ইসলামি নীতিমালা


ইসলামি নীতিমালা হলো ঈমান ও নিয়মাবলির সমষ্টি, যেগুলো স্বয়ং মহান স্রষ্টা বিন্যস্ত করেছেন। এই নীতিমালা কোনো দল বা এলাকা বা ক্ষেত্র বা উপজাতির জন্য বিশিষ্ট নয়; বরং এগুলো পাঠানো হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। ইসলাম একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ এমন শান্তি যা অর্জিত হয় আল্লাহ্‌ তাআলার ইচ্ছার সামনে নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করার মাধ্যমে। অতএব আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হলো সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মা্ধ্যমে সমগ্র মানবজাতির নিকট পাঠানো ইসলামি নীতিমালা। ইসলাম এজন্য অনন্য যে, এই নীতিমালা সুবিন্যস্ত করেছেন স্বয়ং মহান স্রষ্টা আল্লাহ্‌ তাআলা এবং সমগ্র নীতিমালা সেই স্বভাবধর্মের সঙ্গে সুসামঞ্জস্য যার উপর মানুষের সৃষ্টি।  

 

বিষয়সূচি

 

আল্লাহ্‌র একত্ব

তিনি একের মধ্যে দুই বা তিনজন নন। অর্থাৎ ইসলাম ত্রয়ীর নীতিকে প্রত্যাখ্যান করে অথবা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে ইশ্বরের এমন একত্বকে, যা পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে যে, একের মধ্যে একাধিক ইশ্বর বিদ্যমান। আল্লাহ্‌ তাআলা কুর্‌আনে বলছেন : “তিনি এক ও অদ্বিতীয়”। [সূরা ইখলাস ১১২:১]

 

মানবজাতির একত্ব

আল্লাহ্‌ তাআলার আইনে মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সমান। এক জাতির উপর অন্য জাতির কোনো প্রাধান্য নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে জাতি, বর্ণ, ভাষা ও বিশ্বাসের দিক থেকে ভিন্ন করেছেন যাতে তিনি পরীক্ষা করে নেন যে, কে অন্যদের তুলনায় অধিক ভালো কর্ম সম্পাদন করে। কেউ এ দাবি করতে পারে না যে, সে অন্যদের থেকে উত্তম। কেবল আল্লাহ্‌ তাআলাই জানেন কে উত্তম। আর এটা নির্ভর করে আল্লাহ্‌ভীতি ও নেককারিতার উপর। [সূরা হুজ্‌রাত ৪৯:১৩]  

 

নবিগণ ও বাণীর একত্ব

আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্‌ তাআলা মানব-ইতিহাসে বিভিন্ন নবি প্রেরণ করেছেন। সকলেই আগমন করেছিলেন একই বাণী ও শিক্ষা নিয়ে। মানুষই তাদেরকে ভুল বুঝেছে এবং তাদের ভুল ব্যাখ্যা করেছে। [সূরা আন্বিয়া ২১:২৫]

 

আমরা মুসলামানরা বিশ্বাস করি নবি নূহ, ইব্রাহিম, ইসহাক, ইসমাইল, ইয়াকুব, মুসা, দাউদ, ইসা ও মুহাম্মাদকে (সকলের প্রতি শান্তির ধারা বর্ষিত হোক)। খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের নবিগণও ছিলেন প্রকৃতপক্ষে ইসলামের নবি।

 

ফেরেশ্তা ও বিচারদিবস

আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি যে, ফেরেশ্তার ন্যায় কিছু অদৃশ্য সৃষ্টি রয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলা বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশ্বে সৃষ্টি করেছেন।

 

আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি যে, একটি বিচারদিবস রয়েছে। সেদিন পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত পূর্ণ মানব-ইতিহাসের বিশ্বের সমস্ত মানুষকে হিসাব-নিকাশ, পুরস্কার ও শাস্তির জন্য একত্রিত করা হবে।[সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮]  

 

জন্মকালে মানুষের নিষ্কলুশতা

আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি যে, মানুষ নিষ্পাপ হয়ে জন্মলাভ করে। বয়ঃসন্ধিতে উপনীত হওয়ার পর যদি তারা কোনো পাপ করে তাহলে তাদেরকে তাদের অপরাধের জন্য পাকড়াও করা হবে। কেউ কারো পাপের জন্য দায়ী হবে না, বা কারো পাপের দায় নিজের কাঁধে নেবে না। কিন্তু প্রকৃত অনুশোচনাকারীর জন্য ক্ষমার দ্বার সর্বদা উম্মুক্ত রয়েছে।

 

রাষ্ট্র ও ধর্ম

আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি যে, ইসলাম জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশিকা। এটা জীবনের সর্বপ্রান্তকে বেষ্টন করে আছে। অনুরূপ ইসলামের শিক্ষা ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে না। এ এক নির্ঘাত সত্য যে, ইসলামি শিক্ষার দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও ধর্ম উভয়ই আল্লাহ্‌ তাআলার আনুগত্যের মধ্যে থাকবে। সুতরাং আর্থ-সামাজিক লেনদেন, অনুরূপ শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক নিয়মাবলিও ইসলামের শিক্ষার অন্তর্গত।

 

ইসলামের স্তম্ভসমূহ

মুসলমানরা যা বিশ্বাস করে, আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে তা বাস্তবে রূপায়িত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ; সেগুলি হলো :

ক) সাক্ষ্যবাণী (শাহাদাহ্‌)

প্রকৃত উপাস্য কেবল একজন এবং নবি মুহাম্মদ সেই উপাস্যের দূত, এই মৌখিক স্বীকারোক্তি ও শপথবাক্যকে ইসলামের সাক্ষ্যবাণী বা শাহাদাহ্‌ বলা হয়।

 

খ) স্বালাত

প্রত্যেক নর-নারী মুসলমানের জন্য বয়ঃসন্ধিতে উপনীত হওয়ার পর প্রত্যহ দিবারাত্রে পাঁচ ওয়াক্তের স্বালাত প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

 

গ) যাকাত

এটা হলো মুসলমানদের অর্থ হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বার্ষিক আদায়। এটা নির্ভর করে নির্ধারিত শর্তগুলির উপর। অতঃপর সেই অর্থ বন্টন করা হয় দরিদ্র অথবা অন্যান্য প্রকৃত দানগ্রাহীদের মধ্যে।

 

ঘ) সওম (রোযা)

সওম হলো রমযান মাসে ভোর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাবার, পানীয় ও যৌনকার্য হতে সম্পূর্ণ নিবৃত্ত থাকার নাম।

 

ঙ) হজ্জ

জীবনে একবার মক্কার হজ্জব্রত পালন কাম্য, যদি সমস্ত উপকরণ উপলব্ধ হয়। হজ্জ হলো নবি ইব্রাহিম, তাঁর পত্নী হাজেরা এবং তাঁর বড়ো সন্তান নবি ইসমাইলের (তাঁদের সকলের প্রতি শান্তি অবতীর্ণ হোক) পরীক্ষা ও দুরবস্থার একটি স্মারক।

 

ঈমানের স্তম্ভসমূহ

ইসলামে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ রয়েছে। সেগুলি হলো :  আল্লাহ্‌, তাঁর ফেরেশ্তাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর নবি-রসূলগণ, কিয়ামতদিবস এবং পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান।

 

ক) আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, শুধুমাত্র একজনই রয়েছন অনন্য উপাস্য, কেবল তাঁরই ইবাদত ও আনুগত্য বাঞ্ছনীয়।

 

খ) ফেরেশ্তাগণের প্রতি ঈমান

মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা ফেরেশ্তাগণের মতো কিছু অদৃশ্য জীব সৃষ্টি করেছেন। মুসলমানরা তাদের অস্তিত্ব, তাদের নাম, তাদের দায়িত্বভার এবং কুর্‌আন ও সুন্নাতের ব্যাখ্যানুযায়ী তাদের বিবরণের প্রতি বিশ্বাস করে।

 

গ) আল্লাহ্‌র গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান

মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা মাঝেমধ্যে মানবসম্প্রদায়ের নিকট গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। এই গ্রন্থগুলির উৎপত্তি একই ঐশী উৎস হতে। সবগুলোই ঐশী প্রত্যাদেশ। অবতরণের সময় এই গ্রন্থগুলির যে প্রকৃত রূপ ছিল, তার প্রতি মুসলমানরা বিশ্বাস রাখে। চারটি বিশিষ্ট ঐশী গ্রন্থ হলো : ১) যাবুর, এটা অবতীর্ণ হয়েছিল নবি দাউদের উপর; ২) তাওরাত, এটা অবতীর্ণ হয়েছিল নবি মুসার উপর; ৩) ইন্‌জিল, এটা অবতীর্ণ হয়েছিল নবি ইসার উপর, ৪) কুরআন, এটা অবতীর্ণ হয়েছিল নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লামের উপর।

 

ঘ) আল্লাহর নবিগণের প্রতি ঈমান

মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা সমগ্র মানবসম্প্রদায়ের নিকট তাদের পথপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নবিগণকে দূতস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন। মুসলামনরা বিশ্বাস রাখে তাঁদের অস্তিত্ব, তাঁদের নাম এবং তাঁদের বাণীর প্রতি, যেরূপ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল তাঁদের সম্পর্কে তত্ত্ব দিয়েছেন। নবিগণ উপাস্য নন, কেননা উপাসনা কেবলমাত্র মহাক্ষমতাধর আল্লাহ্‌র জন্য।

 

ঙ) কিয়ামতদিবসের প্রতি ঈমান

মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, এই পার্থিব জীবন তথা এর যথাসর্বস্ব একটি নির্ধারিত দিনে নিঃশেষ হবে, যেদিন প্রতিটি জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ্‌ তাআলা প্রত্যেক ব্যক্তির তার পার্থিব জীবনে ভালো বা মন্দ কৃতকর্ম অনুযায়ী পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে বিচার করবেন। প্রত্যেক ব্যক্তি তার অধিকার পাবে। যারা সৎপথে জীবন যাপন করবে এবং সৎকর্ম করবে আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে জান্নাত দ্বারা পুরস্কৃত করবেন।

 

চ) ভাগ্যের প্রতি ঈমান

মুসলিমদের বিশ্বাস যে, সমগ্র বিশ্ব আল্লাহ্‌ তাআলার নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনায় পরিচালিত। এই বিশ্বে ছোটো থেকে বড়ো যে ঘটনাই ঘটুক না কেন, তার প্রতি আল্লাহ্‌রই কর্তৃত্ব্ব রয়েছে। কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার প্রতিই মুসলমানদের ভরসা। কিন্তু তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা আন্তরিকতার সাথে যথাসাধ্য কর্মপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এ নয় যে, তারা কর্মহীন হয়ে বসে থাকবে এবং সবকিছুকে নিজের গতিতে চলতে দেবে। এহেন বিশ্বাস একজন মানুষকে এক অসাধারণ আত্মিক নিশ্চয়তা, আস্থা ও মনের প্রশান্তি দান করে, বিশেষ করে দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখে।

 

আরও দেখুন :লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু-র অর্থ; আকিদা ও তাওহিদ; ইসলামের স্তম্ভসমূহ; ঈমানের স্তম্ভসমূহ; জীবনের লক্ষ; শির্‌ক;

 

তথ্যসূত্র

http://islamicbulletin.org/newsletters/issue_24/beliefs.aspx

292 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page