ইসলামের নিরিখে সাহাবা কিরাম


সূচনা

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় যাঁরা তাঁর সাহচর্য পেয়েছিলেন তাঁরা হলেনসাহাবা। এর মধ্যে মধ্যে নর ও নারী উভয়ই শামিল আছে।

 

সাহাবি ওই ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান সহকারে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন বা তাঁকে দেখেছেন এবং ইসলামের উপরই মৃত্যুবরণ করেছেন। যাঁরা তাঁকে দেখেছেন কিন্তু তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি বরং তাঁর মৃত্যুবরণের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁরা সাহাবা বলে গণ্য হবেন না, বরং তাঁদেরকে তাবিয়ি বলা হবে। “সাহাবি” শব্দটি একবচন এবং “সাহাবা” শব্দটি বহুবচন। [১]

 

বিষয়সূচি

 

কুরআনের আলোকে সাহাবা

প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর জন্য নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাবর্গের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন আবশ্যক। আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁদের অনুসরণকে বিশ্বাসীদের জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। এ কথা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ আছে। সুতরাং আমরা মুসলমানরা যদি সুপথগামী হতে চাই তাহলে আমাদের জন্য নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাবর্গের অনুসরণ একান্তভাবে জরুরি। প্রণিধান করুন : সূরা বাকারা ২:১৩৭, সূরা নিসা ৪:১১৫, সূরা তাওবা ৯:১০০, সূরা ফাত্‌হ ৪৮:২৯ ও সূরা বায়্যিনাহ্‌ ৯৮:৮। [২]

 

সাহাবাদের শ্রণিবিভাগ

১। আস-সাবিক্বূন আল-আওওয়ালূন: যাঁরা বদর যুদ্ধের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদেরকে আস-সাবিক্বূন আল-আওওয়ালূন বলা হয়। তাঁদের আবার দুটি শ্রেণি রয়েছে :

(ক) মুহাজিরিন : যাঁরা মক্কা হতে হিজরত করেছিলেন।

(খ) আনসার : মদিনার অধিবাসীগণ যাঁরা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মক্কা থেকে হিজরত করে আগত অন্যান্য সাহাবাবর্গকে সর্বোতভাবে সাহায্য করেছিলেন।

 

২। অধিকাংশ সাহাবা :যাঁরা মক্কা বিজয়ের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে অধিকাংশ যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।   

 

৩। আসহাবুত তুলাক্বা :যাঁরা মক্কা বিজয়ের পর ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন তাঁদেরকে আসহাবুত তুলাক্বা বলে। [৩]

 

সাহাবাবর্গের মর্যাদা

তাঁরা উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মনুষ্য। তার স্থান তাবিয়িদের এবং তারপরে তাবা-তাবিয়িদের। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা.)হতে বর্ণিত আছে,অন্য সূত্রে আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে : রসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :“সর্বোত্তম মানুষআমার যুগেরমানুষ (সাহাবায়ে কিরাম)। তারপর তাদের পরের যুগের লোকেরা(তাবেয়ি), তারপর তাদের পরের যুগের লোকেরা(তাবা-তাবেয়ি)।তারপরেএমন কিছু লোক আসবে যাদের সাক্ষ্য তাদের শপথকে ছাড়িয়ে যাবে এবং যাদের শপথ তাদের সাক্ষ্যকে ছাড়িয়ে যাবে”। [সহি বুখারি : ৫/৩, ৮/৪৩৭ ও সহি মুসলিম : ৬১৫৯] [৪]

 

সাহাবাবর্গের ফজিলত

আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “আমাদের সঙ্গীদের গালাগালি করো না; সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন ! তোমাদেরকেউযদিওহুদপাহাড়পরিমাণস্বর্ণআল্লাহ্‌ররাস্তায়ব্যয়করে, তথাপিসেতাঁদেরকোনোএকজনেরপূর্ণএকমুদ্দ  বাঅর্ধমুদ্দদানসমপরিমাণপর্যন্তওপৌঁছতেপারবেনা”।[সহি বুখারি : ৩৬৭৩ ও মুসলিম : ২৫৪০]

 

পণ্ডিতদের অভিমত

ইমাম আহ্‌মাদ বিন হাম্মাল (রহ.) বলেন : “রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার একটি মূলনীতি হলো : সুন্নাতকে ঠিক সেইভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে যেমনভাবে সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরেছিলেন সাহাবা কিরাম (রা.)”।  

 

শাইখ রাবী’ বিন হাদি আল-মাদখালিইমাম আহ্‌মাদের উক্তির ব্যাখ্যায় বলেন : “সাহাবা কিরাম (রা.)-এর বোধ একটি মানদণ্ড যার দ্বারা সত্যান্বেষী মানুষ তাদের বিষয়গুলি পরিমাপ করতে পারে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবা কিরাম যাকিছু করেছেন, তার সবটাই সুপথ ও সদুপদেশ।

 

সাহাবা কিরাম (রা.) আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত তথা যাবতীয় গতিবিধি ও আচার-আচরণে সুন্নাতকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করেছেন। তাই ইমাম আহ্‌মাদ এই স্মারক, বিশাল নীতিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন যে, ধর্মের কোনো কিছুই, বিশেষ করে আকিদা এর বহির্ভূত নয়”। [৬]  

 

তাঁদের পদাঙ্কানুসরণ

এ সমস্ত দলিল এর স্পষ্ট প্রমাণ যে, ইসলামের যথার্থ বোধ প্রথম তিনটি প্রজন্মের বোধ এবং তাঁদের পথানুসরণ। পণ্ডিতদের মধ্যে এতে কোনো দ্বিমত নেই যে,ইসলামের সর্বোত্তম প্রজন্মের অনুসরণ করা হবে এবং তাঁর যেভাবে দ্বিনকে আঁকড়ে ধরে থেকেছেন আমাদেরও সেইভাবে ধরতে হবে। তাঁদের অনুসরণ আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক। তাঁদের আকিদাই হতে হবে আমাদের আকিদা। তাতে কোনো বিকৃতি, সংযোজন ও বিয়োজন করা যাবে না। আমরা সমস্ত সুন্নাত গ্রহণ করব এবং মতভেদকে আল্লাহ্‌ ও তাঁরা রসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত করব। এমন কথাই আল্লাহ্‌ তাআলা সূরা নিসার  ৫৯নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। সাহাবা কিরামের বোধের ন্যায় বোধ অর্জন করার নামই সাহাবার অনুসরণ নয়, বরং তা বাস্তবে পালন করা এবং তাঁদের আচার-আচরণকে নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করার নাম সাহাবার অনুসরণ। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

  • অহিরপূর্ণ গ্রহণ
  • জীবনে বিশ্বাস ও অহির গভীর প্রভাব
  • ব্যক্তিগত তথা সামষ্টিক জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ
  • সৎকর্মের প্রতি অন্যদের আহ্বান
  • সত্যের নির্দেশ ও অসত্যের নিষেধ
  • প্রত্যেক মুসলমানকে উপদেশ প্রদান

 

উপসংহার

সাহাবা কিরাম যেকোনো কর্ম শরিয়তের মাপকাঠি অনুযায়ী করতেন। তাঁরা সর্বদা মরণকে স্মরণ করতেন এবং তা নিয়েই ভাবতেন। তাঁদের সাথে যারা অন্যায় করত তাদেরকে তাঁরা ক্ষমা করতেন। তাঁরা অন্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেন। অন্যদের জন্য তাঁরা সর্বদা ভালোটাই ভাবতেন। তাঁরা সালাতের প্রতি যত্নশীল ছিলেন। তাঁরা পৃথিবীর উপর পরকালকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁরা মনে করতেন তাঁরা আল্লাহ্‌ তাআলার যথেষ্ট কৃতজ্ঞ হতে পারবে না। তাঁরা পাপী ও তাদের সভা থেকে দূরে থাকতেন। আল্লাহ্‌ তাআলা অলংকারপূর্ণ ভাষায় বলছেন : “মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলেরয়েছে সেজদার চিহ্ন। তাওরাতে তাদের অবস্থা এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা এরূপ যেমন একটি চারাগাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে, চাষীকে আনন্দে অভিভুত করেযাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতিদিয়েছেন”।[সূরা ফাত্‌হ৪৮:২৯]

 

আমরা আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁদের জীবনচরিত সম্পর্কে জ্ঞানলাভে সক্ষম করে তুলেন এবং আমাদের জীবনকে তাঁদের জীবনের ন্যায় গড়ে তুলতে। ইবনে তাইমিয়া বলেন : “যে কেউ বুঝে ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাঁদের জীবনী পড়বে এবং আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁদেরকে যে পুরস্কার দান করেছেন তা জানতে পারবে সে নিশ্চিত অনুধাবন করবে যে, নবিদের পর তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। পূর্বেও তাঁদের মতো কেউ ছিল না আর ভবিষ্যতেও কেউ আসবে না”।

 

তথ্যসূত্র

[১] http://www.kalamullah.com/aqeedah15.html

[২] http://www.askislampedia.com/quran

[৩] http://hilaalalislamiy.blogspot.in/

[৪] http://www.sunnah.com/

[৫] http://islamqa.info/en/ref/83121

[৬] http://hilaalalislamiy.blogspot.in/

[৭] http://www.kalamullah.com/aqeedah15.html

245 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page