আল্লাহ্‌ কে?


আমরা বিভিন্ন লোকের নিকট আল্লাহ্‌ তাআলার বিভিন্ন সংজ্ঞা শনে থাকি। সবাই স্ব-স্ববোধের ভিত্তিতে আল্লাহ্‌ তাআলার সংজ্ঞা দেয়। তাদের উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে আমরা আল্লাহ্‌ তাআলা সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি স্থির করব। আসুন, আমরা সর্বোত্তম পথে আল্লাহ্‌ তাআলার বিষয় উপলব্ধি করব। আর আল্লাহ্‌ তাআলার বিষয়টি বোঝার সর্বোত্তম পথ হলো কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ্‌ তাআলার বাণী, নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বাণী এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নর-নারী সাহাবাবর্গের উপলব্ধি।

 

আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে একটি অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের উপযুক্ত করার জন্য এবং পরকালে সাফল্য অর্জনে আমাদের সাহায্য করার জন্য কুরআন কারিমের মাধ্যমে সত্যের বার্তা প্রেরণ করেছেন। মুক্ত মন-মানসিকতা নিয়ে এই বার্তার প্রতি গভীর চিন্তাভাবনা বহু মানুষকে এই বিশ্বের প্রধান মালিক হিসেবে আল্লাহ্‌ তাআলাকে জানা এবং তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। একবার আমাদের মস্তিষ্ক আল্লাহ্‌ তাআলাকে আমাদের স্রষ্টাস্বরূপ স্পষ্টভাবে জেনে নিলে আমরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব যে, আমাদের উপর আল্লাহ্‌ তাআলার অধিকার কী। এই বিশ্বাসই আমাদের স্রষ্টা হিসেবে তাঁর যথোপযুক্ত ইবাদত করতে আমাদেরকে সাহায্য করতে পারে। [১]

 

বিষয়সূচি

 

শব্দতত্ত্ব

দুঃখের বিষয় যে, কিছু সংখ্যক লোক এ কথা বিস্তার করতে চাই যে, আল্লাহ্‌ শব্দটি নবিদের এক ইশ্বর ছাড়াও অন্যান্যকে বোঝায়। মনে হয় যেন শব্দটি কতিপয় প্রতিমা বা চন্দ্র-ইশ্বরকে বোঝায়। আরবি ভাষায় ইশ্বর বা দেবতার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ শব্দ “ইলাহ্‌”, এর দ্বিবচন “ইলাহায়নি” এবং বহুবচন “আ-লিহাহ্‌”। আরবি ভাষায় ইলাহ্‌ শব্দটির অর্থ : “এমন কিছু যার উপাসনা বা পূজা করা হয়”, সেই উপাসনা ন্যায়সঙ্গত হোক বা কিছু না বুঝেই হোক। সুতরাং এর অর্থ এক সত্য উপাস্য এবং বাতিল উপাস্য, উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। আরবি বহুবচন আ-লিহাহ্‌ শব্দটি সর্বদা বাতিল উপাস্যদের জন্য ব্যবহৃত হয়। কয়েকটি উদাহরণ দেয়ার জন্য আমরা বলতে পারি, এক সত্য উপাস্যের জন্য উদাহরণস্বরূপ, সর্বনামের সঙ্গে সম্বন্ধিত হয়ে ব্যবহৃত : “ইলাহী” (আমার উপাস্য”, “ইলাহুকুম” (তোমাদের উপাস্য); বিশেস্ব-র সঙ্গে সম্বন্ধিত হয়ে ব্যবহৃত : “ইলাহু ইব্রাহিম” (ইব্রাহিমের উপাস্য)। নিম্নোক্ত আয়াতগুলিতে আমরা দেখতে পায় : “ইলাহু আবা-ইকা” (তোমাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্য), “ইয়ালাহান ওয়াহিদান” (এক উপাস্য)।

 

أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاء إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي قَالُواْ نَعْبُدُ إِلَـهَكَ وَإِلَـهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَـهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

 

 “যখন ইয়াকুবের মৃত্যু এসে পৌঁছয় তখন কি তোমরা উপস্থিত ছিলে ? তখন তিনি তাঁর সন্তানদেরকে বলেছিলেন : আমার পর তোমরা কীসের ইবাদত করবে ? তারা বলেছিল : আমরা তোমার উপাস্য এবং তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাইল এবং ইসহাকের উপাস্য, এক অদ্বিতীয় উপাস্যের ইবাদত করব এবং আমরা তাঁরই অনুগত থাকব”। [সূরা বাকারা ২:১৩৩]

 

রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌ তাআলার একত্ববাদের দাবি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এটা দেখে আরবের বহুদেববাদীরা বিস্মিত হয়েছিল। এই বিস্ময়ের বিবরণ আল্লাহ্‌ তাআলা দিয়েছেন। আরবীয়রা রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে কী বলেছিল তা কুরআনের ভাষায় প্রণিধান করুন :

 

وَعَجِبُوا أَنْ جَاءَهُمْ مُنْذِرٌ مِنْهُمْ وَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا سَاحِرٌ كَذَّابٌ (4) أَجَعَلَ الْآَلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ (5)

 

 “তারা বিস্মিত হচ্ছে যে, তাদের নিকট তাদেরই মধ্য হতে একজন সতর্ককারী এসেছে, এবং কাফিররা বলে : এতো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী। সে কি বহু উপাস্যকে এক উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে ? এতো এক আশ্চর্য ব্যাপার !” [সূরা স্ব-দ ৩৮:৪-৫]

 

"আল্লাহ" শব্দটি এক অদ্বিতীয় উপাস্যেরপ্রকৃতনাম। আক্ষরিকভাবে শব্দটি “আল” (“আল” আক্ষরদুটি কোনো অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট করার জন্য ব্যবহৃত হয়) এবং “ইলাহ্‌” শব্দ মিলে গঠিত; আর ইলাহ্‌ শব্দের অর্থ : উপাস্য (যেমন উপরে আলোচিত হয়েছে)। এমনিভাবে “আল্লাহ” হয়ে যায় “আল-ইলাহ” এবং আরবি স্বরধ্বনি অনুযায়ী এর আক্ষরিক অর্থ : উপাস্যটি। অবশ্যই এর অর্থ দাঁড়ায় : এক এবং একমাত্র উপাস্য, এক প্রতিপালক ও স্রষ্টা এবং সার্বভৌম।

 

ইবনে তাইমিয়া (রহঃ)-র অভিমত : “আল্লাহ” (الله) শব্দটি আরবি মূল শব্দ “আলিহা” (أله) হতে উদ্ভূত, যেমন উলুহিয়্যাহ্‌। সুতরাং আল্লাহ্‌ নামটি উপাসনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এমনিভাবে আরবি শব্দ “আল্লাহ্‌”-র অর্থ হয় : “এমন একক সত্তা যিনি যাবতীয় উপাসনার যোগ্য”। খুব সংক্ষেপে এটাই হলো ইসলামের বিশুদ্ধ একত্ববাদের বার্তা। (মাজ্‌মুউল ফাতাওয়া : ২/৪৫৬) [২]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা সম্বন্ধে আমাদের (মুসলমানদের) কী বিশ্বাস ?

১। তিনি অদ্বিতীয় উপাস্য, তাঁর কোন শরীক নেই।

২। কিছুই তাঁর মতো নয়,হ্যাঁ তিনি মহাস্রষ্টা। কিন্তু তিনি নিজে সৃষ্টনন বা তাঁর সৃষ্টির কোনোঅংশ নন।

৩। তিনি সর্বক্ষমতার অধিকারী এবং একেবারে ন্যায়পরায়ণ।

৪। তিনি ব্যতীতউপাসনার যোগ্য সমগ্র বিশ্বে অন্য কোন সত্তা নেই।

৫। তিনি প্রথম,শেষএবং চিরস্থায়ী;যখন কিছুই ছিলনা তখন তিনিছিলেনআর যখন কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না তখন তিনি থাকবেন।  

৬। তিনি সর্বজ্ঞ, পরম দয়ালু,  সর্বোচ্চএবংসার্বভৌম।

৭। শুধুমাত্র তিনিই কোনো কিছুকে জীবন দিতে সক্ষম।

৮। তিনি তাঁর রসূলগণ (তাঁদের প্রতিশান্তি বর্ষিত হোক)-কে সমগ্রমানবজাতিরপথপ্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেছিলেন।

৯। তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নবিও রসূল হিসেবে মুহাম্মদ পাঠিয়েছিলেন।

১০। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে যা কিছু রয়েছে তা জানেন। [] [৪]

আল্লাহ্‌র সত্তার অদ্বিতীয়তা

তাওহীদ নামে পরিচিত আল্লাহ سبحانه و تعالى-এরএকত্ববাদ, ইসলামিধারণায়প্রথম এবং প্রধান সংবিধান।কারণ, এটা ইসলামিবিশ্বাসের মৌলিক সত্য। তাছাড়া এটি ইসলামিধারণারপ্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে অন্যতমএকটি। কারণ মানবসমাজে বর্তমানে প্রচলিত সমস্ত বিশ্বাসরীতি এবং দর্শনের মধ্যে কেবলমাত্র ইসলামি বিশ্বাসকে স্বচ্ছ বিশ্বাসের সঙ্গে একত্ববাদের নিরঙ্কুশ রূপ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। 

 

 “আল্লাহ্‌ তাআলা ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির প্রতিপালক”। [সূরা বাকারা ২:২৫৫]

 

 “আর তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্‌, সেই পরম করুণাময় অপার কৃপাশীল ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই”। [সূরা বাকারা ২:১৬৩]

 

 “আল্লাহ্‌- তিনি ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণকারী”। [সূরা আল-ইমরান ৩:২]

 

 “তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই”। [সূরা আ’রাফ ৭:৫৯, ৬৫, ৮৫]

 

 “নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ্‌, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে স্বালাত প্রতিষ্ঠা করো”। [সূরা ত্ব-হা ২০:১৪]

 

 “যদি আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীতে আল্লাহ্‌ ব্যতীত আরও বহু উপাস্য থাকত তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত; অতএব তারা যে বিবরণ দেয় তা হতে আরশের অধিপতি আল্লাহ্‌ মহাপবিত্র”। [সূরা আন্বিয়া ২১:২২]

 

 “আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা আমার ইবাদত করো” [সূরা আন্বিয়া ২১:২৫]

 

 “বলো : তিনিই আল্লাহ্‌, তিনি এক”। [সূরা ইখলাস ১১২:১]

 

 “আল্লাহ্‌ তাআলা সবকিছুর স্রষ্টা”। [সূরা যুমার ৩৯:৬২]

 

 “তিনিই আল্লাহ্‌ তোমাদের প্রতিপালক। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই; প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা তিনিই, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত করো, কেননা তিনি সব জিনিসের কার্যনির্বাহী”। [সূরা আনআ’ম ৬:১০২]

 

“আল্লাহ্‌ তাআলা কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অপর কোনো উপাস্যও নেই। যদি থাকত তাহলে প্রত্যেক উপাস্য স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যা বলে তা হতে আল্লাহ্‌ সম্পূর্ণ পবিত্র”। [সূরা মু’মিনুন ২৩:৯১]

 

 “(তিনি সেই সত্তা) যিনি আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী, তিনি সন্তান গ্রহণ করেননি এবং সার্বভৌত্বে তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে সৃষ্টি করেছেন এবং যথাযথ অনুপাতে প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন”। [সূরা ফুরক্বান ২৫:২]

 

 “আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত যাবতীয় বস্তুর আধিপত্য কেবল আল্লাহ্‌র”। [সূরা মায়িদা ৫:১৭]

 

 “তিনি আল্লাহ্‌, যিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই”। [সূরা হাশ্‌র ৫৯:২৩]

 

 “হে মানুষ ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহকে স্মরণ করো। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো স্রষ্টা আছে কি, যে আকাশ ও পৃথিবী থেকে তোমাদেরকে জীবিকা দান করে ? তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং তোমরা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছ ?” [সূরা ফাত্বির ৩৫:৩]

 

 “এমন কত জীবজন্তু রয়েছে যারা নিজেদের জীবিকা সংরক্ষিত রাখে না। আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে এবং তোমাদেরকে জীবিকা প্রদান করেন এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। [সূরা আন্‌কাবুত ২৯:৬০]

 

 “বলো, আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনো মা’বুদ নেই, তিনি এক, পরাক্রমশালী”। [সূরা স্ব-দ ৩৮:৬৫]

 

 “কোনো নবি আল্লাহ্‌ তাআলা ছাড়া অন্য কারো ইবাদতের প্রতি মানুষকে আহ্বান করেননি”। [সূরা আল-ইমরান ৩:৭৯]

 

 “তুমি বলো, তোমরা কি ভেবেছ যদি আল্লাহ্‌ তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তোমাদের হৃদয়কে মোহরাঙ্কিত করে দেন তাহলে আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কে আছে যে সেগুলো তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেবে ? লক্ষ করো, আমি আমার নিদর্শনসমূহ ছড়িয়ে রেখেছি, এরপরও তারা তা হতে বিমুখ হচ্ছে”। [সূরা আনআ’ম ৬:৪৬]

 

 “আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর, সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ”। [সূরা রূম ৩০:২৬]

 

 “আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে তারা এবং ফেরেশ্তাগণ সবাই আল্লাহ্‌ তাআলাকেই সেজদা করে আর তারা অহংকার করে না”। [সূরা নাহ্‌ল ১৬:৪৯]

 

 “তারা আল্লাহ্‌কে ছেড়ে তাদের বিদ্বান এবং ধর্মযাজকদেরকে প্রভু বানিয়েছে এবং মারিয়ামের পুত্র মাসীহ্‌কেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল যে, তারা কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদত করবে, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই”।[সূরা তাওবা ৯:৩১] [৫]

 

স্বীয় কার্যক্রমে আল্লাহ্‌ তাআলার অদ্বিতীয়তা

কুরআনে প্রথম আয়াতেই আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন যে, আল্লাহ্‌ তাআলা নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক। আরবি শব্দ “রব”-র অর্থ : স্রষ্টা, অধিপতি এবং একক সত্তা; যিনি তাদের সংশোধন এবং শিক্ষাদান করেন। এজন্য তিনি তাঁর নবি-রসূলদের প্রেরণ করেন, তাঁর গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেন এবং তাদের সৎকর্মের জন্য তাদেরকে পুরস্কৃত করেন। ইবনে কাইয়িম (রহঃ) বলেন : “বান্দাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ, তাদেরকে অসৎকর্ম হতে নিষেধ এবং সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কার প্রদান এবং দুষ্কর্মকারীদেরকে শাস্তি প্রদান, এসবই রবুবিয়্যাহ-র অন্তর্ভূক্ত”। (মাদারিজুস সুন্নাহ : ১/৮)

 

কুরআন হতে কয়েকটি উদ্ধৃতি

“আল্লাহ্‌ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সবকিছুর ব্যবস্থাপক”। [সূরা যুমার ৩৯:৬২]

 

“তিনি সমস্ত প্রাণী, মানুষ তথা প্রত্যেক জিনিসের ব্যবস্থাপক। ভূপৃষ্ঠের প্রত্যেক প্রাণীর জীবিকা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার পক্ষ হতে আসে”। [সূরা হূদ ১১:৬]

 

“তুমি বলো, হে আল্লাহ্‌ ! হে রাজ্যাধিপতি ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন; আপনার হাতেই যাবতীয় কল্যাণ, নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। আপনি রাত্রিকে দিনে এবং দিনকে রাত্রিতে পরিবর্তিত করেন; আপনি মৃত হতে জীবিতকে নির্গত করেন এবং জীবিত হতে মৃতকে নির্গত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন”। [সূরা আল-ইমরান ৩:২৬-২৭]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা স্বীয় আধিপত্যে কোনো অংশীদার বা সহায়কের বিষয়কে অস্বীকার করেছেন, ঠিক যেমন তিনি অস্বীকার করেছেন তাঁর সৃষ্টি এবং ব্যবস্থাপনায় কোনো অংশীদারের বিষয়টিকে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন : “এটা আল্লাহ্‌র সৃষ্টি, তিনি ব্যতীত অন্যরা কী সৃষ্টি করেছে তা তোমরা আমাকে দেখাও”। [সূরা লুক্বমান ৩১:১১]

 

 “এমন কে আছে যে তোমাদেরকে জীবিকা দান করতে পারে, যদি তিনি জীবিকা বন্ধ করে দেন ?” [সূরা মুল্‌ক ৬৭:২১]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা সমস্ত সৃষ্টিকে স্বভাবধর্মের (ফিত্‌রাত) উপর সৃষ্টি করেছেন যা তাঁর রবুবিয়্যাতকে সুনিশ্চিত করে দেয়। সেই সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত রয়েছে মুশরিক্‌রাও, যারা ইবাদতে আল্লাহ্‌র অংশীদার স্থাপন করে। আল্লাহ্‌ তাআলা রবুবিয়্যাতে স্বীয় সার্বভৌমত্বের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন : “জিজ্ঞাসা করো : সপ্তাকাশ এবং মহা-আরশের প্রতিপালক কে ? তারা বলবে : আল্লাহ্‌। জিজ্ঞাসা করো : তাহলে তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় করছ না কেন ? জিজ্ঞাসা করো : যদি তোমরা জানো তবে বলো : সবকিছুর কর্তৃত্ব কার হা্তে  যিনি সকলকে নিরাপত্তা দেন, কিন্তু তাঁকে নিরাপত্তা দেয়ার কেউ নেই ? তারা বলবে : আল্লাহ্‌র। বলো, তবুও তোমরা কেমন করে বিভ্রান্ত হচ্ছ ?” [সূরা মু’মিনুন ২৩:৮৬-৮৯]

 

কুরআনের সূরা নাম্‌লের ৬০-৬৪নং আয়াতে বলেছেন, তিনি একা :

  • আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন।
  • তোমাদের জন্য আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন।
  • তিনি পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন এবং তার মধ্যে নদীনালা প্রবাহিত করেছেন।
  • দৃঢ়ভাবে পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায়।
  • তিনি আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন।
  • তিনি তোমাদেরকে স্থল ও জলের অন্ধকারে পথ দেখান।
  • স্বীয় অনুগ্রহের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী বায়ু প্রেরণ করেন।
  • আকাশ ও পৃথিবী হতে তোমাদেরকে জীবিকা দান করেন।
  • কেবল তিনিই অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন। [৭]

 

স্বীয় নামসমূহে আল্লাহ্‌র অদ্বিতীয়তা

আল্লাহ্‌ তাআলার নামসমূহ অতুলনীয়। তাঁর নামসমূহ বিশেষ কোনো সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর কিছু নাম আমরা জানি আর কিছু জানি না। যেমন আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাদিসে বিষয়টি বিবৃত হয়েছে। তিনি বলছেন : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত হওয়ার সময় বলে : হে আল্লাহ্‌ ! আমি তোমার বান্দা ……। “আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি এমন প্রত্যেক নামের সাহায্যে, যে নামে তুমি নিজেকে নামাঙ্কিত করেছ, অথবা তোমার গ্রন্থে অভিব্যক্ত করেছ, কিংবা তোমার কোনো সৃষ্টিকে শিখিয়েছ, কিংবা অদৃশ্যের জ্ঞানের মধ্যে নিজের সঙ্গে সংরক্ষিত রেখেছ……”।(মুস্‌নাদে আহ্‌মাদ : ৩৫৮২)

 

আল্লাহ্‌ তাআলার সমস্ত নাম উত্তম। যেমন তিনি বলছেন : ““আর আল্লাহ্‌র সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে; সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকবে। আর তাদেরকে বর্জন করো যারা তাঁর নাম বিকৃত করে; সত্বরই তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে”। [সূরা আ’রাফ ৭:১৮০]

 

 “আল্লাহ্‌” নামটি ওই একক সত্তাকে বোঝায় যাঁর ইবাদত ও আরাধনা করা হয়, যিনি দেবত্বের যাবতীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং যাঁর সামনে তাঁর সমস্ত সৃষ্টি পরাভূত। উপাস্যের যে সমস্ত গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তিনি নিজেকে বিশিষ্ট করেছেন, সেগুলো পূর্ণাঙ্গতার বৈশিষ্ট্য।

 

আল্লাহ্‌ তাআলার কতিপয় নাম

  • আল-রহমান (পরম করুণাময়),
  • আল-রহীম (অসীমদয়ালু) ,
  • আল-স্বমাদ (স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা, যাঁকেসকল প্রাণীর প্রয়োজন, তিনি পানাহার করেন না),  
  • আল-সামী’ (সর্বশ্রোতা), তিনি সমস্ত ধ্বনি শুনতে পান সেটা যে ভাষায় হোক না কেন, ভাষা যতই বেশি ও বৈচিত্রময় হোকতাঁর জন্য সেটা কোনো ব্যাপার না।
  • আল-কারিম ( সর্বাধিক উদার),
  • আল-জাওওয়াদ ​​( উদার),
  • আল-রঊফ( সহানুভূতিশীল),
  • আল-ওয়াহহাব( সর্বদাতা),
  • আল-আলীম ( সর্বজ্ঞ),
  • আল-হাকীম (প্রজ্ঞাময়)।

 

আল্লাহ্‌ তাআলার অধিকাংশ নামই তাঁর নাম এবং গুণ উভয়কেই বোঝায়।

 

স্বীয় গুণাবলিতে আল্লাহ্‌র অদ্বিতীয়তা

আল্লাহ্‌ তাআল বিশ্বের প্রতিটি জিনিসের প্রকৃত অধিপতি এবং সার্বভৌম। [সূরা হাশ্‌র ৫৯:২৩]

 

আমাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে যা কিছু আছে এবং যা কিছু এ দুয়ের অন্তর্বর্তী, সবই তাঁর; আর তোমার প্রতিপালক ভুলো নন। [সূরা মারিয়াম ১৯:৬৪]

 

কেবল আল্লাহ্‌ তাআলা বিশ্বের সকল বিষয়ের নিয়ন্তা। [সূরা রা’দ ১৩:২]

 

 “বলো, তবে কি তোমরা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অপরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছ যারা নিজেদের লাভ ও ক্ষতি সাধনে অক্ষম?” [সূরা রা’দ ১৩:১৬]

 

 “তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, যখন তিনি কোনো কিছু করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি বলেন : হও, ফলে তা হয়ে যায়”। [সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮২]

 

 “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ এবং প্রজ্ঞাবান”। [সূরা ইনসান ৭৬:৩০]

 

কোনো কিছুকে বৈধাবৈধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার রয়েছে, কারণ তিনিই আইনপ্রণেতা। [সূরা তাহ্‌রীম ৬৬:১]

 

কেবল আল্লাহ্‌ তাআলাই অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন। [সূরা আ’রাফ ৭:১৮৮]

 

শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলা হৃদয়ের রহস্যের জ্ঞান রাখেন। [সূরা মুল্‌ক ৬৭:১৪, ১৪, সূরা হাদীদ ৫৭:৪]

 

কেবল আল্লাহ্‌ তাআলাই জীবিকা প্রদান করেন/প্রত্যাহার করেন/বৃদ্ধি করেন/নিয়ন্ত্রণ করেন। [সূরা ইস্‌রা ১৭:১৩, সূরা সাবা ৩৪:৩৬]

 

শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলাই সন্তান (পুত্র ও কন্যা) দান করেন। [সূরা শুরা ৪২:৪৯, ৫০]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা সেই একক সত্তা যিনি পথপ্রদর্শন করেন, আহার্য ও পানীয় দান করেন, রোগমুক্ত করেন, স্বাস্থ্য দান করেন, জীবন ও মৃত্যু দান করেন এবং অপরাধ ক্ষমা করেন। [সূরা শুআরা ২৬:৭৮-৮২]

 

শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলা খাদ্য-সম্ভার এবং সাফল্য দান করেন। [সূরা হূদ ১১:৮৮]

 

আল্লাহ্‌ তাআলাই কেবল লাভ বা ক্ষতি সাধন করতে পারেন এবং ভাগ্যের ভালোমন্দের মালিক কেবল তিনিই।[সূরা ফাত্‌হ ৪৮:১১]

 

জীবন এবং মরণের উপর নিয়ন্ত্রণ শুধু আল্লাহ্‌ তাআলা রাখেন।[সূরা গাফির ৪০:৬৮] [৯]

 

ইবাদত (উপাসনা) শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার জন্য

ইবাদতের অর্থ

  • ইবনে কাসির ইবাদতের সংজ্ঞা দিচ্ছেন : এম এক অবস্থা যাতে পরিপূর্ণ অনুরাগ, আনুগত্য এবং ভীতির সম্মিলন ঘটে। এটি একটি ব্যাপক পরিভাষা, যার অন্তর্ভূক্ত ওই সমস্ত কর্ম ও কথা যা আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট পছন্দনীয়।

 

এছাড়া ইবাদতের সংজ্ঞা বিবৃতি এবং কর্ম উভয়ের মধ্যমে দেয়া যায়। আল্লাহ্‌ তাআলার নির্দেশাবলি পালন এবং এমন কিছু করা যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন, তাই ইবাদত।

  • ইবাদতের দু’টি শর্ত
    • আন্তরিকতা
    • অনুকরণ

 

  • কর্ম
    • স্বভাবসিদ্ধ  
      অনুমোদিত, যতক্ষণ না তার অন্যথা সাব্যস্ত হয়
      • স্বভাবসিদ্ধ কাজও ধর্মীয় কাজে রূপান্তরিত হতে পারে, তবে তার একটি শর্ত রয়েছে। তা হলো : আন্তরিকতার সাথে কেবল আল্লাহ্‌ তাআলার উদ্দেশ্যে করতে হবে।
      • স্বভাবসিদ্ধ কর্মে যেন কোনো শির্‌ক না থাকে।
    • ধর্মীয়
      অনুনুমোদিত, যতক্ষণ না তা প্রমাণিত হয়
      • আন্তরিকতা
        • অশুদ্ধ উদ্দেশ্য গ্রহণীয় নয়
      • অনুকরণ
        • এটা যেন সুন্নাতের অনুকরণে হয়।
        • রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে কেউ ধর্মের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করল যা আমরা নির্দেশ করিনি তা প্রত্যাখ্যাত”। (সহি বুখারি : ৩/৮৬১)

 

 ঘৃণ্যতম মহাপাপ হলো : আল্লাহ্‌ তাআলার সাথে শির্‌ক, আল্লাহ্‌ তাআলার শাস্তি হতে নিরাপদ বোধ, আল্লাহ্‌ তাআলার অনুগ্রহ হতে নৈরাশ্য এবং তাঁর সাহায্য হতে নৈরাশ্য। [১০]

 

কুরআন হতে কয়েকটি উদ্ধৃতি

আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই নিকট সাহায্য কামনা করি। [সূরা ফাতিহা ১:৪]

 

সুতরাং যে কেউ স্বীয় প্রতিপালকের সাক্ষাত আশা করে সে যেন সৎকর্ম করে এবং স্বীয় প্রভুর ইবাদতে কাউকে অংশীদার না করে। [সূরা কাহ্‌ফ ১৮:১১০]

 

আর তোমার প্রতিপাল বলেন : তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত-বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [সূরা মু’মিন ৪০: ৬০]

 

এবং নিশ্চয়ই মসজিদগুলি আল্লাহ্‌র জন্য, সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না। [সূরা জিন ৭২:১৮]

 

যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সাথে ডাকে অন্য কোনো উপাস্যকে যার বিষয়ে তার নিকট কোনো প্রমাণ নেই, তার হিসাব আল্লাহ্‌র নিকট রয়েছে। নিশ্চয়ই অবিশ্বাসীরা সফলকাম হবে না। [সূরা নূর ২৩:১১৭]

 

আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে (তখন তাদেরকে বলে দাও) যে, নিশ্চয়ই আমি অতি নিকটে রয়েছি। আহ্বাবকারী যখনই আমাকে আহ্বান করে তখনই আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই। সুতরাং তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবেই তারা সুপথপ্রাপ্ত হবে। [সূরা বাকারা ২:১৮৬]

 

যখন নিরুপায় ব্যক্তিরা তাঁকে ডাক দেয় তখন তার ডাকে কে সাড়া দেয়, কে তার বিপদাপদ দূরীভূত করে এবং কে তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করে ? আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কোনো মা’বুদ আছে কি ? তোমরা খুব সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো। [সূরা নাম্‌ল ২৭:৬২] [১১]

 

কেবল আল্লাহ্‌ তাআলাই জীবনের স্রষ্টা, এর প্রমাণ

আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর আধিপত্ব সম্পর্কে এবং আল্লাহ্‌ তাআলা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সে ব্যাপারে তারা কি কোনো গভীর চিন্তা করে না ? তাদের জীবনের নির্দিষ্ট মিয়াদটি পূর্ণ হবার সময় হয়তো বা নিকটে এসে পড়েছে, তারা কি এটাও চিন্তা করে না ? তাহলে কুরআনের পর তারা আর কোন্‌ কথার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে ? [সূরা আ’রাফ ৭:১৮৫]

 

সুতরাং যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তারই মতো, যে সৃষ্টি করে না ? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না ? [সূরা নাহ্‌ল ১৬:১৭]

 

হে লোক সকল ! একটি উদাহরণ দেয়া হচ্ছে, মনোযোগসহকারে তোমরা তা শ্রবণ করো। তোমরা আল্লাহ্‌ তাআলার পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদি এ উদ্দেশ্যে তারা সকলে একত্রিত হয়। এবং মাছি যদি সবকিছু তাদের নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তবুও তারা ওর নিকট হতে কিছুই উদ্ধার করতে পারবে না। পূজারী এবং দেবতা উভয়ই দুর্বল। [সূরা হাজ্জ ২২:৭৩]

 

কিন্তু তারা তাঁর পরিবর্তে এমন কিছু উপাস্য গ্রহণ করেছে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং তারা নিজেদের উপকার বা অপকার করার কোনো ক্ষমতা রাখে না এবং জীবন বা মৃত্যু বা পুনরুত্থানের উপরও কোনো ক্ষমতা রাখে না। [সূরা ফুরকান ২৫:৩]

 

তিনি সেই সত্তা যিনি মরণ এবং জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কার কর্মকাণ্ড সর্বোত্তম। [সূরা মুল্‌ক ৬৭:২]

 

ইমাম বুখারি (রহঃ) তাঁর সহিতে আবু সাঈদ (রাঃ)-র সূত্রে একটি হাদিস নিয়ে এসেছেন। তাতে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “প্রত্যেক প্রাণীকে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলা সৃষ্টি করেছেন”। আরবি শব্দ “খালাকা”-র অর্থ : “এমন কিছুকে অস্তিত্ব দান করা, পূর্বে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না”। একাজ শুধু আল্লাহ্‌ তাআলাই করতে পারেন। আল্লাহ্‌ তাআলা ব্যতীত অন্য কারো জন্য এমন কাজ করা সম্ভবপর নয়। এর মধ্যে স্থির বা পূর্বনির্ধারণের অর্থও পাওয়া  যায়। (ফাত্‌হুল বারি : ১৩/৩৯০) [১২]

 

আল্লাহ্‌ কোথায় আছেন ?

আল্লাহ্‌ তাআলা মহিমান্বিত, সর্বোচ্চ এবং উত্তুঙ্গ; একথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর গ্রন্থ কুরআনে এবং তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ্‌ তাআলার মহত্বের প্রমাণে কুরআন মাজিদ ভরে আছে।

 

আহ্‌লুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ আল্লাহ্‌ তাআলার সমস্ত গুণাবলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং স্বীকার করেন এবং ওগুলোর প্রকৃত অর্থকে বিকৃত করেন না। তাঁরা এও বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ্‌ তাআলা সপ্তাকাশের উপর স্বীয় আরশে উপবিষ্ট আছেন এবং তিনি তাঁর সৃষ্টিকুল হতে বিচ্ছিন্ন আর সৃষ্টিকুল তাঁর হতে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

 

নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্‌ যিনি আকাশমণ্ডলি পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর সসম্মানে সমুন্নীত হয়েছেন। [সূরা ইউনুস ১০:৩]

 

পরম করুণাময় (আল্লাহ) আরশের উপর সমুন্নীত হলেন (তাঁর মর্যাদার যথোপযুক্ত নিয়মে)। [সূরা ত্ব-হা ২০:৫]

 

যখন আল্লাহ্‌ তাআলা বললেন : হে ইসা ! আমি তোমাকে নিয়ে নেব এবং আমার নিকট উত্তোলন করব। [সূরা আল-ইমরান ৩:৫৫]

 

ফেরেশ্তাগণ তাঁর দিকে উর্ধ্বগামী হন। [সূরা মাআ’রিজ ৭০:৪]

 

প্রত্যেক পবিত্র বাণী তাঁর দিকে আরোহণ করে। [সূরা ফা-ত্বির ৩৫:১০]

 

প্রত্যাদেশ তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়। [সূরা নাহ্‌ল ১৬:১০২]

 

তোমার প্রতিপালক তোমাদের উপর পরাক্রমশালী যাঁকে তোমরা ভয় করো। [সূরা নাহ্‌ল ১৬:৫০]

 

এছাড়া কুরআন কারিমে আরও অনেক প্রমাণ বর্তমান। যা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ্‌ তাআলা স্বীয় সৃষ্টির উপর পরাক্রমশালী।

 

উত্তম ব্যতীত অন্য কিছু আল্লাহ্‌ তাআলার দিকে আরোহণ করে না। (সহি বুখারি : ৯/৫২৫, সহি মুসলিম : ১৩২০)

 

আল্লাহ্‌ তাআলা একটি গ্রন্থ লিখেছেন যা তাঁর নিকট আরশের উপর বিদ্যমান রয়েছে। (সহি বুখারি : ৯/৫১৮)

 

যায়নাব (রাঃ) বলছেন : আল্লাহ্‌ তাআলা সপ্তাকাশের উপর হতে তাঁর বিবাহ দিয়েছিলেন। (সহি বুখারি : ৯/৫১৭)

 

আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আম্‌র ইবনে আ’স (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবি মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেন : “মহাসহানুভূতিশীল সত্তা ওই সমস্ত লোকদের উপর অনুগ্রহ করেন যারা অনুগ্রহশীল। যদি তোমরা ভূপৃষ্ঠে বাসরত লোকদের উপর দয়া করো তাহলে যিনি আকাশে আছেন, তিনি তোমাদের উপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবেন। (আবুদাউদ : ৪৯৪১ ও তিরমিযি : ১৯২৪)

 

হাদিস

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করছেন : যখন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে ইয়ামানে প্রেরণ করেছিলেন তখন তাঁকে বলেছিলেন :  তুমি আহ্‌লে কিতাবের একটি সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং তুমি তাদেরকে সর্বপ্রথম যে বিষয়টির প্রতি আহ্বান করবে সেটি হবে আল্লাহ্‌র একত্ববাদ। যদি তারা সেটা স্বীকার করে নেয় তাহলে তুমি তাদেরকে বলবে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের জন্য প্রত্যহ দিবারাত্রে পাঁচ ওয়াক্তের স্বালাত অপরিহার্য করেছেন। যদি তারা তা করে তাহলে তাদের বলো : আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের উপর তাদের সম্পত্তির যাকাত ফরজ করেছেন। এটা বিত্তাবানদের নিকট থেকে নিয়ে বিত্তহীনদেরকে দেয়া হবে। যদি তারা তাতেও সম্মত হয় তাহলে তাদের নিকট হতে যাকাত নাও, কিন্তু মানুষের সর্বোত্তম সম্পত্তি হতে বিরত থাকবে।

 

মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বর্ণনা করছেন : রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : “হে মুআয ! তুমি কি জানো স্বীয় বান্দার উপর আল্লাহ্‌ তাআলার কী অধিকার আছে ?” আমি বললাম : “আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসূল বেশি জানেন”। নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : “তাঁর ইবাদত করা এবং ইবাদতে তাঁর সঙ্গে কাউকে অংশী না করা। তুমি কি জানো তাঁর উপর তাদের কী অধিকার আছে ?” আমি উত্তর দিলাম : “আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসূল বেশি জানেন”। নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : তাদেরকে শাস্তি না দেয়া (যদি তারা তেমনটি করে)”। (সহি বুখারি : ৯/৪৭০) [১৩] [১৪]

 

আল্লাহ্‌র করুণা

আল্লাহ্‌ তাআলা পরম করুণাময়। তিনি আমাদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্টি করতে চান না। তাই তো তিনি তাঁর অনুগ্রহের পরিসর এতটাই বিস্তীর্ণ রেখেছেন যে, আমাদের সৎকর্মগুলিকে তিনি বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন এবং আমাদেরকে অসংখ্যবার ক্ষমা করেন।

 

 “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ বিন্দুমাত্র অন্যায় করেন না, যদি কোনো সৎকার্য থাকে তাহলে তিনি সেটাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং তিনি নিজের নিকট হতে মহাপ্রতিদান প্রদান করেন”। [সূরা নিসা ৪:৪০]

 

 “যে কেউ (কিয়ামতদিবসে) একটি সৎকর্ম নিয়ে আসবে তাকে তার দশগুণ প্রতিদান দেয়া হবে এবং যে দুষ্কর্ম করবে তাকে শুধু ততটুকুই প্রতিফল দেয়া হবে যতটুকু সে করেছে, আর তারা অত্যাচারিত হবে না”। [সূরা আন্‌আম ৬:১৬০]

 

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বাণী : ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মহাদয়াময় আল্লাহ্‌ তাআলা হতে বর্ণনা করছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাআলা সৎ ও অসৎকর্ম লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, অতঃপর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি কোনো সৎকর্মের সংকল্প গ্রহণ করল কিন্তু তা সম্পাদন করল না, আল্লাহ্‌ তাআলা তার জন্য একটি পূর্ণ সৎকর্মের সওয়াব লিখে দেন। আর যদি সে সংকল্প গ্রহণের পর কার্যত তা সম্পাদন করে তাহলে আল্লাহ্‌ তাআলা তার জন্য দশ থেকে সাতশোগুণ বরং তার থেকেও বেশি সওয়াব লিখে দেন। আর যে ব্যক্তি কোনো দুষ্কর্মের সংকল্প করে কিন্তু কার্যত তা সম্পাদন করেনা, তার জন্য আল্লাহ্‌ তাআলা একটি সওয়াব লিখেন। আর যদি সে ইচ্ছা করার পর কার্যত তা করে ফেলে তাহলে আল্লাহ্‌ তাআলা কেবল একটিই গোনাহ্‌ লিপিবদ্ধ করেন”। (সহি মুস্‌লিম : ২৩৭)

 

উপরোক্ত কুর্‌আনের আয়াত এবং হাদিস হতে আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষের ছোটো ছোটো সৎকর্মের বিনিময়ে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে চান : 

  • যদি কোনো ব্যক্তি কেবল একটিই সৎকর্ম করে, তাহলে তার পুরস্কার পাচ্ছে ১০ থেকে ৭০০ গুণ বরং তার থেকেও বেশি।
  • যদি কোনো ব্যক্তি সৎকর্মের সংকল্প গ্রহণের পর কার্যত তা সম্পাদন না করে, তবুও সে একটি পুরস্কার পাচ্ছে।
  • যদি কোনো ব্যক্তি কোনো দুষ্কর্ম করার সংকল্প গ্রহণের পর তা না করে তবে তার জন্য একটি সওয়াব লেখা হয়, অথচ সে অসৎকর্ম করার সংকল্প নিয়েছিল।
  • যদি সে অসৎকর্ম করেই ফেলে তাহলে তার জন্য কেবল একটি গোনাহ লেখা হচ্ছে।

 

কেন আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর নিয়ম থেকে বেরিয়ে সৎকর্মগুলিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন ? আপনি সৎকর্ম করছেন না, কিন্তু তিনি সৎকর্ম লিখছেন; আপনি দুষ্কর্মের সংকল্প গ্রহণ করে ফেলছেন তথাপি তিনি সৎকর্ম লিখছেন আর আপনার একটি অসৎকর্মের বিনিময়ে শুধুমাত্র একটি অসৎকর্ম লিখছেন; এটা কেন ? এর কারণ এটা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে, আল্লাহ্‌ তাআলা পরম করুণাময় এবং তিনি আমাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে চান না।

 

একজন অংকের শিক্ষক বা একজন ব্যবসায়ীর মতো আল্লাহ্‌র হিসাব করা যে ভুল, তা আপনি অনুভব করবেন। প্রত্যেকেই মূল্যায়ন করতে পারে যে, আল্লাহ্‌ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহ সীমাহীন। আল্‌হামদু লিল্লাহ্‌ !

 

“তারা আল্লাহ্‌র যথোচিত মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে না; নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ মহাক্ষমতাবান ও পরাক্রমশালী”। [সূরা হাজ্জ ২২:৭৪]

 

আল্লাহ্‌ তাআলা কি শুধু ইসলাম এবং মুসলমানদের জন্য ?

বাইবেলের মধ্যে আরবি ভাষী খ্রিষ্টান এবং ইহুদিরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্‌ তাআলাকে বোঝানোর জন্য “আল্লাহ্‌” শব্দটাই ব্যবহার করত।

 

আরবি বাইবেলের বুক অফ জেনিসিসের প্রথমেই যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো হলো : “আল্লাহ্‌” সৃষ্টির “গড”-কে বোঝানোর জন্য; আদম ও হাওয়া; নূহ; ইব্রাহিম; ইসমাঈল; ইসহাক্ব; ইয়া’ক্বুব (আলায়হিমুস সালাম)। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের আরবি সংস্করণে জেনিসিসের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠায় “আল্লাহ্‌” শব্দটি আমরা সতেরো (১৭) বার পায়। [১৬]

 

অর্ড পেজ এই লিঙ্ক থেকে ডাউনলোড করুন :  http://www.arabicbible.com/arabic-bible.html

 

তথ্যসূত্র

[১] http://www.iqrasense.com/about-islam/what-must-we-know-about-allah.html

[http://www.tauheed.com/ilm-source/tauheed/about-the-word-%E2%80%9Callah%E2%80%9D-and-its-meaning/

[৩] http://www.islamhouse.com/53030/en/en/articles/20_Facts_about_Allah_(God)_in_Islam

[৪] http://archive.org/details/ConditionsOfLaaIlaahaIll-allah.pdf

[] http://www.islambasics.com/view.php?bkID=156&chapter=9

[] http://qsep.com/modules.php?name=assunnah&d_op=viewarticle&aid=114

[৭] http://www.qsep.com/modules.php?name=aqtawhid&file=article&sid=37

[৮] http://www.islambasics.com/view.php?bkID=151&chapter=51

[] http://quran.com/

[১০] http://aqeedah.wordpress.com/2007/02/22/concept-of-ibaadah-in-islam/

[১১] http://quran.com/

[১২] http://islamqa.com/en/ref/439

[১৩] http://abdurrahman.org/tawheed/whereisallah.html

[১৪] http://www.missionislam.com/knowledge/whereallah.htm

[১৫http://dawah.invitetogod.com/questions-asked-by-non-muslims/if-allah-is-most-merciful-why-does-he-like-to-see-people-burn-in-hell

[১৬] http://www.islamindepth.com/contents/details/36

 

700 Views
Correct us or Correct yourself
.
Comments
Top of page