আল্লাহ্‌র নবি ও রসূলগণের প্রতি ঈমান


ইসলামের মধ্যে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি আল্লাহ্‌র নবি ও রসূলদের প্রতি ঈমান। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এই বিশ্বাস করা অপরিহার্য যে, আল্লাহ্‌ তাআলা মানবজাতির মধ্যে উৎকৃষ্ট ব্যক্তিদেরকে তাঁর নবিরূপে মনোনীত করেছিলেন। তাঁদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলা সৃষ্টির নিকট নির্দিষ্ট কিছু সংবিধান দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের জন্য এবং তাঁর দ্বিন ও তাওহিদ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তিনি স্বীয় নবিগণকে মানুষের নিকট তাঁর বাণী পৌঁছাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন তাঁদেরকে প্রেরণ করার পর তারা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ দাঁড় করতে না পারে।

 

তাঁরা ছিলেন আল্লাহ্‌ তাআলার সেই সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদদাতা, যা তাঁদের প্রতি এবং তাঁদের শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া তাঁদেরকে মানুষের নিকট সতর্ককারীস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছিল। তাঁরা মানুষকে আল্লাহ্‌ তাআলার এমন ক্রোধ ও শাস্তির সতর্কবার্তা দেন, যা ওই সমস্ত লোকের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে যারা তাঁদেরকে এবং তাঁদের শিক্ষাকে অস্বীকার করে। 

 

বিষয়সূচি

 

কুর্‌আন

আল্লাহ্‌ তাআল বলছেন : “আর আমি রসূলদেরকে শুধুমাত্র সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করে থাকি; যারা ঈমান নিয়ে আসে এবং নিজের সংশোধন করে নেয়, তাদের জন্য শঙ্কা নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। কিন্তু যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তাদের অবাধ্যতার জন্য শাস্তি তাদের উপর আপতিত হবে”। [সূরা আন্‌আম ৬:৪৮-৪৯]

 

নবি ও রসূলদের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছি, তাদের কারো কারো কথা তোমার নিকট বর্ণনা করেছি আর কারো কারো কথা তোমার নিকট বর্ণনা করেনি”। [সূরা মু’মিন ৪০:৭৮]

 

তাঁদের সকলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য। এ বিশ্বাস করতে হবে যে, তাঁরা মানুষ ছিলেন, তাঁরা কোনো অতিপ্রকৃত সৃষ্টি ছিলেন না। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “আমি তোমার পূর্বে অহিসহ বহু পুরুষই প্রেরণ করেছিলাম। তোমরা যদি না জানো তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা করো। আর আমি তাদেকে এমন দেহবিশিষ্ট করেনি যে, তারা আহার্য গ্রহণ করবে না। আর তারা চিরস্থায়ীও ছিল না”। [সূরা আন্বিয়া ২১:৮]

 

তাঁরা আল্লাহ্‌র বৈশিষ্ট্যসদৃশ কোনো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নন। তাঁরা কারো কোনো উপকার বা ক্ষতি সাধন করতে পারেন না। বিশ্বের উপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী এতে কিছু করতে পারেন না। তাঁরা এমন কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না, যার যোগ্য শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলা। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন : “(হে মুহাম্মাদ !) তুমি বলে দাও, আল্লাহ্‌ যা চান তা ছাড়া আমার নিজের ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতির বিষয়ে আমার কোনো অধিকার নেই। যদি আমি অদৃশ্যের তত্ত্ব ও খবর জানতাম তাহলে আমি অনেক কল্যাণ অর্জন করতে পারতাম এবং অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করতে পারত না”। [সূরা আ’রাফ ৭:১৮৮]

 

যদি কেউ একাংশ নবিকে বিশ্বাস করে আর একাংশ নবিকে অস্বীকার করে তাহলে সে কুফ্‌র করবে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলগণকে অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহ্‌ ও রসূলদের মধ্যে পার্থক্য করতে ইচ্ছা করে এবং বলে যে, আমরা কতিপয়কে বিশ্বাস করি আর কতিপয়কে প্রত্যাখ্যান করি এবং তারা এ মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করতে চাই। তারাই প্রকৃতপক্ষে অবিশ্বাসী আর আমি অবিশ্বাসীদের জন্য অবমাননাকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি”।[সূরা নিসা ৪:১৫০-১৫১]

 

নবি-রসূলগণের নাম

২৫ জন নবির নাম পবিত্র কুর্‌আনে উল্লেখ হয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ :

১। আদম (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২। নূহ (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৩। ইদ্রিস (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৪। হূদ (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৫। স্বালিহ (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৬। ইব্রাহিম (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৭। লূত্ব (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৮। ইস্‌মাইল (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

৯। ইস্‌হাক (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১০। ইয়াকুব (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১১। ইউসুফ (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১২। শুআইব (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৩। আইয়ুব (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৪। মুসা (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৫। হারুন (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৬। যুল্‌ কিফ্‌ল (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৭। দাউদ (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৮। সুলাইমান (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

১৯। ইলয়াস (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২০। আল-ইয়াসয়া (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২১। ইউনুস (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২২। যাকারিয়া (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২৩। ইয়াহ্‌য়া (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২৪। ইসা (আলয়হিস্‌ সালাম),

 

২৫ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।

 

উলুল আয্‌ম

আল্লাহ্‌ তাআলা কতিপয় নবিকে উলুল আয্‌ম (বলিষ্ঠ সংকল্পের অধিকারী) নামে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারে তাঁরা ছিলেন নবিদের মধ্যে বলিষ্ঠতম সংকল্পের অধিকারী। তাঁরা ছিলেন ধৈর্যশীল ও অবিচল। তাঁরা হলেন : নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, ইসা এবং মুহাম্মাদ (তাঁদের প্রতি অসংখ্য শান্তির ধারা অবতীর্ণ হোক!) [দেখুন : সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৭]

 

প্রথম রসূল ছিলেন নূহ (আলয়হিস্‌ সালাম)। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি, যেরূপ আমি প্রত্যাদেশ করেছিলাম নূহ ও তৎপরবর্তী নবিগণের প্রতি”। [সূরা নিসা ৪:১৬৩]

 

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হলেন সর্বশেষ ও চুড়ান্ত রসূল; তাঁর পর কিয়ামত পর্যন্ত কোনো নবি আসবে না। আল্লাহ্‌ সুব্‌হানাহু ওয়া তাআলা বলেন : “মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কারো পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহ্‌র রসূল এবং সর্বশেষ নবি”। [সূরা আহ্‌যাব ৩৩:৪০]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লামের ধর্ম তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্মকে রহিত করে দিয়েছে। এটা পূর্ণাঙ্গ ও সত্যের চুড়ান্ত ধর্ম। এই ধর্মের অনুকরণ অপরিহার্য। এটা অব্যাহত থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত।

 

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কে ?

তাঁর নাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্‌ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশিম। তাঁর উপনাম আবুল কাসিম। তিনি ছিলেন আরবের কুরাইশ বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুরাইশের বংশ-পরম্পরা আদ্‌নান পর্যন্ত যায়। আদ্‌নান ছিলেন আল্লাহ্‌র নবি এবং ইব্রাহিম খালিলুল্লা্হ্‌র তনয় ইসমাইলের বংশধর।

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাআলা ইসমাইলের বংশধর হতে কিনানাকে মনোনীত করেন। কিনানার অন্যান্য বংশের উপর কুরাইশকে তিনি প্রাধান্য দেন। কুরাইশের অন্যান্য পরিবারের উপর তিনি বানু হাশিমকে মনোনীত করেন এবং বানু হাশিমের মধ্যে আমাকে মনোনীত করেন”। (সহি মুস্‌লিম :২২৭৬)

 

তিনি চল্লিশ বৎসর বয়সে আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে প্রথম প্রত্যাদেশ পান। অতঃপর তিনি তেরো বছর ধরে মক্কায় মানুষকে আল্লাহ্‌র একত্ববাদের প্রতি আহ্বান করতে থাকেন। তারপর তিনি মদিনায় হিজ্‌রত করেন, সেখানকার মানুষকে ইসলামের প্রতি ডাক দেন আর তাঁরা তাঁর ডাকে সাড়া দেন। আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর প্রতি একটি চিরস্থায়ী সংবিধান অবতীর্ণ করেন। হিজরতের আট বছর পর তিনি মক্কা জয় করেন। তাঁর উপর পূর্ণ কুর্‌আন অবতীর্ণ হওয়ার পর ৬৩ বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন। দ্বিনের সমস্ত বিধান পূর্ণাঙ্গরূপে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর আরবের সকল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আরও জানার জন্য প্রণিধান করুননবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, এখানে ক্লিক করুন।

 

নবি-রসূলগণের প্রতি ঈমানের সুফল

১। স্বীয় বান্দার প্রতি আল্লাহ্‌ তাআলার যে করুণা ও ভালোবাসা রয়েছে, তা মানুষ অনুভব করতে পারে। কেননা তিনি তাদের নিকট নবিদের প্রেরণ করেছিলেন তাদেরকে নিজের দ্বিন পৌঁছে দেয়ার জন্য। তাঁরা ছিলেন আদর্শ, যাদেরকে মানুষ অনুকরণ করত।

 

২। সত্যবাদী বিশ্বাসীদেরকে অবিশ্বাসীদের থেকে পৃথক করা; কেননা যে ব্যক্তি তার নিজের রসূলের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য অন্যান্য সমস্ত নবি-রসূলের প্রতি ঈমান রাখা অপরিহার্য।

 

৩। আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা নিজেদের নবিগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে।

 

আরও দেখুন

ইসলামের নবি মুহাম্মাদ ; নবি মুহাম্মাদ -এর শেষ ভাষণ, ঈমানের স্তম্ভসমূহ;

 

তথ্যসূত্র

http://www.1ststepsinislam.com/en/belief-in-messengers.aspx

279 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page