আল্লাহ্‌র গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান (বিশ্বাস)


প্রত্যেককে এই বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর নবিদের ওপর মানবজাতির নিকট পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসমানি গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেছিলেন। এই গ্রন্থগুলি সেগুলোর যথাসময়ে কেবল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। সমস্ত গ্রন্থ মানুষকে একমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদতের প্রতি আহ্বান করে, আর আহ্বান করে এ বিশ্বাস স্থাপনের দিকে যে, তিনিই স্রষ্টা, স্বত্বাধিকারী ও মালিক এবং তাঁর রয়েছে সুন্দর সুন্দর গুণবাচক নামসমূহ।  

 

বিষয়সূচি

 

কুর্‌আন

আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও তুলাদণ্ড যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে”। [কুর্‌আন ৫৭:২৫]

 

বিভিন্ন গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে

আল্লাহ্‌ তাআলা কর্তৃক অবতারিত বিভিন্ন গ্রন্থের উল্লেখ কুর্‌আনে রয়েছে। সেগুলো হলো :

  • ইব্রাহিমেম সহিফাসমূহ
  • তাওরাত
  • যবুর
  • ইনজিল
  • পবিত্র কুর্‌আন

 

১। ইব্রাহিমের সহিফাসমূহ

এগুলো ইব্রাহিম (আঃ)-এর ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “ইব্রাহিম ও মুসার সহিফাসমূহ”। [সূরা আ’লা ৮৭:১৯]

 

২। তাওরাত

তাওরাত একটি পবিত্র গ্রন্থ। সেটি দেওয়া হয়েছিল নবি মুসাকে (আঃ)। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “নিশ্চয়ই আমিই তাওরাত অবতীর্ণ করেছি (মুসার প্রতি), যাতে রয়েছে পথনির্দেশিকা ও আলো। আল্লাহ্‌র অনুগত নবিগণ তদানুযায়ী ইহুদিদের আদেশ করতেন আর রব্বানি (আল্লাহ্‌ভক্তগণ) ও পণ্ডিত ব্যক্তিরাও (তাঁদের নবির পর তাওরাত অনুযায়ী ইহুদিদের বিধান দিতেন), তাদেরকে আল্লাহ্‌র কিতাবের রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁরা ছিলেন তার সাক্ষী। সুতরাং তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো এবং স্বল্প মূল্যে আমার আয়াতসমূহকে বিক্রয় করো না। আর আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুসারে যারা বিচার করে না, তারাই অবিশ্বাসী”। [সূরা মায়িদা ৫:৪৪]

 

৩। যবুর

ঐশী গ্রন্থ “যবুর” নবি দাউদ (আঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “এবং আমি দাউদকে যবুর দান করেছিলাম”। (সূরা নিসা : ৪:১৬৩]

 

৪। ইনজিল (সাধারণত গোস্‌পাল বলা হয়)

ইন্‌জিলগ্রন্থটি নবি ইসাকে (আঃ) দান করা হয়েছিল। অনেকেই তাঁকে যিশু নামে জানে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “আর আমি তাদের পরেই মারয়াম তনয় ইসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যায়নকারীরূপে প্রেরণ করেছিলাম। আমি তাকে ইন্‌জিল প্রদান করেছি, তাতে রয়েছে পথনির্দেশ ও আলো। এবং এটা ছিল তার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশবাণী”। [সূরা মায়িদা ৫:৪৬]

 

প্রত্যেক মুসলমানকে এই সমস্ত ঐশী গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এ সমস্ত আল্লাহ্‌র পক্ষ হতেই অবতীর্ণ, একথা তাদের বিশ্বাস করতেই হবে। এগুলোর আইন মান্য করা বিধিসংগত নয়, কারণ এই সমস্ত গ্রন্থ বিশেষ সময়ে কিছু বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অপরপক্ষে কুর্‌আন অবতীর্ণ করা হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। [সূরা বাকারা ২:১৮৫]

 

৫। পবিত্র কুর্‌আন

প্রত্যেকের জন্য এ সংক্রান্ত নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ের ওপর বিশ্বাস রাখা আবশ্যক :

 (ক)প্রত্যেকের জন্য এই ঈমান রাখা আবশ্যক যে, কুর্‌আন আল্লাহ্‌ তাআলার বাণী। সেটি জিব্রাইল (আঃ) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট সুস্পষ্ট আরবি ভাষায় নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “বিশ্বস্ত আত্মা (জিব্রাইল) এটা নিয়ে অবতরন করেছেন। তোমার হৃদয়ে (হে মুহাম্মাদ !) যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পারো। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়”। [সূরা শুআ’রা ২৬:১৯৩-১৯৫]

 

 (খ) প্রত্যেকের জন্য এই ঈমান রাখা আবশ্যক যে, কুর্‌আন সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ। কুর্‌আন পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে আলোচিত তাওহিদের বাণী এবং তাঁর আনুগত্য ও উপাসনার আবশ্যিকতার সত্যায়ন করে। পূর্ববর্তী সমস্ত গ্রন্থ কুর্‌আনের মাধ্যমে রহিত হয়েছে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি গ্রন্থ (কুর্‌আন) অবতীর্ণ করেছেন যা পূর্ববর্তী বিষয়ের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। আর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইন্‌জিল। মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য (তিনি আরও কিতাব অবতীর্ণ করেছেন)। আর তিনি ফুর্‌কান অবতীর্ণ করেছেন (ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে বিচারের মানদণ্ড)”। [সূরা আল-ইম্‌রান ৩:৩-৪]

 

 (গ) প্রত্যেকের জন্য এই ঈমান রাখা আবশ্যক যে, কুর্‌আনের মধ্যে সমস্ত ঐশী নিয়মবিধি বিদ্যমান। আল্লাহ্‌ সুব্‌নাহু ওয়া তাআলা বলছেন : “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বিন (ধর্ম) মনোনীত করলাম”। [সূরা মায়িদা ৫:৩]

 

 (ঘ) প্রত্যেকের জন্য এই ঈমান রাখা আবশ্যক যে, এই কুর্‌আন সমগ্র মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে; কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নয়, যেরূপ পূর্ববর্তী ঐশী গ্রন্থগুলি অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “রমযান মাস, যার মধ্যে কুর্‌আন অবতীর্ণ করা হয়েছে বিশ্বমানবের জন্য পথপ্রদর্শক, সুপথের উজ্জ্বল নিদর্শন ও (ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে) প্রভেদকারী স্বরূপ”। [সূরা বাকারা ২:১৮৫]

 

 (ঙ) প্রত্যেকের জন্য এই ঈমান রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহ্‌ তাআলা কুর্‌আনকে সর্বপ্রকার বিকৃতি, অপমিশ্রণ, সংযোজন বা বিয়োজন থেকে সুরক্ষিত রেখেছেন। আল্লাহ্‌ সুব্‌হানাহু ওয়া তাআলা বলেন : “আমিই যিক্‌র (কুর্‌আন) অবতীর্ণ করেছি আর আমিই এর সংরক্ষণকারী”। [সূরা হিজ্‌র ১৫:৯]

 

আল্লাহ্‌র গ্রন্থসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের তাৎপর্য

১। একজন মানুষ বান্দাদের প্রতি আল্লাহ্‌ তাআলার ভালোবাসা ও অনুগ্রহের কথা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে। কেননা তিনি তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের জন্য গ্রন্থ দান করেছেন। সেই পথ তাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির দিশা দেয়। তিনি মানুষকে সংশয় ও শয়তানের অনিষ্ট হতে রক্ষা করেছেন।

 

২। একজন মানুষ আল্লাহ্‌ তাআলার মহাপ্রজ্ঞার কথা গভীরভাবে অনুভব করতে পারে; কারণ তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে এক গুচ্ছ বিধিনিয়ম প্রদান করেছিলেন, যেগুলো ছিল তাদের সময়াপযোগী।

 

৩। অবিশ্বাসীদের থেকে বিশ্বাসীদের পৃথককরণ। যে ব্যক্তি স্বীয় গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তার জন্য অন্যান্য ঐশী গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যিক।

 

৪। বিশ্বাসীদের জন্য সৎকর্মের বৃদ্ধি; কেননা যে ব্যক্তি স্বীয় গ্রন্থ এবং তারপর অন্যান্য গ্রন্থের প্রতি ঈমান রাখে, সে দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “এর পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব (তাওরাত, ইন্‌জিল প্রভৃতি) দিয়েছিলাম, তারা এতে (কুর্‌আনে) বিশ্বাস করে। যখন তাদের নিকট এটা আবৃত্তি করা হয় তখন তারা বলে : আমরা এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি। নিশ্চয়ই এটা আমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে আগত সত্য। আমরা তো পূর্বেও সেই সমস্ত লোকের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যারা ইস্‌লামের মধ্যে মুসলমানরূপে আল্লাহ্‌ সামনে আত্মসমর্পণ করে (যেমন আব্দুল্লাহ্‌ বিন সালাম, সলমান ফারসি প্রমুখ)। তাদেরকে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে, কারণ তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভালো দ্বারা মন্দ প্রতিহত করে আর আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি, তা হতে তারা ব্যয় করে”। [সূরা কাসাস ২৮:৫২-৫৪]

 

আরও দেখুন

কুর্‌আন, আল্লাহ্‌, ইস্‌লামি গ্রন্থসমূহ, কুর্‌আনের সংরক্ষণ, E-Library

 

তথ্যসূত্র

http://www.1ststepsinislam.com/en/belief-in-books.aspx

 

476 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page