিঃসরণ করে তার অযু ভেঙে দেয়, তাহলে তার পবিত্রতার অবস্থা বাতিল ও নষ্ট হয়ে যায়। আর সে পবিত্রতার অবস্থার মধ্যে থাকার পর অপবিত্র অবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ে। সেই অবস্থাই মুস্‌লিম, মু'মিন ও তাওহিদবাদীর জন্য প্রযুক্ত। যদি সে ইসলামের সংহারক বিষয়সমূহের মধ্যে কোনো একটি করে ফেলে তাহলে তার ইসলাম ও দ্বিন নষ্ট হয়ে যায়, মূল্যহীন হয়ে যায়। আর যদি সে এই বাতিল অবস্থার মধ্যে মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।   

 

কুর্‌আন

আল্লাহ্‌ তাআলা ইসলামের মধ্যে প্রবেশ ও তার উপর অবিচলতাকে তাঁর বান্দাদের জন্য অপরিহার্য করেছেন। ইসলাম ব্যতীত অন্যকিছুর আনুগত্য ও অনুসরণের ব্যাপারে তাদেরকে সতর্কবাণী দিয়েছেন। “আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য দ্বিন অন্বেষণ করে তা কখনোই তার নিকট হতে পরিগৃহীত হবে না; ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [সূরা আল-ইম্‌রান ৩:৮৫] তিনি তাঁর প্রিয় রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে এর প্রতিই মানুবজাতিকে আহ্বান করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ্‌ তাআলা স্বীয় গ্রন্থ আল-কুর্‌আনে আমাদেরকে এই তত্ত্ব দিয়েছেন যে, সুপথপ্রাপ্ত লোক তারা, যারা ইসলামের শিক্ষার অনুকরণ করে এবং পথভ্রষ্ট ওই সমস্ত লোক, যারা এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি আমাদেরকে বহু আয়াতে স্বধর্ম ত্যাগ এবং সর্বপ্রকার শির্‌ক ও অবিশ্বাসের কারণসমূহের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী দান করেছেন। ধর্মীয় বিদ্বানগণ উল্লেখ করেছেন যে, এক গুচ্ছ বিনাশক বিষয় রয়েছে, যেগুলো একজন মানুষকে ইসলামের পরিমণ্ডল থেকে বহিষ্কার করে দেয়। নিম্নে দশটি সুক্ষ্মতম ধ্বংসাত্মক বিষয় উল্লেখ করা হলো, পরকালে মুক্তির জন্য সেগুলো হতে আপনি নিজে বিরত থাকুন এবং অন্যদেরকে সেগুলো থেকে সতর্ক করুন। 

 

ইসলাম সংহরণের অবস্থাসমূহ

১। ইবাদতে আল্লাহ্‌র অংশী স্থাপন। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাঁর সাথে অংশীস্থাপনকে ক্ষমা করেন না; এছাড়া যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন”। [সূরা নিসা ৪:১১৬] “নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে অংশীদার করে আল্লাহ্‌ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দেবেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম; আর এরূপ অত্যাচারীদের জন্য কোনো সহায় হবে না”। [সূরা মায়িদা ৫:৭২] মৃতকে আহ্বান করা, তাদের সাহায্য কামনা করা, তাদের নামে কুর্‌বানি করা এবং তাদের নামে শপথ নেয়া প্রভৃতি ইবাদতের শ্রেণিভুক্ত।  

 

২। নিজের ও আল্লাহ্‌র মাঝে প্রতিনিধি স্থাপন করা, তাদের মধ্যস্থতা কামনা করা এবং তাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া। যারা এমন কাজ করে, তারা সর্বসম্মতভাবে অবিশ্বাসী হিসেবে গণ্য। তাদের এই বিবৃতির জন্যই আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে অবিশ্বাসী ও মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করেছেন। “আমরা তো এদের পূজা এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলার সান্নিধ্যে এনে দেবে। যে বিষয়ে তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ্‌ তাআলা নিশ্চয়ই তার মীমাংসা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, আল্লাহ্‌ তাদেরকে সুপথগামী করেন না”। [সূরা যুমার ৩৯:৩]  তারা তাদের এই বিবৃতির জন্য মিথ্যাবাদী এবং এই কর্মের জন্য অবিশ্বাসী বা কাফির।

 

৩। তাদের অবিশ্বাসী হওয়া বা তাদের বিশ্বাসের স্বীকৃতির ব্যাপারে সংশয়বশত বহুদেববাদীদেরকে অভিযুক্ত না করা এবং ওই সমস্ত লোককে অভিযুক্ত না করা যারা শির্‌ক করে বা কুফ্‌র করে। বহুদেববাদী শব্দটি ব্যাপকার্থবোধক। সর্বশ্রেণীর অবিশ্বাসী এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং প্রত্যেক অবিশ্বাসীই বহুদেববাদী। তাই যে ব্যক্তি একজন অবিশ্বাসীকে এরূপ মনে করে না, সেও তারই মতো একজন অবিশ্বাসী।    

 

৪। এই বিশ্বাস করা যে, নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পথনির্দেশিকা পূর্ণাঙ্গ নয়, অথবা অন্যদের বিধান ও বিচার এর থেকে উত্তম। যারা বাতিল উপাস্যদের বিধানকে প্রাধান্য দেয় তারা পথভ্রষ্ট। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, কিছু পথনির্দেশনা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পথনির্দেশনা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, সে পথভ্রষ্ট।

 

৫। যারা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিয়ে আসা কোনোকিছুকে অপছন্দ করে, তারাও কাফির বা অবিশ্বাসী, যদিও তারা সে অনুযায়ী আমল করে। কুর্‌আন বলছে : “এটা এজন্য যে, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা অপছন্দ করে। সে কারণে আল্লাহ্‌ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দেন”। [সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯]

 

৬। যারা ইসলামের কোনো বিষয়কে পরিহাস করে, যেমন পরকালের শাস্তি ও পুরস্কার, তারা কাফির। কুর্‌আনে উল্লেখ রয়েছে : “তুমি বলে দাও, তবে কি তোমরা আল্লাহ্‌, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রসূলের প্রতি হাসি-তামাশা করছিলে ? তোমরা অজুহাত প্রদর্শন করো না, তোমরা তো ঈমান গ্রহণের পর কুফ্‌রি করেছ”। [সূরা তাওবা ৯:৬৫-৬৬]

 

৭। এসবের মধ্যে জাদু একটি। এর ধরন : কাউকে এমন একজন থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিমুখ করা যাকে সে ভালোবাসে এবং কাউকে এমন একজনের ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করা যাকে সে সাধারণ অবস্থায় অপছন্দ করে ও ঘৃণা করে। যে ব্যক্তি জাদু অনুশীলন করে অথবা একে স্বীকৃত দেয়, সে অবিশ্বাসী ও কাফির। এর প্রমাণও কুর্‌আনের আয়াত, যাতে উল্লেখ রয়েছে : “তারা উভয়ই (ফেরেশ্তা) একথা না বলে কাউকে (এমন জিনিস) শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; সুতরাং তুমি কুফ্‌র করো না"” [সূরা বাকারা ২:১০২]

 

৮। উদাহরণস্বরূপ,কাফিরদের বিশ্বাসকে ভালোবাসা এবং ওই সমস্ত অবিশ্বাসীকে সমর্থন করা যারা অত্যাচারী এবং যারা অত্যাচারিত মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে। পবিত্র কুর্‌আনে উল্লেখ রয়েছে : “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, নিশ্চয়ই সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না”। [সূরা মায়িদা ৫:৫১]

 

৯। যারা বিশ্বাস করে যে, ইসলামের আইন লঙ্ঘন তাদের ক্ষমতাভুক্ত, তারাও কাফির। কুর্‌আনে উল্লেখ রয়েছে :“আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য দ্বিন অন্বেষণ করে তা কখনোই তার নিকট হতে পরিগৃহীত হবে না; ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [সূরা আল-ইম্‌রান ৩:৮৫]

 

১০। ইসলাম হতে বিমুখ হওয়া এবং অবাধ্য হয়ে ইসলামের শিক্ষা অর্জন ও সেই অনুযায়ী কর্ম সম্পাদনে অস্বীকার করা। পবিত্র কুর্‌আনে উল্লেখ আছে : “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলি দ্বারা উপদিষ্ট হয়েও তা হতে বিমুখ হয়ে যায় তার অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী আর কে ? আমি অবশ্যই অপরাধীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি”। [সূরা সাজ্‌দাহ্‌ ৩২:২২]

 

উপসংহার

এই সমস্ত ধ্বংসাত্মক বিষয়গুলির ক্ষেত্রে সেই দুই ধরনের লোকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, যারা সেগুলো হাসি-তামাশার স্বরে করে আর যারা আন্তরিকতার সাথে করে। এর ব্যতিক্রম কেবল সেই ব্যক্তি যাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য করা হয়। এই সমস্ত বিষয় সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই মুসলমানদের মধ্যে ঘটছে। অতএব, মুসলমানদের জন্য তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং তাদের সংস্পর্শে যেতে ভীতিবোধ করা অত্যন্ত জরুরি।

 

আমরা আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট তাঁর কঠোর শাস্তি এবং তাঁর ক্রোধের কারণসমূহ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ্‌র শান্তির ধারা ও অনুগ্রহ বর্ষিত হোক তাঁর নবির প্রতি, তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবাবর্গের প্রতি।

 

তথ্যসূত্র

 “নাওয়াকিযুল ইসলাম” (শায়খ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ্‌ বিন বায)

আরও বিস্তারিত জানার জন্য প্রণিধান করুন : শায়খ স্বালিহ্‌ আস-স্বালিহ্‌-এর পুস্তকাদি।

389 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page