ইসলামি শারি’আহ্ (শরিয়ত) বা ইসলামি আইন


শারি’আহ্‌ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পথ বা রাস্তা বা ঐশ্বরিক আইন, নিয়মাবলি, শিক্ষা ও কার্যপ্রণালি। এর উদ্দেশ্য ব্যক্তি ও সমাজকে উপকৃত করা। বর্তমানে শারি’আহ্‌ পরিভাষাটি সাধারণত ইসলামি আইনের অর্থেই ব্যবহৃত হয়। আজ যখন কোনো মুসলমান বলে যে, আমি আমার সমস্ত ইচ্ছা আল্লাহ্‌ তাআলার ইচ্ছার সামনে সমর্পণ করেছি তখন তার অর্থ হয় যে, সে ইসলাম ধর্মের বাস্তবে অনুসরণ করেছে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা বলতে বোঝানো হয় ইসলামি শারি’আহ বা ইসলামি আইন, যা আল্লাহ্‌ তাআলা সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং শারি’আহ্‌ সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহ্‌র মনোনীত পথ। পার্থিব জীবনে ও পরকালে প্রকৃত সাফল্য অর্জনের জন্য এর অনুসরণ অত্যাবশ্যক। 

 

বিষয়সূচি

 

আভিধানিক অর্থ

শারি’আহ্‌ শব্দটির আভিধানিক অর্থ জলপথ যা একটি মূল স্রোতধারা, একটি পানের জায়গা ও সঠিক পথের দিকে যায়। একটি সাদৃশ্য বর্ণনা করা যেতে পারে, যেমন পানি জীবনের একটি অপরিহার্য উপাদান, অনুরূপ একজন মুসলমানের কল্যাণের জন্য শরিয়ত অপরিহার্য। শরিয়ত শব্দটি এমন একটি পথকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় যা একটি অভিপ্রেত স্থান বা অভীষ্ট লক্ষের অভিমুখে যায়। একই অর্থ প্রকাশ করার জন্য ব্যাপকহারে ইসলাম ও দ্বিন শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়। [১]

 

ফিক্‌হের কুয়াইতি ইন্সাইক্লোপিডিয়া-তে শরিয়তের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে : এটা একটা জলস্রোত। যেহেতু এটা পরিষ্কার ও স্পষ্ট, তাই এই নাম দেওয়া হয়েছে। আর ‘শার্‌উন’ শব্দটি ‘শারা’আ’ ক্রিয়ার ভাববিশেষ্য (মাস্‌দার) যার অর্থ পরিষ্কার ও স্পষ্ট হওয়া। এর বহুবচন ‘শারা-ই’। এই শব্দটি ব্যাপকভাবে ধর্ম ও তার বিধিবিধানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। [২]

 

ইসলামি অর্থ

ইসলামিশরিয়ত হলো ধর্মীয় আইন বা শিক্ষা যার বিবরণ আল্লাহ্‌ তাআলা স্বীয় বান্দাদের জন্য দিয়েছেন। যা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও সুন্নাতের মধ্যে ইসলামি বিধিবিধান হিসেবে নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ্‌ তাআলার একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন, সৎকর্মের আদেশ ও অসৎকর্ম হতে নিষেধ এবং সমস্ত অপরিহার্য ধর্মীয় কার্যক্রম সম্পাদন শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত।  

  

শরিয়তের উৎস

শরিয়তের মূল উৎস আল্লাহ্‌ তাআলার মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। কুরআনের পর মহানবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ্‌। সুন্নাহ্‌র মধ্যে রয়েছে মহানবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথা, কর্ম ও মৌনসমর্থন। সুন্নাহ্‌ বেশিরভাগই হাদিসের গ্রন্থসমূহে সংরক্ষিত রয়েছে। [৩]

 

কুরআন

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন : “এরপর (হে মুহাম্মাদ !) আমি তোমাকেরেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শরিয়তের উপর। অতএব, তুমিএর অনুসরণ করোএবং অজ্ঞানদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করোনা”।[সূরা জাসিয়া ৪৫:১৮]   

 

আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন : “আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি”। [সূরা মায়িদা ৫:৪৮]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন : “তিনি তোমাদের জন্যে দ্বিনেরক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেনযার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে,যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি তোমারপ্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম,মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে,তোমরা দ্বিনপ্রতিষ্ঠিত করোএবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। তুমিমুশরিকদেরকে যে বিষয়ের প্রতি আমন্ত্রণ জানাও,তা তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়তাকে পথ প্রদর্শন করেন”। [সূরা শূরা ৪২:১৩] [৪]

 

বিভিন্ন নবির শরিয়ত

নবিদের সমস্ত শরিয়তের মধ্যে যে বিষয়গুলি সমানভাবে বিদ্যমান সেগুলো হলো : আল্লাহ্‌ তাআলার ইকত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন, সালাত প্রতিষ্ঠা, যাকাত প্রদান, সিয়াম পালন; অনুরূপ আল্লাহ্‌র নৈকট্যলাভের জন্য চেষ্টাসাধনা, অর্থাৎ সৎকর্ম সম্পাদন, ন্যায়পরায়ণতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন হওয়া, আত্মীয়তার সম্বন্ধ অক্ষুণ্ন রাখা। শরিয়তের মধ্যে আরও রয়েছে অবিশ্বাস, খুন, ব্যভিচার এবং মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য অনিষ্টকর বিষয়াদির প্রতি নিষেধাজ্ঞা। শরিয়ত মানুষকে এও শিক্ষা দেয় যে, সর্বপ্রকার হীন ও নীচ কার্যকলাপ এবং তাদের সম্মান ও সম্ভ্রম ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন সবকিছু বর্জন করতে হবে। উপরের সমস্ত শিক্ষা বিভিন্ন নবির শরিয়তে সমানহারে বিদ্যমান ছিল।

 

মহানবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আগমনের পর ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম বা শরিয়ত আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র নিকট ধর্ম হলো ইসলাম”। [সূরা আল-ইমরান ৩:১৯]আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন : “যে ব্যক্তিইসলাম ছাড়া অন্য কোনোধর্ম সন্ধানকরে,  কখনওতা গ্রহণ করা হবে না এবং পরকালেসে ক্ষতিগ্রস্তহবে”। [সূরা আল-ইমরান ৩: ৮৫]

 

শরিয়তের লক্ষ

  • আল্লাহ্‌ তাআলার একত্ববাদে বিশ্বাস
  • ন্যায় প্রতিষ্ঠা
  • ব্যক্তি শিক্ষা
  • সর্বত্র নৈতিকতার প্রসার
  • ব্যক্তি ও সমাজে কষ্টের রোধ
  • অন্যায়ের প্রতিরোধ

 

ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিক্‌হ)

শরিয়তের পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিক্‌হ নামে পরিচিত। ফিক্‌হ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ “গভীর বোধ” বা “পূর্ণ জ্ঞান”। এদ্বারা কুরআন ও মহানবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাতের ভিত্তিতে ইসলামি আইনের সংকলনকে বোঝানো হয়। শরিয়তের আইন সুনির্ধারিত, তবে ইসলামি আইনশাস্ত্রে কিছু পাণ্ডিত্বপূর্ণ মতভেদ বিদ্যমান। [৫]

 

মানবকর্মের শ্রেণিবিভাগ

ইসলামি আইন মানবকর্মকে পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে, সেগুলো নিম্নরূপ :

১। ফরজ বা ওয়াজিব (অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক) – এগুলো সম্পাদন করলে সওয়াব আছে এবং পরিত্যাগ করলে শাস্তি।

২। মুস্তাহাব (উত্তম বা সুন্নাত) – সম্পাদন করলে সওয়াব আছে কিন্তু পরিত্যাগ করলে কোনো শাস্তি নেই।

৩। মুবাহ্‌ (অনুমোদিত)- অনুমোদিত কার্যসমূহ, ওগুলো করলে সওয়াব নেই এবং না করলে পাপ নেই।

৪। মাক্‌রুহ্‌ (অপছন্দনীয়) – যা করা অনুচিত, কিন্তু করে ফেললে কোনো শাস্তি নেই।

৫। হারাম (নিষিদ্ধ) - ইসলামি আইনানুসারে শাস্তিযোগ্য কর্মসমূহ।

 

উপসংহার

মানবজীবন সুসংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন নিয়ম-বিধি, আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও মূল্যবোধের সমষ্টির নাম শরিয়ত। একজন মানুষের সর্বোত্তম জীবনবিধান বর্ণনা করে দিয়েছেন স্বয়ং আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ্‌ তাআলা, শিক্ষা দিয়েছেন মহানবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং কর্মের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন নবির সাহাবাবর্গ। [৬]

 

তথ্যসূত্র

[১] http://theislamiclaw.wordpress.com/

[২] http://www.islamweb.net/emainpage/index.php?page=showfatwa&Option=FatwaId&Id=87506

[৩] http://suite101.com/article/what-is-shariah-a71667

[৪] http://www.islamweb.net/emainpage/index.php?page=showfatwa&Option=FatwaId&Id=87506

[৫] http://theislamiclaw.wordpress.com/

[৬] http://theislamiclaw.wordpress.com/2007/05/26/the-abcs-of-islamic-law/

411 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page