ইসলামি শিষ্টাচার


ইসলাম ধর্মে বিভিন্ন আচার-আচরণের কথা উল্লেখ আছে। সেগুলো অবলম্বন করার জন্য মুসলমানদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, যাতে করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে পারে। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে : 

 

বিষয়সূচি

 

পানাহারের আদব

[১] প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত পানাহার শুরু করার সময় আল্লাহ্‌র নাম নেয়া। আর এর জন্য বলা উচিত : “বিসমিল্লাহ্‌” [অর্থাৎ আমি আল্লাহ্‌র নামে আরম্ভ করছি] এবং তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার সাথে পানাহার শেষ করতে হবে। আর এর জন্য বলবে : “আল-হামদুলিল্লাহ” [অর্থাৎ যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্‌র]। প্রত্যেকের উচিত নিজের সামনে থেকে এবং ডান হাতে খাওয়া, কারণ বাম হাত সাধারণত অপ্রীতিকর জিনিস পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করা হয়। 

উমার বিন আবি সালামাহ্‌ বলছেন :বাল্য জীবনে আমি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খিদমতে ছিলাম (খাচ্ছিলাম)। খাবার পাত্রে আমার হাত ছুটাছুটি করছিল। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন : “এই বৎস ! আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে ডান হাতে খাও এবং নিজের সামনে থেকে খাও”। [সহি বুখারি : ৫৩৭৬ (৭/২৮৮)]

 

[২]কখনও খাবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ কিংবা কুমন্তব্য করা উচিত নয়, যদিও তা সুস্বাদু না হয়। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কখনও কোনো খাবারের নিন্দা করেননি। পছন্দ হলে তিনি খেতেন, নইলে ছেড়ে দিতেন”। [সহি বুখারি : ৩৫৬৩ (৪/৪৬৪)]

 

[৩] অতিরিক্ত পানাহার বর্জনীয়। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : (খাও এবং পান করো, কিন্তু অপব্যয় ও অমিতাচার করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।)  [কুরআন ৭:৩১]

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “মানুষ পেটের চেয়ে খারাপ কোনো পাত্র পূরণ করে না। মানুষের জন্য কয়েক গ্রাস খাবার খাওয়াই যথেষ্ট যাদ্বারা সে নিজের পৃষ্ঠদেশ সোজা রাখতে পারে। আর যদি তাকে বেশি খেতেই হয় তাহলে সে যেন পেটের এক-তৃতীয়াংশ খায়, এক-তৃতীয়াংশ পান করে এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ফাঁকা রাখে”। [তিরমিযি : ২৩৮০ (৪/১০)]  

 

[৪] পাত্রের মধ্যে শ্বাস ত্যাগ করা বা ফুঁ দেয়া ঠিক নয়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করছেন, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পাত্রের মধ্যে শ্বাস ত্যাগ করতে বা ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। [আবুদাউদ (অধ্যায় : ২৬, হাঃ ৩৭১৯) ও তিরমিযি (অধ্যায় : ৩, হাঃ ৭৬৬)]

 

[৫] কারো জন্য অন্যদের খাবার বা পানীয় নষ্ট করা উচিত নয়।

 

[৬] প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত অন্যদের সঙ্গে খাওয়া। ভিন্নভিন্ন ভাবে খাওয়া ঠিক নয়। জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বললেন : “আমরা খায়, কিন্তু ক্ষুধা নিবারিত হয় না”। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : “তোমরা একসঙ্গে খাও, নাকি ভিন্ন ভিন্ন?” তিনি বললেন : “ভিন্ন ভিন্ন”। তিনি (সঃ) বললেন : “তোমরা একসঙ্গে খাও এবং আল্লাহ্‌ তাআলার নাম নিয়ে খাও, তবে তোমাদের খাবারে বরকত হবে”। [আবুদাউদ, অধ্যায় : ৩, হাঃ ৭৪৩]

 

[৭] কোনো আমন্ত্রণে অন্যদের নিয়ে আসার জন্য আমন্ত্রণকারীর নিকট অনুমতি নিতে হবে। আবু শুয়াইব (রাঃ) নামে একজন আনসারি সাহাবি পাঁচজন লোককে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। অন্য একজন তাঁদের সঙ্গে চলে এলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “এই লোকটি আমাদের সঙ্গে এসেছে। যদি তুমি অনুমতি দাও তাহলে সে ভেতরে যাবে; অন্যথায় সে ফিরে যাবে”। নিমন্ত্রণকারী বললেন : “না, বরং আমি তাঁকে অনুমতি দিচ্ছি”। [সহি বুখারি : ৭৩৯]

 

পেশাব-পায়খানার আদব

পেশাব-পায়খানায় প্রবেশকালীন দুআ পাঠ করা উচিত। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পেশাব-পায়খানায় প্রবেশ করার সময় বলতেন : “বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস” (অর্থাৎ আমি শুরু করছি আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে। হে আল্লাহ্‌ ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুষ্ট জিন ও জিন্নী থেকে”। [সুনানে আবুদাউদ, খণ্ড : ৪, অধ্যায় : ১, হাঃ ৪]

 

আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “পেশাব-পায়খানা হতে বেরোনোর সময় রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলতেন : “গুফ্‌রানাক” (অর্থাৎ আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি)। [তিরমিযি, অধ্যায় : ১, হাঃ ৭]

 

ক্বিবলার দিকে মুখ করে বা পিছনে রেখে পেশাব-পায়খানা অনুচিত। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করছেন : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “তোমাদের কেউ যখন পেশাব-পায়খানায় যাবে, তখন সে যেন ক্বিবলামুখী হয়ে কিংবা ক্বিবলাকে পেছনে রেখে না বসে। এবং তিনটির কম পাথর দিয়ে এবং গোবর বা হাড় দিয়ে ইসতিনজা না করে”। [মুসলিম : ১০৩]

 

যখন কেউ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবে তখন সে যেন লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। জাবির (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মল-মুত্রত্যাগের জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যেতেন”। [আবুদাউদ : ২]

 

 মল-মুত্র পরিষ্কার করার জন্য ডান হাত ব্যবহার করা অনুচিত। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যখন তোমাদের কেউ পান করে তখন সে যেন পাত্রে নিশ্বাস ত্যাগ না করে। যখন তোমাদের কেউ পেশাব-পায়খানায় যায় তখন সে যেন ডান হাত দ্বারা গুপ্তাঙ্গ স্পর্শ না করে এবং ডান হাত দ্বারা ইসতিনজা না করে”। [সহি বুখারি : ১৬৪৮]

 

অনুমতি কামনার আদব

[১] কেউ গৃহের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রবেশের অনুমতি কামনা করছে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : (হে ঈমানদারগণ ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারো গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদেরকে সালাম না করে প্রবেশ করো না)। [কুরআন ২৪:২৭]

 

[২] কেউ গৃহাভ্যন্তরে রয়েছে এবং প্রকোষ্ঠে প্রবেশের অনুমতি চাইছে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : (তোমাদের সন্তান-সন্ততি বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তারাও যেন অনুমতি কামনা করে, যেমন তাদের বয়ঃজ্যোষ্ঠরা করে)। [কুরআন ২৪:৫৯]

 

এর উদ্দেশ্য গৃহবাসীদের নিরাপত্তা এবং গৃহের গোপনীয়তা রক্ষা, যেমন রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদিসে ইঙ্গিত করা হয়েছে : “জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ঘরে দরজার ছিদ্র দিয়ে উঁকি মারছিল। সেসময় তাঁর হাতে একটি দাঁতন ছিল যা দিয়ে তিনি মাথা চুলকাচ্ছিলেন। তিনি তাকে বললেন : যদি আমি জানতাম যে, তুমি দেখছ তাহলে আমি এটা দিয়ে তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। নিশ্চয়ই অনুমতি কামনা করা জরুরি, যেন কেউ অন্য কারো গৃহের গোপন কিছু দেখে না ফেলে”। [সহি বুখারি, খণ্ড : ৫, অধ্যায় : ৪৫, হাঃ ৬২৪১]

 

[৩]  নাছোড়বান্দার মতো  অনুমতি চাইতেই থাকা ঠিক নয়।রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “একজন মানুষকে তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করা উচিত। যদি অনুমতি দেয়া হয় তাহলে ভালো, অন্যথায় তার ফিরে যাওয়া উচিত”। [মুসলিম]  অনুমতিপ্রার্থীর উচিত নিজের পরিচয় দেয়া। জাবির (রাঃ) বলছেন : আমি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট আমার পিতার ঋণের বিষয়ে এলাম। আমি দরজায় করাঘাত করলাম। তিনি জাজ্ঞাসা করলেন : “কে ওখানে ?” আমি বললাম : “আমি”। তিনি বললেন : “আমি, আমি !!” মনে হচ্ছিল, তিনি আমার উত্তর পছন্দ করেননি”। [সহি বুখারি : ৬২৫০]

 

অভিবাদনের (সালামের) আদব

ইসলাম সমাজের সমস্ত মানুষকে সালামের মাধ্যমে একে-অপরকে অভিবাদন জানানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। এর ফলে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব বৃদ্ধি পায়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “তোমরা ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনয়ন করো এবং তোমরা ততক্ষণ মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাস। আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছু বলে দেব না যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে পারবে ? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম বিস্তার করো”।[মুসলিম : ৬৮]

 

যে কেউ সালাম প্রাপ্ত হয় তার জন্য সালামের জবাব দেয়া অপরিহার্য। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “যখন তোমরা শুভাশিষে সালাম ও অভিবাদন প্রাপ্ত হও, তখন তোমরা তা হতে শ্রেষ্ঠতর সম্ভাষণ করো অথবা অনুরূপ প্রত্যার্পণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী”। [সূরা নিসা ৪:৮৬]

 

ইসলাম এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কে প্রথমে সালাম বলবে।রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “একজন আরোহী পথচারীকে সালাম বলবে, একজন পথচারী উপবিষ্ট ব্যক্তিকে সালাম বলবে এবং ছোটো দল বৃহৎ দলকে সালাম বলবে”। [মুসলিম : ৮৫৭]

 

বসার স্থানের আদব

কোনো সমাবেশে প্রবেশকালীন তথা বিদায়কালীন সেখানে উপস্থিত লোকজনকে সালাম করা বাঞ্ছনীয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “তোমাদের কেউ যদি কোনো সভায় যায় তাহলে সেখানকার লোকজনকে সালাম দ্বারা সে যেন অভিবাদন জানায়। যদি মনে হয়, তার বসে পড়া উচিত তাহলে সে বসে পড়বে। সেখান থেকে বিদায় নেয়ার সময় তাদেরকে সালাম জানিয়ে বিদায় নেবে। কেননা প্রথমটি দ্বিতীয়টি অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়”। [আবুদাউদ ও তিরমিযি]

 

মানুষের উচিত অন্যদের জন্য জায়গা করে দেয়া। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : (হে মু’মিনগণ ! যখন তোমাদেরকে বলা হয় : সভায় স্থান প্রশস্ত করে দাও তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও, আল্লাহ্‌ তোমাদের স্থান প্রশস্ত করে দেবেন। আর যখন বলা হয় : উঠে পড়ো তখন উঠে পড়বে। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করবেন। তোমরা যাকিছু করো আল্লাহ্‌ তাআলা সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।)[কুরআন ৫৮:১১]

 

কাউকে তার স্থান থেকে তুলে দিয়ে সেখানে নিজে বসে পড়া বাঞ্ছনীয় নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “একজনের জন্য অন্য একজন নিজের স্থান থেকে উঠে পড়ুক যেন তারপর সে ওখানে বসে, এমনটা বাঞ্ছনীয় নয়। বরং তোমরা স্থান প্রশস্ত করো এবং (অন্যদের জন্য) জায়গা করে দাও”। [মুসলিম]

 

যদি কোনো ব্যক্তি তার স্থান ছেড়ে চলে যায়, অতঃপর সে ফিরে আসে তাহলে সেই জায়গার উপর তারই বেশি অধিকার থাকে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যদি কোনো ব্যক্তি তার জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং পরে সেখানে ফিরে আসে, তাহলে সেই জায়গার উপর তারই বেশি অধিকার আছে”।[মুসলিম]

 

দুইজন লোক একসঙ্গে বসে আছে। এমন সময় তাদের উভয়ের অনুমতি না নিয়ে তাদের মধ্যে আগমণ করা বাঞ্ছনীয় নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “দুইজন লোককে পৃথক করে দেয়া (তাদের মাঝে উপনীত হয়ে) কারো জন্য বৈধ নয়, যতক্ষণ না তারা অনুমতি দেয়”। [আবুদাউদ, অধ্যায় : ৪২, হাঃ ৪৮২৭]

 

তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতে কোনো একজনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ও গোপনীয়ভাবে কথা বলে অনুচিত। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : যদি তোমরা তিনজন থাকো তাহলে দু’জন যেন তৃতীয়জনকে ছেড়ে ভিন্নভাবে কথা না বলে, যতক্ষণ না তোমরা আরও কিছু লোকের সঙ্গে যোগদান করো; কারণ সেটা করলে সে দুঃখ পাবে”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

কোনো সভায় অনর্থ আলোচনা বা আল্লাহ্‌ তাআলার স্মরণশূন্য কথাবার্তায় কিংবা এমন আলোচনায় ব্যস্ত থাকা বাঞ্ছনীয় নয় যাতে পার্থিব তথা ধর্মীয় কোনো উপকার নেই। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যারা এমন কোনো সভা থেকে প্রস্থান করে যাতে আল্লাহ্‌ তাআলার নাম নেয়া হয়নি, তারা ওই সমস্ত লোকের ন্যায় যারা কোনো গাধার মৃতদেহের নিকট থেকে প্রস্থান করে। তাছাড়া সেই সভা তাদের দুঃখের একটি কারণ হবে”। [আবুদাউদ]

 

সমাবেশের মধ্যে এমন কিছু করা উচিত নয় যেটা তার সঙ্গীরা অপছন্দ করে।

 

সমাবেশের আদব

ইসলাম মানুষকে সমাবেশের সাধারণ, কিন্তু খুব সুন্দর নির্দেশনা দিয়েছে; যেন মানুষ ওখানে সমবেত হতে চায়। ইসলাম স্বীয় অনুসারীদেরকে নির্দেশনা দিচ্ছে যে, তারা যেন সভায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, পুতিদুর্গন্ধের সাথে যেন না আসে যা মানুষ পছন্দ করে না এবং তারা যেন খুব সুন্দর পোশাকে আসে যা দেখে মানুষ অতিষ্ঠ হয় না। ইসলাম মানুষকে আরও নির্দেশনা দিচ্ছে যে, তারা বক্তার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করবে, তাতে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না, যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসে পড়বে, কাউকে অতিক্রম করে যাবে না বা কারো অস্বস্তির বা অসুবিধার কারণ হবে না। জুমআর স্বালাতের জন্য সমাবেশ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

 

 “যে কেউ শুক্রবারে স্নান করে, সম্ভব হলে সুগন্ধি ব্যবহার করে, সুন্দর বস্ত্র পরিধান করে, অতঃপর জুমআর স্বালাতের জন্য উপস্থিত হয় আর সেখানে কারো ঘাড়ের উপর দিয়ে আগে বাড়ে না এবং যত রাকআত সম্ভব স্বালাত আদায় করে, ইমামের মেন্বরে ওঠা থেকে শুরু করে স্বালাত সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকে তার এই স্বালাত পরবর্তী (জুমআর) স্বালাত পর্যন্ত পূর্ণ এক সপ্তাহের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে”। [আবুদাউদ ও ইবনে মাজাহ্‌]

 

কারো হাঁচি এলে তার বলা উচিত : “আল্‌হামদুলিল্লাহ্‌” (যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্‌র নিমিত্তে)। যে তাকে এটা বলতে শুনবে তার বলা উচিত : ইয়ারহামুকাল্লাহ্‌” (তোমার উপর আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বর্ষিত হোক)। এর জবাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আবার বলা উচিত : “ইয়াহ্‌দিকুমুল্লাহ্‌ ওয়া ইয়ুস্‌লিহু বালাকুম” (আল্লাহ্‌ তোমাকে সুপথপ্রাপ্ত করুন এবং তোমার জীবনকে স্বাচ্ছন্দময় করুন)।

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যখন তোমাদের কারো হাঁচি আসে তখন সে যেন বলে : “আল্‌হামদুলিল্লাহ্‌”, অতঃপর তার ভাই বা সঙ্গী যেন বলে : “ইয়ারহামুকাল্লাহ্‌”, এটা শুনে সে যেন আবার বলে (যার হাঁচি আসবে সে বলবে) : “ইয়াহ্‌দিকুমুল্লাহ্‌ ওয়া ইয়ুস্‌লিহু বালাকুম”। [বুখারি]

 

এ বিষয়ে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে আরও বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “কারো হাঁচি এলে সে যেন তার মুখের উপর নিজের হাত রাখে এবং তার স্বর নিচু রাখে”। [আল-হাকিম]

 

যখন কেউ হাই তোলার মতো কিছু অনুভব করে তখন সে যেন যথাসম্ভব তা দমন করার চেষ্টা করে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাআলা হাঁচিকে ভালোবাসেন কিন্তু হাই তোলাকে ঘৃণা করেন। যখন কারো হাঁচি আসে, অতঃপর সে আল্লাহ্‌ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তাঁর প্রশংসা করে তখন এটা তার অধিকারভূক্ত হয়ে যায় যে, যে মুসলমানই তাকে (আল্‌হামদুলিল্লাহ্‌) বলতে শুনবে সে বলবে : “ইয়ার্‌হামুকাল্লাহ্‌”। আর হাই শয়তানের পক্ষ হতে আসে। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত যথাসম্ভব সেটা দমন করা। আর যখন তোমাদের কেউ (হাই তোলার সময়) আ-হ্‌ উচ্চারণ করে তখন শয়তানের হাসি পায়”। [বুখারি]

 

 (মুখ দিয়ে পাকস্থলি হতে উচ্চ স্বরে) ঢেকুর তোলা কারো জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দরবারে ঢেকুর তুলল। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন : “তোমার ঢেকুর হতে আমাদেরকে রক্ষা করো, কেননা এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে পরিতুষ্ট লোক কিয়ামতদিবসে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুধার্ত থাকবে”। [তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ্‌ ২৭২২]

 

বাক্যালাপের আদব

বক্তার কথা সর্বদা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা উচিত, বক্তৃতা শেষ না হওয়া অবধি তাকে কোনোভাবে বিরক্ত করা ঠিক নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিদায়-হজ্জে তাঁর বিদায়-ভাষণ আরম্ভ করেই তাঁর কোনো এক সাহাবিকে বলেছিলেন : “লোকজনকে নীরব থাকতে বলো”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

প্রত্যেকের উচিত পরিষ্কারভাবে কথা বলা এবং নিজের বিষয়বস্তুর যথাযথ ব্যাখ্যা করা, যেন শ্রোতারা তার বক্তব্য বুঝতে পারে। নবির পত্নী আয়েশা (রাঃ) বলছেন : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য এতটাই পরিষ্কার হত যে, যে কেউ তাঁর কথা শুনত, তাঁর কথা বুঝতে পারত”। [আবুদাউদ]

 

বক্তা এবং শ্রোতা উভয়েরই মুখবয়ব ও কথাবার্তা যেন তৃপ্তিকর ও আনন্দদায়ক হয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “তোমরা কোনো সৎকর্মকেই অবজ্ঞা করো না, যদিও তা হাস্যরঞ্জিত চেহারা নিয়ে তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত হয়”। [মুসলিম]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “মানবদেহের প্রতিটি জোড়ের উপর প্রত্যহ একটি করে সাদকা রয়েছে। দু’জন লোকের মধ্যে ন্যায় বিচার করা একটি সাদকা; কাউকে বাহনে আরোহণ করায় সহযোগিতা করা বা তার উপর তার সামগ্রী তুলে দেয়া একটি সাদকা; উত্তম কথা বলাও একটি সাদকা; ফরজ স্বালাতের জন্য মসজিদের পথে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ একটি সাদকা এবং পথ হতে কোনো কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেয়াও একটি সাদকা”।[বুখারি]

 

রসিকতার আদব

ইসলামি জীবন কিছু অবিশুদ্ধ বিশ্বাসের নাম নয়। এমন নয় যে, এতে কোনো প্রকার বিনোদনের সুযোগ নেই। হানযালা উসায়দি নামক রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবি বলেন : আমার সাথে আবু বাক্‌র (রাঃ)-র সাক্ষাত হলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন : কেমন আছ ? হানযালা ! তিনি উত্তর দিলেন : “হানযালা মুনাফিক্ব হয়ে গেছে”। তিনি উত্তর দিলেন : “প্রত্যেক অপূর্ণতা হতে আল্লাহ্‌ তাআলা অনেক উর্ধ্বে ! তুমি কী বলছ ?” হানযালা বললেন : “যখন আমরা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে থাকি তখন তিনি আমাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা মনে করিয়ে দেন, ফলে মনে হয় যেন সেগুলো আমাদের চোখের সামনে রয়েছে, কিন্তু যখনই আমরা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট হতে প্রস্থান করি তখনই আমরা আমাদের পত্নী, সন্তান-সন্ততি এবং ধনসম্পদ নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়ি আর আমরা অনেক কিছুই ভুলে যায়”। আবু বাক্‌র (রাঃ) বললেন : “আল্লাহ্‌র শপথ! এমন তো আমার সঙ্গেও হয়”। তারপর আবু বাক্‌র এবং আমি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলাম। আমি বললাম : “হে আল্লাহ্‌র রসূল ! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে !” রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন : “সেটা কীভাবে ?” আমি বললাম : “যখন আমরা আপনার সঙ্গে থাকি তখন আপনি আমাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা মনে করিয়ে দেন, ফলে মনে হয় যেন সেগুলো আমাদের চোখের সামনে রয়েছে, কিন্তু যখনই আমরা আপনার নিকট হতে চলে যায় তখনই আমরা আমাদের পত্নী, সন্তান-সন্ততি এবং ধনসম্পদ নিয়ে মগ্ন হয়ে যায় আর আমরা অনেক কিছুই ভুলে যায়”। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে ! তোমরা আমার নিকট যে অবস্থায় থাক যদি সেই অবস্থাতেই অবিচল থাক তাহলে ফেরেশ্তাগণ তোমাদের সাথে মুসাফাহ্‌ করবেন এবং তোমাদের গৃহ পরিদর্শন করবেন। কিন্তু একটি সময় এর জন্য আর একটি সময় ওর জন্য”। [মুসলিম]

 

এখানে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন যে, কিছু অনুমোদিত আমোদ-প্রমোদ ও বিনোদন কাম্য যেন মানুষ সক্রিয়তা ও প্রাণবন্ততা পুনরায় ফিরে পায়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম স্বীয় সাহাবাবর্গকে কৌতুক ও রসিকতার আদব-কায়দারও শিক্ষা দান করেছেন। তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন : “হে আল্লাহ্‌র রসূল ! আপনি কি আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন ?” তিনি উত্তর দিলেন : “হ্যাঁ, কিন্তু আমি ন্যায় ও সত্য বই অনর্থ কিছু বলি না”। [তিরমিযি]

 

যে কেউ কথা ও কর্মের মাধ্যমে রসিকতা করতে পারে। আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করছেন, যাহির নামে জনৈক বেদুইন রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট মরুভূলি হতে উপহার নিয়ে আসতেন এবং রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দিয়ে বিধিবিধান প্রেরণ করতেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “যাহির আমাদের মরুভূমি এবং আমরা তার শহর”। একদিন যাহির তাঁর পণ্যসামগ্রী বিক্রি করছিলেন, এমন সময় রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর নিকট গিয়ে পেছন দিক থেকে তাঁকে করায়ত্ত করলেন। যাহির বললেন : “আমাকে ছাড়ো”। অতঃপর তিনি পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলেন তো রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ছিলেন। তারপর তিনি স্বীয় পৃষ্ঠদেশ তাঁর বক্ষের সঙ্গে লাগিয়ে দিলেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ডাক দিলেন : “এই গোলামটিকে কে কিনবে ?” যাহির বললেন : “হে আল্লাহ্‌র রসূল ! আপনি আমার কোনো মূল্য পাবেন না”। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “কিন্তু তুমি আল্লাহ্‌র নিকট মূল্যহীন নও; বরং তুমি আল্লাহ্‌র বিচারে খুব মূল্যবান”। [ইবনে হিব্বান]

 

একজন মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে কিংবা অসৎ আচরণের উদ্দেশ্যে রসিকতা করা বাঞ্ছনীয় নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “একজন মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়”।[আবুদাউদ]

 

তিনি (সঃ) আরও বলেন : “কেউ যেন তার ভাইয়ের জিনিসপত্র (তাকে ক্রুদ্ধ করার জন্য) সত্যিসত্যিই কিংবা রহস্যচ্ছলেও না নেয়”। [আবুদাউদ ও তিরমিযি]

 

কারো জন্য কখনও রহস্যচ্ছলেও মিথ্যা বলা বৈধ নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “দুর্ভোগ ওই ব্যক্তির জন্য যে মানুষকে হাসাবার জন্য মিথ্যা কথা বলে। দুর্ভোগ তার জন্য ! দুর্ভোগ তার জন্য !” [আহ্‌মাদ ও আবুদাউদ]

 

রোগী পরিদর্শনের আদব

রোগী পরিদর্শনের প্রতি ইসলাম মানুষকে বলিষ্ঠ ভাষায় উদ্বুদ্ধ করেছে এবং এটাকে এক মুসলমানের উপর আরেক মুসলমানের অধিকার হিসাবে অভিহিত করেছে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “এক মুসলমানের উপর আরেক মুসলমানের পাঁচটি অধিকার রয়েছে : সালামের জবাব দেয়া, রোগী পরিদর্শন, জানাযায় অংশ গ্রহণ, নিমন্ত্রণ গ্রহণ এবং হাঁচি এলে যে আল্‌হামদুলিল্লাহ্‌ বলবে তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ্‌ বলা”। [বুখারি]

 

অসুস্থ ভাইকে পরিদর্শন করার বিনিময়ে একজন মুসলমান উত্তম পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “যে কেউ অসুস্থ ব্যক্তির পরিদর্শন করবে সে ধারাবাহিক পুরস্কার পেতে থাকে যতক্ষণ না সে ফিরে আসে”। [মুসলিম]

 

রোগী দেখতে যাওয়ার সময় তার প্রতি ভালোবাসা এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করা বাঞ্ছনীয়। ইবনে সা’দ বর্ণনা করছেন, তাঁর পিতা বলেছেন : “আমি মক্কায় অসুস্থ ছিলাম। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখতে আসেন। তিনি আমার কপালে হাত রাখেন এবং আমার বুক ও পেটের উপর হাত বুলিয়ে দেন আর আল্লাহ্‌ নিকট এই বলে দুআ করেন : “হে আল্লহ ! সা’দকে আরোগ্য দান করুন”। [আবুদাউদ]

 

রোগীর জন্য দুআ করা উচিত।রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “যে কেউ রোগী পরিদর্শন করে যার মৃত্যুর সময় এখনও আসেনি এবং সাতবার বলে : “আস্‌য়ালুল্লাহাল আযীম, রব্বাল আর্‌শিল আযীম আন্‌-ইয়াশ্‌ফিয়াকা” (আমি মহান আল্লাহ্‌, মহাআরশের প্রতিপালকের নিকট তার আরোগ্য প্রার্থনা করছি) তাহলে আল্লাহ্‌ তাআলা তাকে আরোগ্য দান করেন”। [আবুদাউদ ও তিরমিযি]

 

সহমর্মিতার আদব

মৃতের পরিবারকে শান্তনা প্রদান, তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণা লাঘব করার নাম সহমর্মিতা। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলছেন : “যে মু’মিন ব্যক্তিই বিপদের সময় তার ভাইকে সহমর্মিতা জানাবে আল্লাহ্‌ তাআলা কিয়ামতদিবসে তাকে সম্মানের অলংকারে আবৃত করবেন”। [ইবেন মাজাহ্‌]

 

মৃতের পরিবারের জন্য দুআ করা এবং তাদেরকে ধৈর্যধারণের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা উচিত। আর এটা ভাবা উচিত যে, বিপদের সময় এমন করলে তারা আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট এর প্রতিফল ও পুরস্কার পাবে। উসমান বিন যায়দ (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “আমরা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট ছিলাম। এমন সময় তাঁর কোনো কন্যার পক্ষ হতে একটি বার্তা এলো যে, সে তাঁকে ডাকছে এবং তাঁর এক সন্তান মরণমুখী। তিনি বার্তাবাহককে বললেন : তার কাছে ফিরে গিয়ে বলো যে, আল্লাহ্‌ তাআলা যা ফিরিয়ে নিয়েছেন তা তাঁরই ছিল, তিনি যাকিছু দিয়েছেন তাও তাঁর এবং আল্লাহ্‌র প্রতিটি জিনিস একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসে। তাকে বলো ধৈর্যধারণ করতে এবং আল্লাহ্‌র নিকট প্রতিদান কামনা করতে”। বার্তাবাহক রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন : “সে শপথ দিয়ে বলেছে যেন আপনি তার কাছে যান”। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সা’দ ইবনে উবাদাহ্‌ এবং মুআয ইবনে জাবালকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমি তাঁদের সঙ্গ নিলাম। ওখানে পৌঁছে তিনি যুবক ছেলেকে তুলে ধরলেন এবং তার আত্মা তার দেহ হতে বিদায় নিচ্ছিল (তার নড়াচড়ায় তা বোঝা যাচ্ছিল) যেমন কোনো খালি পাত্রে (পানি বা কিছু ঢাললে বোঝা যায়)। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের চোখদুটি অশ্রুপ্লাবিত ছিল। সা’দ বললেন : “এটা কী ? হে আল্লাহ্‌র রসূল !" তিনি উত্তর দিলেন : “এটা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ যা তিনি স্বীয় বান্দাদের হৃদয়ে প্রবিষ্ট করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল ওই সমস্ত লোকের উপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন যারা অন্যদের উপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করে”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

মৃতের জন্য আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করা উচিত। ইমাম শাফিয়ী মৃতের পরিবারের জন্য এই দুআটি পছন্দ করতেন : “আল্লাহ্‌ তাআলা যেন তোমাদেরকে মহাপুরস্কার দান করেন, তোমাদেরকে ধৈর্যধারণের ক্ষমতা দেন এবং তোমাদের মৃত আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষমা করেন”।

 

মৃতের পরিবারের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করা বাঞ্ছনীয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “জা’ফারের পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করো, কারণ তাদের সঙ্গে এমনই ঘটনা ঘটেছে যা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে”। [আবুদাউদ ও তিরমিযি]

 

ঘুমানোর আদব

যখন কেউ ঘুমোতে চাই তখন তার জন্য আল্লাহ্‌ তাআলার নাম নিয়ে ডান পার্শ্বভরে শোয়া বাঞ্ছনীয়। তাকে এও নিশ্চিত হওয়া উচিত যে, তার ক্ষতি করতে পারে এমন কিছু সেখানে নেই। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যখন তোমাদের কেউ বিছানায় গমন করার ইচ্ছা করবে তখন সে যেন তার আবরণের এক প্রান্ত দ্বারা বিছানাটি ঝেড়ে ফেলে এবং আল্লাহ্‌র নাম নেয়। কেননা সে জানে না বিছানা ছাড়ার পর তাতে কী ঢুকে পড়েছে। সে যদি শুতে চাই তাহলে ডান কাতে শোবে এবং এই দুআটি পাঠ করবে : “سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبِّى بِكَ وَضَعْتُ جَنْبِى وَبِكَ أَرْفَعُهُ إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِى فَاغْفِرْ لَهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ” (হে আল্লাহ্‌ ! তুমি মহাপবিত্র। হে আমার প্রভু ! আমি তোমার নাম নিয়ে শুলাম এবং তোমার নাম নিয়েই জাগ্রত হব। যদি তুমি আমার প্রাণ হরণ করে নাও তাহলে তার প্রতি কৃপা করো আর যদি তা ফিরিয়ে দাও তাহলে তা রক্ষা করো যেমন তুমি রক্ষা করে থাকো তোমার সত্যনিষ্ঠ বান্দাদেরকে)”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পররসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শেখানো দুআটি পাঠ করা উচিত। হুযাইফা (রাঃ) বর্ণনা করছেন : “রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন ঘুমোতে যেতেন তখন তিনি পড়তেন : “বিসমিকা আমুতু ওয়া আহ্‌ইয়া” (আমি তোমার নামের সাথেই মরি এবং জীবিত হই)।

 

ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরতিনি বলতেন : “الحمد لله الذي أحيانا بعد ما أماتنا وإليه النشور( সকল প্রশংসাওইআল্লাহর জন্য যিনি আমাকে মৃত্যু দেয়ার পর জীবিত করে দিয়েছেন এবং তার কাছেই ফিরে যাব)

 

একান্ত প্রয়োজন ছাড়া দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া বাঞ্ছনীয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার স্বালাতেরপূর্বে ঘুমানো এবং স্বালাতেরপর অহেতুক গল্প-গুজব করাকে খুব অপছন্দ করতেন।[বুখারি ও মুসলিম]

 

উপুড় হয়ে ঘুমানো মাকরূহ(অপছন্দনীয়)। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করছেন,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএকটি লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল। তিনি তাকে জোরে লাথি মারলেন। তিনি তাকে বললেন : এটি এমন শয়ন, যাকে আল্লাহ তাআলা  খুব অপছন্দ করেন”। [তিরমিযি]

 

ঘুমানর পূর্বে ওই সমস্ত বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে যা তার ঘুমের অবস্থায় ক্ষতি করতে পারে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেছেন : “নিশ্চয়ই আগুন তোমার শত্রু, তাই ঘুমাতে যাওয়ার সময় তা নিভিয়ে দাও”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

স্ত্রী-সহবাসের আদব

স্ত্রীর সঙ্গে যৌনকার্য সম্পাদনের পূর্বে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো পথে আল্লাহ্‌ তাআলার নাম নেয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেন : “স্ত্রীর সাথে যৌনসঙ্গমের সময় যদি নিম্নোক্ত দুআটি পাঠ করে তবে আল্লাহ্‌ তাআলা তাকে সুসন্তান দান করেন এবং শয়তান তার কোনো অনিষ্ট করতে পারে না। দুআটি হলো : “بِسْمِ اَللَّهِ . اَللَّهُمَّ جَنِّبْنَا اَلشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا” (আমি আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে শুরু করছি। হে আল্লাহ্‌ ! আমাদের নিকট হতে শয়তানকে দূরে রেখো এবং আমাদেরকে যে সন্তান দান করবে তার নিকট হতেও শয়তানকে দূরে রেখো”। [বুখারি]

 

স্বীয় পত্নীর সাথে খেলাধুলা করা বাঞ্ছনীয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবির (রাঃ)-কে বললেন : “জাবির ! তুমি কি বিবাহ করেছ ?” আমি উত্তর দিলাম : “হ্যাঁ”। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : “কুমারীকে নাকি অকুমারী নারীকে ?” জাবির উত্তর দিলেন : “অকুমারী নারীকে”। তিনি বললেন : “কুমারীকে কেন বিবাহ করলে না ? তুমি তার সঙ্গে খেলাধুলা করতে, তাকে হাসাতে আর সেও তোমাকে হাসাত”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

আয়েশা (রাঃ) বলছেন : “রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম অবস্থায় আমাকে চুম্বন দিতেন”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে যে কোনোভাবে উপভোগ করতে পারে, তবে সেই শর্তটি মনে রাখতে হবে যেটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমার (রাঃ)-কে বলেছিলেন। বর্ণিত আছে, উমার (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন : “হে আল্লাহ্‌র রসূল ! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি”। তিনি বললেন : “কী জিনিস তোমাকে ধ্বংস করে দিল ?” তিনি উত্তর দিলেন : “রাত্রে আমি আমার স্ত্রীর অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেছি”। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কিছুই উত্তর দিলেন না। উমার বলছেন : তারপর “রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো : (তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের ক্ষেতস্বরূপ, সুতরাং তোমাদের ক্ষেতে যখন ইচ্ছা যেমনভাবে ইচ্ছা গমন করো।) [কুরআন ২:২২৩] “তোমরা তাদের নিকট সামনের দিক থেকে যাও অথবা পিছন দিক থেকে যাও, কিন্তু পায়ুপথ এবং ঋতুর অবস্থা থেকে বিরত থেকো”। [তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ্‌]

 

স্ত্রীর যৌনাকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সঙ্গম ত্যাগ করা অবাঞ্ছিত। আর তাদের মধ্যে যা কিছু ঘটে তা গোপন রাখা বাঞ্ছনীয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “কিয়ামতদিবসে ওই সমস্ত লোকের অবস্থা নিকৃষ্টতম হবে যারা স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে অতঃপর তার গোপনীয় বিষয়গুলি প্রকাশ করে দেয়”। [মুসলিম]

 

ভ্রমণের আদব

ভ্রমণ শুরু করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য একান্তভাবে জরুরি তার নিকট সমস্ত গচ্ছিত সম্পদ তার মালিককে ফিরিয়ে দেয়া, ঋণ থাকলে সেটা পরিশোধ করা এবং তার পরিবারকে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দের মধ্যে রেখে প্রস্থান করা। যদি কখনও কারো কিছু অন্যায়ভাবে নিয়ে থাকে তাহলে সেটাও তার প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেয়া তার জন্য আবশ্যিক। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে কারো নিকট এমন কিছু আছে যা সে তার ভাইয়ের নিকট হতে অন্যায়ভাবে নিয়েছিল তাহলে তার উচিত তা হতে মুক্তি লাভ করা। কারণ প্রত্যেকটি স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রৌপমুদ্রার পরিবর্তে তার সৎকর্মগুলি নিয়ে তার ভাইকে দেয়া হবে; আর যদি সৎকর্ম অবশিষ্ট না থাকে তাহলে তার ভাইয়ের নিকট হতে পাপগুলি নিয়ে তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে”।[বুখারি]

 

একা ভ্রমণ করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়), তবে একান্ত প্রয়োজনে সঙ্গে কাউকে না পাওয়া গেলে তার কথা ভিন্ন। জনৈক ব্যক্তি ভ্রমণ থেকে এসেছে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন : “তোমার সঙ্গে কে ছিল ?” সে উত্তর দিল : “আমার সঙ্গে কেউ ছিল না”। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “একা সফরকারী একজন শয়তান, দুইজন সফরকারী শয়তান, আর তিনজন হলে তারা ভ্রমণকারী একটি দল”। [হাকিম]

 

সৎ সঙ্গী বাছাই করা উচিত। তাদের মধ্যে একজন নেতা থাকা খুব জরুরি। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যদি তিনজন লোক ভ্রমণে বেরোয় তাহলে তাদের মধ্যে একজনকে যেন নেতা তৈরি করা হয়”। [আবুদাউদ]

 

ভ্রমণ থেকে ফিরার পূর্বে ফিরার সম্ভাব্য তারিখ স্বীয় পত্নীকে জানানো উচিত। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এরূপ বলতেন এবং রাত্রে তাঁদের নিকট পৌঁছতেন। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি দীর্ঘ দিন ধরে বাড়িতে না থাকে তাহলে ফিরার দিন সে যেন রাত্রে তার স্ত্রীর কাছে এসে প্রবেশ না করে”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

সফরে বেরোবার সময় স্বীয় বন্ধু এবং পরিবারকে বিদায়-সম্ভাষণ জানানো উচিত। সফরের কাজ শেষ হয়ে গেলে পরিবারের কাছে ফিরতে দেরী করা আদৌ উচিত নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “সফর শাস্তির একটা অংশ, কেননা তাতে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পানাহার করতে ও ঘুমোতে পারে না। যদি তোমাদের কারো সফরের কাজ শেষ হয়ে যায় তাহলে সে যেন পরিবারের কাছে দ্রুত ফিরে আসে”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

জনগণের সম্পদ ব্যবহারের আদব

কিছু বিশেষ আদব রয়েছে জনতার সম্পদ ব্যবহার করার সময় সেগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা অতি জরুরি। পথ অতিক্রম করার সময় একজন মানুষের কী করা উচিত সে কথা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন : “পথে বসার বিষয়ে তোমরা সতর্ক থেকো”। তাঁরা বললেন : “হে রসূলুল্লাহ্‌ ! একসাথে বসে আলাপচারিতার আর কোনো জায়গা আমাদের নেই”। অতঃপর তিনি উত্তর দিলেন : “যদি তোমাদের বসতেই হয় তাহলে পথকে তার অধিকার দাও”। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন : “কিন্তু পথের অধিকার কী ?” তিনি (সাঃ) উত্তর দিলেন : “চাহনি অবনমিত রাখা (বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ না করা), অন্যদের ক্ষতি সাধন না করা, সালামের জবাব দেয়া এবং সৎকর্মের নির্দেশ ও অসৎকর্ম হতে নিষেধ করা”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেছেন : “তোমরা তাদের প্রয়োজনে সাহায্য করবে এবং পথভ্রষ্টদের পথ প্রদর্শন করবে”। [আবুদাউদ]

 

প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত রাস্তার যত্ন নেয়া এবং জনতার সম্পত্তির ক্ষতি না করা। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “দুটি জিনিসকে ভয় করো যার জন্য মানুষ অন্যদেরকে অভিশাপ দেয়”। সাহাবাবর্গ জিজ্ঞাসা করলেন : “হে আল্লাহ্‌র রসূল ! সেই দুটি জিনিস কী যার জন্য মানুষ অন্যদেরকে অভিশাপ দেবে?” তিনি উত্তর দিলেন : “ওই সমস্ত জায়গায় পেশাব-পায়খানা করা যেখানে মানুষ বসে আলাপচারিতা করে অথবা ছায়া গ্রহণ করে”। [মুসলিম]

 

এমন কিছু নিয়ে যাওয়া উচিত নয় যা মানুষের জন্য অনিষ্টকর হতে পারে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ হাতে তির নিয়ে আমাদের মসজিদ বা বাজার দিয়ে অতিক্রম করবে তখন সে যেন তিরটি কোষের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয় (অথবা তিনি বললেন : সেটাকে হাত দিয়ে শক্তভাবে যেন ধরে রাখে) যাতে করে কোনো মুসলমান তাদ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

ব্যবসা-বানিজ্যের আদব

সাধারণভাবে ব্যবসা ইসলামের দৃষ্টিতে আইনসিদ্ধ ও অনুমোদিত, কারণ এটা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পণ্যসামগ্রীর আদানপ্রদান। কিন্তু যখনই দুই পক্ষের মধ্যে কারো ক্ষতি হয় তখন সেই ব্যবসা আইনবিরোধী ও অবৈধ বলে গণ্য হয়। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : (হে মু’মিনগ্ণ ! তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পত্তি গ্রাস করো না।)[কুরআন ৪:২৯]

 

ইসলাম ব্যবসার উপার্জনকে জীবিকার সর্বোত্তম ও পভিত্রতম মাধ্যম বলে অভিহিত করেছে। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয় : সর্বোত্তম ও পবিত্রতম উপার্জন কী ? তিনি উত্তর দেন : “স্বহস্তে উপার্জন (অর্থাৎ কায়িক শ্রম) এবং সত্য ও আন্তরিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেক ব্যবসা”। [আহ্‌মাদ]  

 

পণ্যে কোনো ত্রুটি থাকলে তা পরিষ্কারভাবে বলে দেয়া উচিত যদিও তা আপাতদৃষ্টিতে বোঝা না যায়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “কোনো পণ্যের মধ্যে ত্রুটি থাকলে সেটা বিক্রয় করা কারো জন্য বৈধ নয় তবে বিক্রেতা যদি সেটা পরিষ্কার বলে দেয় আর যেই তা জানবে তার জন্য তা স্পষ্ট করে দেয়া জরুরি”। [আহ্‌মাদ]

 

কাউকে ঠকানো উচিত নয়। আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একটি খাদ্যস্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি তার মধ্যে নিজের হাত ঢুকিয়ে অনুভব করলেন তাঁর আঙ্গুলগুলি যেন ভেজা। তিনি বললেন : “এই খাদ্য-বিক্রেতা ! এটা কী ?” সে উত্তর দিল : এটা বৃষ্টিইর জলে পড়ে গিয়েছিল, হে আল্লাহ্‌র রসূল !” তিনি বললেন : “তুমি কি এটা খাদ্যস্তুপের উপরে রাখতে পারনি যাতে মানুষ দেখতে পেত ? যে কেউ মানুষকে ঠকাবে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়”। [মুসলিম]

 

ব্যবসায় সত্যের আশ্রয় নেয়া উচিত, মিথ্যার নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “দুই পক্ষেরই এখতিয়ার থাকে (ব্যবসা বাতিল করার) যতক্ষণ না তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যদি তারা উভয়ই সত্য বলে এবং সবকিছু স্পষ্ট করে দেয় তাহলে তাদের ব্যবসায় বরকত অবতীর্ণ হয়। কিন্তু যদি তারা কিছু লুকোয় এবং মিথ্যা বলে তাহলে তাদের ব্যবসার বরকত ধ্বংস হয়ে যায়”। [বুখারি ও মুসলিম]

 

ক্রয়-বিক্রয়ের সময় প্রত্যেককে স্বচ্ছ হওয়া উচিত, কেননা এটা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং বলিষ্ঠ করার উপায়। বস্তুবাদের মোহ থেকে দূরে থাকা উচিত যা মানুষ এবং ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “আল্লাহ্‌ ওই ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করুন যে ক্রয়-বিক্রয় এবং ঋণশোধ কামনার সময় স্বচ্ছ ও শান্তিপ্রিয় থাকে”। [বুখারি]

 

ব্যবসায়ীর জন্য শপথবাক্য উচ্চারণ করা বাঞ্ছনীয় নয়। রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “ব্যবসার সময় বেশিবেশি শপথ করা থেকে বিরত থেকো, কারণ (যদি সে মিথ্যা শপথ করে) বিক্রেতা বিক্রি করবে কিন্তু এর কল্যাণ বিনষ্ট হয়ে যাবে”। [মুসলিম]

 

বেশ কিছু আদব ও শিষ্টাচার ইসলাম বর্ণনা করেছে। যেহেতু প্রবন্ধটি সংক্ষিপ্ত তাই অনেক কিছুই আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারছি না। তাহলে এটা এ কথা বোঝার জন্য যথেষ্ট যে, জীবনে এমন কিছু নেই যার বিবরণ কুরআন বা রসূলুল্লাহ্‌র হাদিসে নেই। এজন্যই একজন মুসলমানের সারাটি জীবন ইবাদত এবং সৎকর্ম বৃদ্ধির উপায়।

 

আরও দেখুন

স্নানাগারের আদব; অভিবাদনের আদব; রোগী পরিদর্শনের আদব; খাওয়ার আদব; নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম;

 

তথ্যসূত্র

http://www.islamland.com/EN/Contents.aspx?AID=97

378 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page